সর্বনাশে যথেষ্ট এক আসলামই

ডোবা-নালা ফুটপাথ থেকে শুরু করে কলেজের জমি দখল, তার সাম্রাজ্যে প্রতিবাদ করে না কেউ
ঢাকা-১৪ আসনে দখলবাজির অভিযোগে তিনি রয়েছেন শীর্ষে। তিনি আসলামুল হক আসলাম। সরকারি দল আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য। ডোবানালা, খাল-বিল, সরকারি জায়গা, রাস্তা-ফুটপাথ, মার্কেট, কলেজ এমনকি মুক্তিযোদ্ধার ভিটেমাটিও তার দখলবাজি থেকে রেহাই পায়নি। পাশাপাশি বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিস্ট্যান্ড, খেয়াঘাট থেকে বেড়িবাঁধ সবর্ত্র তার দখলবাজির থাবা বিদ্যমান। কেবল দখলবাজি করেই সংসদ সদস্য আসলাম আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। আট বছরের ব্যবধানে তিনি প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আদালতে তিনি নিজেই তা দাবি করেছেন। মিরপুর-শাহআলী-দারুসসালাম হয়ে উঠেছে তার বৃহত্তর অপরাধ সাম্রাজ্য। সেখানে জায়গাজমি জবরদখল, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক-জুয়ার মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা একেকটি অপরাধ সেক্টর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে আসলামুল হক আসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আপনাদের যা খুশি তাই লিখেন। ’ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও ভূমিদস্যুদের কাছে জিম্মি ঢাকা-১৪ আসনের অন্তভুর্ক্ত মিরপুর-গাবতলী এলাকাবাসী। গাবতলী বাস টার্মিনালে বেভু বাহিনী, তুরাগ নদে বাবু বাহিনী, রাইনখোলায় খোরশেদ বাহিনীর চাঁদাবাজি ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের বাসিন্দা। চাঁদাবাজ নেতারা সংসদ সদস্যের ডান হাত হিসেবে এলাকায় পরিচিত। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই খাসজমি দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মদদ রয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। কল্যাণপুর খালের বিরাট অংশও দখল করে নিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। সেখানে সংসদ সদস্যের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক দলের কার্যালয় স্থাপন হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট ও বস্তি। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নাগরিক উন্নয়ন কমিটির মাধ্যমে জেলা পরিষদের খাসজমি দখলের অভিযোগ রয়েছে আসলামের বিরুদ্ধে। বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিভিন্ন অংশ ও রূপনগরের ঝিল অবৈধ দখলের অভিযোগে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচিসহ পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হওয়ায় তার দখলবাজি থামানো যায়নি।

আসলামুল হক আসলামের বিরুদ্ধে সরকারি বাঙ্লা কলেজের প্রায় চার বিঘা জমি নিজ কোম্পানি মায়িশা গ্রুপের নামে দখলে নেওয়ার অভিযোগ আছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন কিছু জমির সঙ্গে কলেজের জমি মিলিয়ে সেখানে মায়িশা গ্রুপের সাইনবোর্ড দেওয়া হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে লিজ নেওয়া জমি দখলেরও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। রাজধানীর দারুসসালামের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কমিউনিটি সেন্টারের পশ্চিম পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের সাড়ে তিন একর জায়গা দখল করে ভবন তৈরি করছেন আসলাম। অথচ বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সংস্থার সঙ্গে ওই জমি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মামলা চলছে। মীমাংসা হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো স্থাপনা তৈরি না করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত। কিন্তু আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেখানে ভবন তৈরি করছেন সংসদ সদস্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০০ সালের ২৩ মার্চ ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে ওয়াকফ প্রশাসন থেকে ২৩ দশমিক ২৩ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সংস্থা। ২০০৭ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ওই জমির মালিকানা দাবি করলে মুক্তিযোদ্ধা সংস্থার পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সংস্থার নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল সংসদ সদস্য আসলাম তার লোকজন নিয়ে জমি দখল করতে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আসলাম মুক্তিযোদ্ধা মশিউর রহমান বাবুকে কলার ধরে টেনে থানায় নিয়ে যান। পরে সংস্থাটির মহাসচিব হাবিব ও বাবুর বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির মামলা করেন তিনি। সেখানেই প্রস্তাবিত সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং প্রস্তাবিত দারুসসালাম থানা কমপ্লেক্স লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পুরো জায়গাটি আসলামের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
বুদ্ধিজীবী কবরস্থানসংলগ্ন ওয়াকফ এস্টেটের জমিতে বালু ভরাট করেছেন আসলাম। কিন্তু এ জমিটি মতিউর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে মতিউর রহমান আর প্রবেশ করতে পারেননি। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মতিউর রহমান অভিযোগ নিয়ে গেলে দারুসসালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান তা আমনে নেননি। এ বিষয়ে ওসি বলেন, ‘আমার জানা মতে, এমন কেউ এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসেননি। ’
অফুরন্ত সম্পদ তার : আসলামের সম্পদ নিয়ে বরাবরই বিতর্ক রয়েছে। তার সম্পদ দ্বিগুণ হতে লেগেছে মাত্র ৬০ দিন। আর পাঁচ বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ৩০ গুণ। ২০০৮ সালে তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় আসলামুল হক উল্লেখ করেছেন, তিনি ও তার স্ত্রী এখন ১৪৫ দশমিক ৬৭ একর জমির মালিক। জমির দাম উল্লেখ করা হয়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা। পাঁচ বছরে স্বামী-স্ত্রীর জমি বেড়েছে ১৪০ একরের বেশি। আর বাড়তি এ জমির মূল্য দেখিয়েছেন ১ কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অথচ ২০১৫ সালে তিনি উচ্চ আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, তার ৫-৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের জোগান কোত্থেকে কীভাবে এলো তা নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে জনমনে।
ডিএনসিসিতে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসলামুল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৪-এ ঠিকাদারি পুরোটাই তার কব্জায় নিয়ে যান। সেখানে নিজ নামে ঠিকাদারি করার আইনি বিধিনিষেধ থাকায় তার আপন শ্যালক মনসুরকে এ দায়িত্ব দেন। সেখানে স্বপন, ডন, পিয়ার তার হয়ে কাজ করেন। তারা মিরপুর অঞ্চলের রাস্তাঘাটসহ সব ধরনের উন্নয়ন কাজের দরপত্র বাগিয়ে নিচ্ছেন প্রভাব খাটিয়ে। তাদের ভয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্র দাখিলের সাহসই পান না। এ ছাড়া ডিএনসিসির মিনিওয়েস্ট ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণকাজও করেছেন আসলামের লোকজন। শুরুতে ঠিকাদারি নিয়ে ডিএনসিসির সঙ্গে কিছুটা বিরোধ থাকলেও পরে তিনি তা মিটমাট করে নেন।
একজন ঠিকাদার বলেন, ‘আসলামের কথা ছাড়া ডিএনসিসির জোন-৪-এর একটি কাজও কেউ পায় না। এসব কাজ থেকে তাকে পার্সেন্টিজ দিতে হয় বলে শুনেছি। ’
চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসের হোতা : এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গাবতলী বাস টার্মিনালে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বড় ভাই মফিজুল হক বেভুর নিয়ন্ত্রণে চাঁদাবাজি চলছে নির্বিঘ্নে। পুরো বাস টার্মিনালই রয়েছে নিরাপত্তাহীনতায়। একাধিক বাস মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতি সপ্তাহে বাস মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলছেন তিনি। চাদা না দিলেও তাদের যেমন সমস্যা, আবার তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেও ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া রয়েছে।
এ ছাড়া কল্যাণপুর থেকে মিরপুর ব্রিজ পর্যন্ত যে পরিবহন কাউন্টার রয়েছে তার অধিকাংশই অবৈধ। সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ’র অনুমোদনহীন এসব কাউন্টার থেকেও সপ্তাহে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি কাউন্টারের সুপারভাইজার জানান, কাউন্টার থেকে ওপর মহলেও যেমন টাকা দিতে হয়, তেমনি সংসদ সদস্যের সমর্থকদের অর্থ দিতে হয়। গাবতলী টার্মিনালসহ আশপাশের শত শত কোচ কাউন্টারের চাঁদা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংসদ সদস্যের ভাইয়ের যোগসাজশ রয়েছে।
৮ নম্বর ওয়ার্ডে রাইনখোলা সমবায় মার্কেট, চিড়িয়াখানা রোডের ফুটপাথে অবৈধ হকার বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে খোরশেদ বাহিনী। হকাররা জানান, ফুটপাথে বসার জন্য তারা ডিসিসিকে নয়, খোরশেদ ও আলমকে ভাড়া দিচ্ছেন। এমনকি রাইনখোলা সমবায় মার্কেটেও তারা চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ করেন একাধিক ব্যবসায়ী। মিরপুরের গাবতলী, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আসলামুল হক আসলামের আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইনসান চৌধুরী চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নিরীহ মানুষের জমি দখল করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ইনসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় জিডিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
ডিসিসির পাবলিক টয়লেটে অবৈধ দোকান বসিয়েছেন সংসদ সদস্যের আরেক সহযোগী ১৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের মো. সাইফুল। চিড়িয়াখানার গেটের বাইরে-ভিতরে অবৈধ দোকান বসিয়েও দেদার চাঁদা তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া তুরাগ নদসংলগ্ন শিয়ালবাড়ী থেকে মিরপুর ব্রিজ পর্যন্ত অবৈধ ইজারা দিয়ে খোদ সংসদ সদস্যের নামেই চলছে বালু ও পাথর ব্যবসা। একাধিক বালু ব্যবসায়ী জানান, বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। কিন্তু মুখ খোলার উপায় নেই। সেখানেও বাবু নামের একজন প্রতিদিন পাথর ও বালু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংসদ সদস্যের নামে চাঁদা তুলছেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
আরও যত দখলবাজি : আসলামুল হক আসলাম নিজেকে জমিদার পরিবারের সদস্য বলে দাবি করলেও তার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ সব সময়ই। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের জায়গাজমি তো আছেই, খোদ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও তার দখলবাজির থাবা থেকে রেহাই পান না। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের কর্মী আবদুল লতিফের লালকুঠি বড় মসজিদসংলগ্ন বাড়ির জায়গা জবরদখল করে নেন। এ সময় আবদুল লতিফের বৃদ্ধ বাবাকেও ব্যাপকভাবে মারধর করা হয়। দখলবাজির মাত্র চার দিনের মধ্যেই আবদুল লতিফের বৃদ্ধ বাবা মারা যান।
মিরপুর বড়বাজার (হরিরামপুর) বেড়িবাঁধ এলাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম কনভেনশন সেন্টার নাম দিয়ে ব্যক্তিমালিকানার জমি দখল করে নেন তিনি। বিরোধপূর্ণ জায়গায় সরকারি বিপুল অর্থের অপচয় ঘটানো হলেও এখন পর্যন্ত তিনি কনভেনশন সেন্টারটি চালু করতে পারেননি। মাজার রোডের অদূরে যমুনা সিএনজি স্টেশনসংলগ্ন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের অনেক দামি জায়গা হাতিয়ে নেন আসলাম।
আমিনবাজার ব্রিজের নিচে (পূর্বপাশে) তুরাগ তীরের ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় সরকারি ইজারা বাতিল রেখে ‘এমপির ঘাট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে পণ্যবাহী শত শত বার্জ, ট্রলার, নৌকা থামানোর চাঁদা থেকে শুরু করে মালামাল লোড-আনলোড বাবদও টাকা আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারি রাজস্ব খাতে এসব টাকা জমা হচ্ছে না। প্রতি বছর ঘাটের কোটি কোটি টাকা সংসদ সদস্য ও তার সহযোগীদের পকেটেই যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিতর্কে সংসদ সদস্যের বিদ্যুৎ কেন্দ্র : সংসদ সদস্য আসলামের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বছিলায় এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে সাধারণ মানুষের জমি দখলে নেওয়ার বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় অর্ধশত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা মিলে বছিলায় কিছু জমি কিনেছিলেন। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তাও দখলে নিয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রের বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। এ অপরাধে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে পরিবেশ অধিদফতর জরিমানা করে মামলা করেছে। আসলাম নিজের মালিকানাধীন মায়িশা গ্রুপের নামে তুরাগ নদের বছিলা অংশে একাধিক স্থাপনা গড়েছেন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ প্লান্ট করার জন্য সরকার যে পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করে দিয়েছে তার বেশি তিনি দখল করে ব্যবহার করছেন।
উৎসঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

নৌমন্ত্রীর হাতে জিম্মি সড়ক পরিবহন খাত

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের কাছে জিম্মি দেশের পরিবহন খাত। এ খাতে তাঁর কর্মকাণ্ড সড়ক নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। শাজাহান খান একদিকে শ্রমিকনেতা, অন্যদিকে পারিবারিকভাবে পরিবহন কোম্পানির মালিক। তিনি শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা হয়ে পরিবহনে চাঁদা নির্ধারণ করেন। আবার তিনিই সরকারের সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, যাঁর মূল কাজ এ খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। তিনি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলেরও সদস্য, যাঁর প্রধান কাজ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই তিনিই সড়ক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সব দাবি আদায়ে সদা সক্রিয়। তিনি সরকারের একজন মন্ত্রী। আবার তিনিই দলবলে উপস্থিত হয়ে ‘জনবিরোধী’ দাবি আদায়ে সরকারের অন্য মন্ত্রীদের সঙ্গে দর-কষাকষি করেন।সর্বশেষ উদাহরণ গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। মন্ত্রী শাজাহান খান ওই বৈঠকে মালিক-শ্রমিকদের পক্ষে মূল ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইতিপূর্বে নাগরিক সমাজের কাছে জনবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত, আর আইনের দৃষ্টিতে সঠিক নয় এমন সব দাবির পক্ষে অবস্থান নেন এবং বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অঙ্গীকার আদায় করেন। এ দাবিগুলো হলো যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে চালকদের বিরুদ্ধে করা মামলায় হত্যার অভিযোগ না আনা এবং দুর্ঘটনার পর জব্দ করা গাড়ি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দেওয়া।লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে আদালতের একটি নির্দেশনাও অমান্য করতে কার্যত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যবহার করেছেন তিনি। বিনা পরীক্ষায় লাইসেন্স নবায়ন মোটরযান আইনেরও পরিপন্থী।এসব দাবির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন হয়েছে। কারণ, বিষয়গুলো সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত এবং সে কারণে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট।পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবারই এ ধরনের কোনো দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে জনগণকে জিম্মি করা হয়, ডাকা হয় পরিবহন ধর্মঘট। এবারও স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে দেশব্যাপী ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে রাখা হয়েছিল।

শ্রমিক সংগঠনের সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরে বেশ কয়েকবার অঞ্চলভিত্তিক ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। কখনো ১১ দফা, কখনো সাত দফা, আবার কখনো ১৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। পরে শাজাহান খানের উপস্থিতিতে যোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।

তবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দফা অনেক থাকলেও মূলত যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া চালকের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, দুর্ঘটনা ঘটানো চালকদের রক্ষা, পরিবহন খাতের চাঁদা কত হবে তা নির্ধারণ আর সরকারি সংস্থা বিআরটিসির সেবা সংকুচিত করা নিয়ে চাপ থাকে শাজাহান খানের পক্ষ থেকে। এ ‘ধর্মঘট হুমকি’ দিয়ে ‘দর-কষাকষি’ ও ‘দাবি আদায়ের’ কৌশলের কারণে ভোগান্তির শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ। অথচ তিনি জনস্বার্থ রক্ষার শপথ নিয়ে মন্ত্রী হয়েছেন।

মালিক না শ্রমিক: শাজাহান খান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। আবার তিনি পারিবারিকভাবে পরিবহন মালিক। তাঁর পরিবারের কোম্পানির অধীনে ঢাকা-মাদারীপুর ‘সার্বিক পরিবহন’ ও রাজধানীর মিরপুর-আবদুল্লাহপুর পথের ‘কনক’ পরিবহনের বাস চলাচল করে।

পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স আর দুর্ঘটনার পর জব্দ করা গাড়ি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার দাবির যুগপৎ অবস্থান তাঁর এই মালিক ও শ্রমিক সত্তারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন এ খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা।

বর্তমান সরকারের আমলে যতবার গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের সভা হয়েছে, প্রতিবারই তিনি মালিকদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যতম কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ সূত্র জানায়, বিআরটিএ ভাড়া প্রস্তাব করলেও প্রতিবারই মন্ত্রণালয়ে গেলে শাজাহান খানের মতামতই প্রাধান্য পায়। সে মতামত কখনোই জনস্বার্থের পক্ষে নয়, মালিকদের পক্ষে।

নিজে মালিক, শ্রমিকনেতা আবার পরিবহন-সংক্রান্ত সরকারের একাধিক কমিটিতে থাকা সাংঘর্ষিক কি না—জানতে চাইলে শাজাহান খান গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন হবে? একেকটার কাজ একেক রকম। আর বাসের মালিক আমি নই। আমার তিন ভাই।’

সরকার মিশুকের পরিবর্তে ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা বরাদ্দের উদ্যোগ নিলে সেখানে শাজাহান খানের সংগঠন শ্রমিক ফেডারেশন ভুয়া মালিকদের পক্ষ নেয়। ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের মধ্যে বরাদ্দের নীতিমালা করলেও বিআরটিএর নথিতে নেই এমন মালিকদের মধ্যে ৩০৯টি অটোরিকশা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় বিআরটিএ। এখানেও এই শ্রমিকনেতা মালিকস্বার্থে কাজ করেছেন।

পরিবহনে চাঁদার হার ঠিক করা: বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের জন্য চাঁদার হার ঠিক করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির দাবি তোলেন শাজাহান খান। এ নিয়ে যোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শাজাহান খানের উপস্থিতিতে একাধিক বৈঠক হয়। এ লক্ষ্যে তাঁর নেতৃত্বে চাঁদার হার ঠিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকায় মালিক-শ্রমিকের জন্য ৭০ টাকা এবং শুধু ঢাকার বাইরে শ্রমিকদের জন্য ২০ টাকা প্রস্তাব করে তা সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য চাপ দেওয়া হয়। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে শাজাহান খান এটা বাস্তবায়নের জন্য উত্থাপন করেন। অবশেষে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় রাজি না হওয়ায় এবং এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হলে বিষয়টি আর এগোয়নি। কিন্তু এখনো এ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ টাকা নেওয়া হয় তাঁর নেতৃত্বাধীন শ্রমিক ফেডারেশনের নামে।

একাধিক শ্রমিকনেতা নাম প্রকাশ না করে প্রথম আলোকে বলেন, ফেডারেশনের নামে যে চাঁদা তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, সংগঠন পরিচালনায় খরচের জন্য শ্রম আইনে যে চাঁদার কথা বলা হয়েছে, তা দৈনিক নয়, মাসিক কিংবা বার্ষিক। এ ছাড়া ফেডারেশন সারা দেশের শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়কারী বা কেন্দ্রীয় সংস্থা। তাই ফেডারেশন সরাসরি প্রতিটি বাস থেকে চাঁদা তুলতে পারে না। কেবল শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে মাসে বা বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নিতে পারে ফেডারেশন। এখন ফেডারেশন ও শ্রমিক ইউনিয়ন আলাদাভাবে প্রতিদিন ও প্রতি গাড়ি থেকে চাঁদা আদায় করছে।

বিআরটিএর সূত্র জানায়, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় চার লাখ বাণিজ্যিক যানবাহনের নিবন্ধন রয়েছে। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করলে এ তিন পরিবহন থেকেই দৈনিক ১৫ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়। মাসে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। এর বাইরে অটোরিকশা, হিউম্যান হলার, ট্যাংক লরি থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়।

এ বিষয়ে শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ খাতের লোকজন নিজেদের টাকা নিজেদের সংগঠনকে দিচ্ছে। এতে অন্যের সমস্যা কী? আর কেউ তো জোর করে নিচ্ছে না বা অভিযোগও করছে না।’ চাঁদা বৈধ করে প্রজ্ঞাপন জারির জন্য চাপ প্রয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা করলে চাঁদা কমে যেত। এখন প্রচুর চাঁদা আদায় করছে বিভিন্ন লোক।’

শাজাহান খান দাবি করেন, তিনি মন্ত্রী বা অন্য পদের চেয়েও শ্রমিকনেতা হিসেবে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

আইন ও জনস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান: নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছিলেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ২০১১ সালে তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে এ আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ওই সময় লেখক-সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদের নেতৃত্বে ঈদের দিনও ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই’ দাবিতে ছাত্র-শিক্ষক ও পেশাজীবীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করেন। সাংসদ তারানা হালিমের নেতৃত্বে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করেন।

এসব কর্মসূচির পাল্টা হিসেবে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরকে চাপা দেওয়া গাড়ির চালকের মুক্তি, যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার দাবিতে ওই বছরের ২৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেই মালিক-শ্রমিক সমাবেশ করেন শাজাহান খান। ওই সমাবেশে ইলিয়াস কাঞ্চনসহ সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে সোচ্চার ব্যক্তিদের ছবির অবমাননা করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর স্লোগান দেওয়া হয়।

চালকের শাস্তি: তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে দাবি ওঠে, চালকের অবহেলায় প্রাণহানি হলে ‘নরহত্যার’ অভিযোগে মামলা করতে হবে। এরপর সারা দেশে ছয়টি মামলাও হয় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারায়।

কিন্তু গত বুধবার শাজাহান খানের নেতৃত্বে শ্রমিকনেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের কাছ থেকে ৩০২ ধারায় মামলা না নেওয়ার আশ্বাস আদায় করেন। এ ধারা অজামিনযোগ্য এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৩০৪(খ) ধারায় এসব মামলা হবে। তবে তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, তাহলে তখন ৩০২ ধারায় চলে যাবে।’

৩০৪(খ) ধারাও অজামিনযোগ্য এবং সাজা ১৪ বছর কারাদণ্ড।

তবে চিত্রনায়ক ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত ২৭৯ ধারায় সব মামলা হয় বলে ঘাতক জামিন পেয়ে যায়। আর ওই মামলার কিছু হয় না। আবার ৩০৪ বা ৩০৪(খ) ধারায় তো মামলা নেওয়া হয় না। তিনি বলেন, লাইসেন্স ছাড়া বা ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালিয়ে প্রাণহানি হলে চালকের বিরুদ্ধে নরহত্যার (৩০২ ধারা) মামলা হওয়া উচিত।

লাইসেন্স নবায়ন: বুধবারের বৈঠকে চালকের লাইসেন্স নবায়নের জন্য যথাযথ পরীক্ষার বিষয়ে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত মোটরযান আইনের পরিপন্থী। আইনে বলা আছে, পেশাদার চালকের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবায়ন করতে হলে অবশ্যই পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে লাইসেন্স বাতিল হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্র জানায়, ১৯৯২ সাল থেকে নৌমন্ত্রীর সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের দেওয়া তালিকা ধরে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার পেশাদার চালকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০১১ সালেও শাজাহান খানের স্বাক্ষরসংবলিত তালিকা ধরে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া পেশাদার চালকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

তবে ২০১১ সালে হাইকোর্ট পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর পর থেকেই সড়ক পরিবহন ফেডারেশন একের পর এক দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘট দিয়ে, সমাবেশ করে এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করে পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স নবায়নের জন্য চাপ দিতে থাকে।

বিনা পরীক্ষায় লাইসেন্স নবায়ন আইনের পরিপন্থী, সরকারের একজন মন্ত্রী হয়ে কীভাবে বেআইনি কাজ করতে অন্য মন্ত্রীদের চাপ দিলেন—এ প্রশ্ন করা হলে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আইনটা (মোটরযান আইন) পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়েছি। এটা বদলে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘একবার লাইসেন্স পাওয়ার পর আর পরীক্ষা কেন, ফিটনেস টেস্টই যথেষ্ট।’

‘এখন যে লাইসেন্সগুলো নবায়ন করা হচ্ছে, সেগুলোও শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে পরীক্ষা ছাড়া দেওয়া হয়েছিল। আপনার দাবি অনুযায়ী, এখন নবায়নের সময়ও তাঁদের পরীক্ষা দিতে হবে না। তাহলে সড়ক নিরাপত্তা কি হুমকিতে পড়বে না’—এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জেনে-বুঝেই যারা গাড়ি চালাতে পারে, তাদের তালিকা দিয়েছি। আমরা তো সবাইকে চিনি।’

শ্রমিক ফেডারেশনের এই দাবিগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রথম আলোকে বলেন, দাবিগুলো জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি বলেন, ‘আমরা দুর্ঘটনার জন্য যে চালক দায়ী, শুধু তাঁর শাস্তি চাই। কিন্তু শাজাহান খান নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে পরিবহনের সব শ্রমিককে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইছেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞ নজিরবিহীন

একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী দেশজুড়ে বহু নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে। স্বাধীনতার মাসে আজকের পর্বে থাকল ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যার কথা
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস অভিযান শেষ হয়। ভোর পাঁচটায় সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খান সেনানিবাসে তাঁর দপ্তরে চশমা পরিষ্কার করতে করতে বলেন, ‘না, কোথাও কোনো জনপ্রাণী নেই।’
টিক্কা খানের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক পরবর্তী সময়ে উইটনেস টু স্যারেন্ডার বইতে এ বর্ণনা দিয়েছেন।
২৬ মার্চ ভোরেই পরিস্থিতি বুঝতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জরিপ করতে বেরিয়েছিলেন মেজর সিদ্দিক সালিম। তাঁর বইয়ে ওই সকালের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গণকবরগুলো জরিপ কর ছিলাম। সেখানে আমি তিনটি ঢিবি দেখতে পাই, যার প্রতিটি ৩ থেকে ১৫ মিটার ডায়ামিটারের ছিল। সেগুলো নতুন মাটিতে ভরাট করা। কিন্তু কোনো অফিসার মৃতের প্রকৃত সংখ্যা জানাতে রাজি ছিল না। আমি দালানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম, বিশেষত ইকবাল ও জগন্নাথ হলের, যেগুলো আমার মনে হলো, অ্যাকশনের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এই হলো পাকিস্তানি এক সেনা কর্মকর্তার নিজের দেওয়া বিবরণ। মেজর সিদ্দিক সালিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে দেখছিলেন, আগের রাতে চলা একটি বিশেষ সামরিক অভিযান কতটা সফল হয়েছে সেটা সরেজমিনে দেখতে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের ওই অভিযান চলেছে ২৫ মার্চ (দিবাগত) মধ্যরাত থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত। এই অভিযানের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানুষ হত্যা।
অভিযানের প্রধান তিনটি লক্ষ্যবস্তুর একটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপর দুটি লক্ষ্যবস্তু পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদর দপ্তর এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযানটি কতটা নৃশংস ছিল, জগন্নাথ হলের ক্যানটিনের কর্মী সুনীল কুমার দাসের বিবরণে তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। গত সোমবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সেদিন (জগন্নাথ হলের) শহীদ মিনারের পাশে কত লোকের যে লাশের সারি ছিল, তার কোনো হিসাব নেই। হল থেকে ছাত্রদের, হলের শিক্ষক-কর্মচারীদের হত্যা করে লাশ এনে কবর দেওয়া হয়। আমিসহ চারজন কর্মচারী একটা ড্রেনে লুকিয়ে ছিলাম। আমরা পরদিন সকালে পালিয়ে যেতে সক্ষম হই।’
এই গণহত্যা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পৃথিবীর আর কোনো দেশে এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে নির্বিচারে ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-কর্মচারীদের গণহত্যার ঘটনার নজির নেই। ওই দিন রাতে পাকবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হলে ঢুকে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়।’
সিদ্দিক সালিকের বই থেকেই জানা যায়, ওই অভিযানে ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট নিক্ষেপক, ভারি মর্টার, হালকা মেশিনগানসহ নানা ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ ছাত্র-শিক্ষক-কর্মীদের বিরুদ্ধে। মূলত গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারপর বেশির ভাগ লাশ গণকবর দিয়ে তার ওপর বুলডোজার চালিয়ে মাটি সমান করে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক লাশ উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞটি হয়েছে জগন্নাথ হলে। এই গণহত্যার একটি ভিডিও চিত্র ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নূরুল উলা। তিনি তখন বুয়েটের অধ্যাপকদের জন্য তৈরি চারতলা ভবনে থাকতেন, যেখান থেকে জগন্নাথ হলের ছাত্রাবাস আর মাঠ সরাসরি দেখা যেত।
রশীদ হায়দার সম্পাদিত ১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বইটিতে নূরুল উলা লিখেছেন, ‘রাতে দেখি জগন্নাথ হল ছাত্রাবাসের চারপাশ পাকবাহিনীতে ছেয়ে গেছে। হলের কক্ষগুলোতে আগুন। কক্ষগুলোতে ঢুকে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সকালে উঠে দেখি মাঠের পশ্চিম দিকে লাশ এনে জড়ো করা হচ্ছে। আহতদের গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হচ্ছে। এভাবে কয়েকবার চলল।…আমি তাড়াতাড়ি ক্যামেরা সেট করে একটা কালো কাগজে ফুটো করে ক্যামেরার লেন্সটা জানালার কাচের ওপর রাখলাম। এরপরের তিনটা গণহত্যা ধারণ করলাম। বুলডোজার দিয়ে মাটি খুঁড়তেও দেখলাম।’
জগন্নাথ হলের তৎকালীন দারোয়ান সুনীল চন্দ্র দাসের স্ত্রী বকুল রানী দাস সে সময় কর্মচারীদের টিনশেডের বাসায় ছিলেন। গত সোমবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে হল-সংলগ্ন ইউওটিসির (বর্তমান বিএনসিসি) দেয়াল ভেঙে মিলিটারিদের সাঁজোয়া ট্যাংক হলের ভেতর ঢুকে পড়ে। এরপর শুধুই গুলির শব্দ। একপর্যায়ে এলাকার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয় হানাদারেরা। বাসার পুরুষদের ধরে নিয়ে যায় মাঠের দিকে। সেখানেই তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।’
জগন্নাথ হল-সংলগ্ন একটি বাড়িতে থাকতেন মধুর ক্যানটিনের মালিক মধুসূদন দে। তাঁকেও হত্যা করা হয়। তাঁর ছেলে অরুণ দে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাতভর গুলির শব্দ। জগন্নাথ হল থেকে আর্তচিৎকার। সকালে আমাদের বাসায় (সেনা সদস্যরা) এল। আমার দাদা আর নতুন বউদিকে বাসার ভেতরেই গুলি করে মারল। মা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। মাকে প্রথমে কিছু করে নাই। বাবাকে গুলি করতে গেলে মা সামনে যায়। তখন বেয়নেট দিয়ে মায়ের হাত কেটে ফেলে। এরপর মাকে গুলি করে। বাবার গায়েও গুলি করে। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় বাবাকে নিয়ে আবার গুলি করে মারল।’
জগন্নাথ হলে সেদিন যাঁরা নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৬৬ জনের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁদের নামের তালিকা উৎকীর্ণ আছে হলের মাঠে গণকবরের জায়গায় তৈরি একটি নামফলকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক রতনলাল চক্রবর্তীর সম্পাদনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা: ১৯৭১ জগন্নাথ হল বইতে বলা হয়েছে, ওই রাতে সেখানে গণহত্যার শিকার হন চারজন শিক্ষক, ৩৬ জন ছাত্র এবং ২১ জন কর্মচারী ও অতিথি।
গণহত্যার পরিধি
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজও হয়নি। এ নিয়ে বিশদ গবেষণাও হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ১৯৫ জনের নাম আছে, যাঁদের পরিচয় পাওয়া যায়। এর বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে আসা অনেককে হত্যা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই শ থেকে তিন শ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়্যারলেসের সংলাপেও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে।
১৯৭১ সালের গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেছিলেন ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হলেই বাকিরা কাবু হয়ে যাবে। তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। আর সে কারণেই ২৫ মার্চ রাতেই এখানে হামলা হয়। যেহেতু এটি পরিকল্পিত এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সুসজ্জিত হয়ে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্বিচারে হত্যা চালিয়েছে, কাজেই এটি গণহত্যা।’
ইকবাল হলে আক্রমণ
জগন্নাথ হলের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের ইকবাল হলেও (বর্তমান জহরুল হক হল) পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ ছাত্রনেতারা এই হলে থাকতেন বলেই অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য ছিল এই হলটি।
রঙ্গলাল সেনসহ তিনজনের সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বইটিতে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী ট্যাংক, জিপে বসানো রাইফেল, মর্টার, ভারী ও হালকা মেশিনগান নিয়ে জহুরুল হক হল আক্রমণ করে চারদিক থেকে। ছাত্রনেতা ও কর্মীরা হল ছেড়ে চলে গেলেও সাধারণ ছাত্র ও কর্মচারীরা হলে ছিল। জহুরুল হক হল আক্রমণের প্রথম পর্যায়েই ব্রিটিশ কাউন্সিলে পাহারারত ইপিআর সৈনিকদের হত্যা করা হয়। এরপর ওই ভবনের ওপর সামনে ট্যাংক ও ওপরে কামান বসিয়ে জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলে গুলি করা হয়।
জহুরুল হক হলের মূল ভবনের সিঁড়িতে নিহত ছাত্র যাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে তাঁদের নয়জনের একটি তালিকা আছে। জহুরুল হলসংলগ্ন নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় তিনটি বাড়ির ছাদে আজিমপুর থেকে পালিয়ে আসা ইপিআর সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেও গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। ২৩ নম্বর ছাদ থেকেই শুধু ৩০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খুব কাছেই তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। ২৭ মার্চ সকালে শহর থেকে কারফিউ তুলে নেওয়ার পর সায়মন বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফরাসি আলোকচিত্রী মিশেল লরা। ২৫ মার্চ রাতের ধ্বংসযজ্ঞ তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন শহরজুড়ে। ২০১২ সালের ২৩ মার্চ ঢাকায় প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে সায়মন ড্রিং বলেন, ২৭ মার্চ ঘুরতে ঘুরতে তিনি ইকবাল হলেও ঢুকেছিলেন। তিনি সেখানে নিজে ৩০টি লাশ গুনে দেখেছেন। ড্রিং জানান, সেদিন মর্টারের শেল আর মেশিনগানের অবিরাম গুলিতে শুধু ইকবাল হলেই নিহত হয়েছিলেন ২০০ নিরপরাধ ছাত্র। হামলার দুই দিন পরও দেখা যাচ্ছিল পুড়ে যাওয়া রুমের মধ্যে পড়ে থাকা লাশ আর লাশ। পাকিস্তানি বাহিনী আরও বহু লাশ সরিয়ে ফেলেছিল আগেই।
রোকেয়া হলে হত্যা
২৫ মার্চ রাতে মেয়েদের আবাসিক হল রোকেয়া হলেও আক্রমণ হয়েছিল। কারণ, এই হলের মেয়েরা ডামি রাইফেল হাতে কুচকাওয়াজ করতেন। অবশ্য ওই হলের বেশির ভাগ মেয়ে আগেই হল ছেড়ে গিয়েছিলেন। অল্প কয়েকজন মেয়ে ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রোকেয়া হলে কী ঘটেছিল, সে ব্যাপারে ঢাকার সে সময়ের মার্কিন কনসাল জেনারেল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে একটি প্রতিবেদন পাঠান। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের একটি কক্ষে ছয়টি মেয়ের লাশ পা-বাঁধা ও নগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া রোকেয়া হল চত্বরে সপরিবারে হত্যা করা হয় হলের কর্মচারী আহমেদ আলী, আবদুল খালেক, নমি, মো. সোলায়মান খান, মো. নুরুল ইসলাম, মো. হাফিজুদ্দিন ও মো. চুন্নু মিয়াকে।
অন্যান্য হত্যাকাণ্ড
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে ঢুকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেখানকার চার কর্মচারী, সলিমুল্লাহ হলে ঢুকে সেখানকার ১২ জন ছাত্র, ফজলুল হক হলের সাতজন, সূর্য সেন হলের সাতজন এবং মুহসীন হলের ১০ জন ছাত্রকে হত্যা করে। এর বাইরে ২৬ মার্চ সকালে গুরুদুয়ারা নানক শাহী, শিব ও কালীমন্দিরে ঢুকে সেখানকার পুরোহিতদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৭ মার্চ রমনা কালীমন্দিরে ২৭ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।

“মটর শ্রমিকের বর্বরতা” – ১০ ট্রাক চালককে ট্রাকের গড়ম ইন্জিনের নীচে রেখে নির্যাতন

আদালতের রায়ে দুই চালকের যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল থেকে সারাদেশে পরিবহন ধর্মঘট পালন করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।

পাবনা জেলাতেও এ ধর্মঘট পালিত হচ্ছে। তবে সন্ধ্যার দিকে বগুড়া জেলাসহ কয়েকটি জেলা থেকে কাঁচামালসহ কিছু জরুরি পণ্য নিয়ে কয়েকটি ট্রাক এ জেলায় আসে।

এসব যানবাহন পাবনার বেড়া উপজেলার কাশীনাথপুর ট্রাফিক মোড়ে এসে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে।

এ সময় পাবনা জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের (কাশীনাথপুর) কতিপয় সদস্য ১০/১২টি ট্রাকের চালককে মারপিট করে ট্রাক থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে আনে।

এরপর তাদের সঙ্গে যা করা হয়, রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। চালকদের প্রত্যেককে তাদের গাড়ির ইঞ্জিনের নিচে উপুড় বা চিৎ করে শুইতে বাধ্য করা হয়।

এ সময় আব্দুল মোতালেবসহ বেশ কয়েকজন চালক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাদের স্থানীয়রা উদ্ধার করেন।ধর্মঘটে গাড়ি চালানোয় ভয়ংকর শাস্তি

চালকদের এ ধরনের শাস্তি দেখে স্থানীয় সাধারণ মানুষ মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের (কাশীনাথপুর) শ্রমিকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তারা দু’জন অভিযুক্ত চালককে জেল থেকে দায়মুক্তির আন্দোলনের নামে অন্য ১০ জন চালককে এভাবে নির্যাতনের কড়া সমালোচনা করে সংগঠনটির লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান।

ঘটনার বিষয়ে পাবনা জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের (কাশীনাথপুর) সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মুক্তি যুগান্তরকে জানান, এ ধরনের শাস্তির কথা তিনিও শুনেছেন। তবে ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

তিনি জানান, হয়তো ভয়-ভীতি দেখানোর জন্য বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা চালকদের সঙ্গে এমন আচরণ করে থাকতে পারেন।

যাত্রীদের জিম্মি করে আদালতের রায় বদলানোর কৌশল নিয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। এবার এই কৌশল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এল সরকারের একজন মন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে বসে। আর এই সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং সরকার-সমর্থক পরিবহনমালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
গত সোমবার দুপুরে খুলনা সার্কিট হাউসে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের খুলনা বিভাগীয় কমিটির নেতাদের সঙ্গে সরকারের স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠক শেষে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু রাতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সরকারি বাসভবনে বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। গভীর রাতে ঘোষণা আসে, মঙ্গলবার থেকে সারা দেশে লাগাতার পরিবহন ধর্মঘট। আকস্মিক এই ঘোষণার শিকার হয় সাধারণ মানুষ।
নৌমন্ত্রী সারা দেশের শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ ফোরাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। ওই বৈঠকে বাস ও ট্রাকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি ও স্থানীয় সরকার পল্লিউন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাসহ প্রায় ৫০ জন মালিক-শ্রমিকনেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের প্রায় সবাই সরকার-সমর্থক বলে পরিচিত।
.
.
শাজাহান খানের বাসায় বৈঠকের বিষয়ে মসিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য। শ্রমিকেরাও রাজি হয়েছিলেন। এর মধ্যে ফাঁসির রায়ের খবর আসলে শ্রমিকেরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তখন আর আমাদের কিছু করার ছিল না।’
মালিক-শ্রমিক সংগঠন সূত্র জানায়, বৈঠকে সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করার কৌশল নেওয়া হয়। কারণ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও সরকার সমর্থকেরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। তাই দায় এড়াতেই এমন কৌশল নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় নেতারাই ফোনে আঞ্চলিক নেতাদের ধর্মঘট পালনের নির্দেশ দেন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল সচিবালয়ে এই ধর্মঘটকে দুঃখজনক উল্লেখ করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাঁদের (পরিবহনশ্রমিক) উদ্দেশে বলতে চাই, জনগণকে কষ্ট না দিয়ে আপনারা আদালতে এসে আপনাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আপনাদের বক্তব্য যদি যুক্তিসংগত হয়, তবে তা দেখা হবে। যুক্তিসংগত না হলে দেখা হবে না।’ এই ধর্মঘটে আদালত অবমাননা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি আদালতের বিবেচ্য বিষয়।
একটি সূত্র জানিয়েছে, মালিক-শ্রমিকদের নেতারা আজ বুধবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাঁরা ধর্মঘট থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ খুঁজছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের প্রাণহানির মামলায় ঘাতক বাসের চালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। গত ২২ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এই রায়ের প্রতিবাদে প্রথমে আঞ্চলিকভাবে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। এদিকে সাভারে ট্রাকচাপায় এক নারীকে হত্যার দায়ে চালকের বিরুদ্ধে সোমবার মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত। এরপরই গতকাল থেকে সারা দেশে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়।
আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে যাওয়া কতটা যৌক্তিক জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে যে কেউ উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। কিন্তু পেশিশক্তিকে অস্ত্র বানিয়ে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ নেই। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের শিরদাঁড়া সোজা রাখতে হবে।
হঠাৎ ধর্মঘটে ভোগান্তি
হঠাৎ ধর্মঘটের কারণে কাল সকালে ঘর থেকে বেরিয়েই ভোগান্তিতে পড়েন রাজধানী ও আশপাশসহ সারা দেশের মানুষ। সোমবার সন্ধ্যায় ও রাতে দূরপাল্লার বাস-ট্রাক যাত্রী ও পণ্যসহ আটকা পড়ে। সকালে গাবতলী, কাঁচপুর সেতু, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জসহ ঢাকার সব প্রবেশমুখে যানবাহন আটকে দেওয়া হয়। দূর থেকে আসা যাত্রীরা টার্মিনালের অনেক দূরে নেমে হেঁটে, রিকশায় ও রিকশাভ্যানে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আবার রাজধানী শহরের ভেতরেও সীমিতভাবে যানবাহন চলে।
এই দুর্ভোগের পরও নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ধর্মঘটের পক্ষেই সাফাই গাইলেন। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই পারে। আপনিও করেন, আমিও করি। ঠিক একইভাবে ওরাও (শ্রমিক) ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, চালকেরা মনে করেছেন, তাঁরা মৃত্যুদণ্ডাদেশ বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশের মতো রায় মাথায় নিয়ে গাড়ি চালাবেন না। তাই তাঁরা স্বেচ্ছায় গাড়ি চালাচ্ছেন না। এটাকে ধর্মঘট নয় ‘স্বেচ্ছায় অবসর’ বলা যেতে পারে।
নৌমন্ত্রী স্বেচ্ছা অবসর বললেও ধর্মঘট আহ্বানকারীরা গতকাল দিনভর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোথাও বাসের চালককেও নামিয়ে দেওয়া হয়। সিএনজি অটোরিকশা চালকদেরও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর গাবতলীতে আটকেপড়া ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকে ধাক্কাধাক্কি করতে দেখা গেছে। চট্টগ্রামে অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অনেক সময় পুলিশ ছোটখাটো আন্দোলন কর্মসূচিতেও চড়াও হয়। কিন্তু পরিবহন ধর্মঘটে পুলিশ ছিল নিষ্ক্রিয় ও নীরব দর্শক। যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের সামনেই যাত্রী ও চালককে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কোনো ভূমিকা পালন করেনি। আসলে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা সরকারের লোক। জনস্বার্থে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত তাঁরাও মানেন না।
মালিক-শ্রমিকেরা ‘বার্তা’ দিতে চান
মালিক-শ্রমিক সংগঠনের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা জানান, সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ী চালকের বিরুদ্ধে সাজা দেওয়ার নজির নেই। দুর্ঘটনার জন্য মালিকদের মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণও দিতে হয়নি। কিন্তু পরপর দুটি ঘটনায় সর্বোচ্চ সাজা হওয়ার ঘটনায় পরিবহনশ্রমিকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও সাজা হতে পারে, এ আশঙ্কায় তাঁরা সবাইকে একটা ‘বার্তা’ দিতে চান। এ থেকেই ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শাজাহান খানের বাসায় বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক মালিক ও শ্রমিকনেতা জানান, মালিকদের সংগঠনগুলো ধর্মঘটের বিষয়ে খুব বেশি সোচ্চার ছিল না। আবার শ্রমিক সংগঠনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মত দেওয়ারও সাহস দেখায়নি। বৈঠকের শুরুতে খুলনা অঞ্চলের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে সরকারকে সময় বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছিল। এ সময় ঢাকা অঞ্চলের ট্রাকমালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে খবর দেওয়া হয় যে, দুর্ঘটনায় এক নারীর প্রাণহানির কারণে একজন ট্রাকচালকের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এরপর নেতারা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোনো কোনো নেতা ওই মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেন। নিশ্চিত হওয়ার পর ধর্মঘট প্রত্যাহারের আলোচনা আর এগোয়নি।
মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের দুজন দায়িত্বশীল নেতা দাবি করেন, বিষয়টি এখন নেতাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই। শক্ত কর্মসূচি না নিলে তাঁদের নেতৃত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে।
তবে একাধিক সাধারণ পরিবহনমালিক জানিয়েছেন, ধর্মঘট জনগণের জন্য যেমন দুর্ভোগের, তেমনি মালিকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ, অনেক মালিক পরিবহন চালিয়ে দৈনিক ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। ব্যবস্থাপনার খরচও মেটাতে হয়।
গতকাল এক আলোচনা সভায় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ধর্মঘটকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তা দ্রুত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আদালত এ রায় দিয়েছেন, জনগণ দেয়নি। এর সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নেই। তাহলে জনগণ কেন কষ্ট পাবে?
মালিক-শ্রমিক সংগঠন সূত্র আরও জানায়, তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের স্বজনেরা মানিকগঞ্জের আদালতে দায়ী বাসের মালিকের বিরুদ্ধে ১৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে আলাদা একটি মামলা করেছিলেন। পরে বাদীর আবেদনে সেই মামলা হাইকোর্টে স্থানান্তর হয়। এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। ৭ মার্চ শুনানির দিন ধার্য আছে। সিলেটের একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গ্রীন লাইন পরিবহনের মালিকের বিরুদ্ধেও আরেকটি ক্ষতিপূরণ মামলা চলমান আছে। এই দুটি মামলা নিয়ে মালিক সংগঠনের নেতাদের মধ্যেও শঙ্কা আছে। কারণ, সড়ক দুর্ঘটনার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মালিকেরা যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে পার পেয়ে আসছিলেন। এই দুটি মামলায় বিপুল ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শঙ্কা দেখছেন তাঁরা।
সূত্র আরও জানায়, পরিবহনমালিকেরা সারা দেশে দুই লাখের ওপর ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও বাসের আকৃতি পরিবর্তন করেছেন। যা মোটরযান আইনের পরিপন্থী। সরকার এটাকে সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও বাসের মালিকদের নিজ খরচে মূল কাঠামোয় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু পরিবহনমালিকেরা এসব যান মূল কাঠামোয় ফিরিয়ে নেওয়ার বিপক্ষে এবং তাঁরা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেননি। কারণ, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন কমে যাবে।
ধর্মঘটের পেছনে মন্ত্রী ও সরকারি দলের লোকজনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘মন্ত্রীদের এই ভূমিকার জন্য সরকারের বিব্রত হওয়া উচিত। আমি বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দৃঢ়চেতা হতে হবে। মন্ত্রীদের একটা ধাক্কা দেওয়া উচিত যে, সরকারি দায়িত্বে থেকে খেয়ালখুশিমতো চলা যাবে না।’

হঠাৎ আলোচনায় খালেদা জিয়া

ড. তারেক শামসুর রেহমান
হঠাৎ করেই আলোচনায় এসেছেন খালেদা জিয়া এবং মজার ব্যাপার খালেদা জিয়াকে নিয়ে আলোচনা করেছেন বিএনপির দুজন সিনিয়র নেতা, যারা আবার স্থায়ী পরিষদের সদস্য। তবে বিএনপিকে নিয়ে ‘বোমা ফাটিয়েছিলেন’ কানাডার একটি আদালত। সেখানে বিএনপির এক রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীর আবেদন নাকচ করে দিয়ে আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, বিএনপি সন্ত্রাসে ছিল, আছে বা ভবিষ্যতেও থাকতে পারে, এমন ধারণা করার যৌক্তিক কারণও আছে। এটা নিয়ে বাংলদেশে কম বিতর্ক হয়নি। কিন্তু এটি বর্তমান নিবন্ধের আলোচনার বিষয় নয়। আলোচনার বিষয় খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার কারাদ- হতে পারে (জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল মামলা) এমন আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘সাজা হলেও খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারবেন।’ আর গয়েশ্বর রায় বলেছেন, ‘হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে ৫ বছর পর কেন?’ দুটি বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মওদুদ আহমদ এ ধরনের বক্তব্য কেন দিলেন? আদালত কী রায় দেবেন, তা তো আগাম কেউ বলতে পারে না? একজন আইনজ্ঞ মওদুদ আহমদ ‘সাজা’র কথা আগাম বলেন কীভাবে? বাজারে নানা গুঞ্জন। সেসব গুজবের সঙ্গে মওদুদ সাহেবের নামও আছে। তিনি কী কোনো মেসেজ দিতে চাচ্ছেন? তিনি কী চাচ্ছেন খালেদা জিয়ার সাজা হোক। এর পর খালেদা জিয়া আপিল করবেন। উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখবেন এবং আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখবেন। যারা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা মওদুদ আহমদের এ ধরনের বক্তব্যে এক ধরনের ‘ষড়যন্ত্র’ খুঁজতে পারেন। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, খালেদা জিয়া তার স্মৃতিবিজরিত ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি হারিয়েছিলেন সরাসরি বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে যাওয়ার কারণে। হাইকোর্টে ও আপিল বিভাগেও খালেদা জিয়া হেরে গিয়েছিলেন। হাইকোর্টে যাওয়ার পরামর্শটি দিয়েছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। দ্বিতীয়ত, গয়েশ্বর রায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানেও আছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। তিনি সরাসরি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে যদি নির্বাচনেই যাব তাহলে ২০১৪ সালেই নির্বাচনে যেতে পারতাম। তাহলে পাঁচ বছর পরে যাব কেন?’ এ থেকে একটা মেসেজ অন্তত পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন নির্বাচনের আগে যে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে তার নেতৃত্বে যদি শেখ হাসিনা থাকেন, তাহলে বিএনপির একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (যা ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।) অংশ নেওয়া উচিত নয়। অকাট্য যুক্তি। এখনো শেখ হাসিনা থাকবেন বিধায় তো ২০১৪ সালের নির্বাচনেই অংশ নেওয়া যেত। মির্জা ফখরুল এবং রিজভী আহমেদের বক্তব্য অনেকটা গয়েশ্বর রায়ের বক্তব্যের মতোইÑ তারা শেখ হাসিনাকে রেখে নির্বাচনে যেতে চান না। কিন্তু নির্বাচন হবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায়। এ ক্ষেত্রে বিএনপি অংশ না নিলেও সরকার নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচনের আয়োজন করবে, যেমনটি করেছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। বিএনপি এখন একটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কথা বলছে। কিন্তু এর রূপরেখা এখন অবধি উপস্থাপন করেনি। তবে সেই রূপরেখা সরকার যে মানবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। মোটামুটিভাবে যেভাবেই হোক একটি নির্বাচনী আমেজ ফিরে এসেছে। টিভি টক শোতে দেখলাম, এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি নিজেও একাধিক টক শোতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, দিন যত যাচ্ছে খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজার বিষয়টি অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য সাজা নিয়ে মন্তব্য করেন, তখন বুঝতে হবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে। যদিও এটা আইনের বিষয়। আদালত ও উচ্চ আদালত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ নিয়ে বিএনপির নেতারা আগাম মন্তব্য করে বিষয়টিকে উসকে দিলেন মাত্র। আসলে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন হোক, এটা আমার ধারণা প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান। আরেকটি ৫ জানুয়ারির (২০১৪) মতো নির্বাচন হোকÑ আমরা তা কেউই চাই না।

৫ জানুয়ারি (২০১৪) আমাদের জন্য কোনো সুখকর দিন ছিল না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচন নিয়ে দুটো বিষয় ছিল। এক. সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, দুই. বাস্তবতা। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি নির্বাচন আয়োজন করার প্রয়োজন ছিল। এটা নিয়ে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে আস্থার সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল ২০১৪-পরবর্তী যে কোনো সময় একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা, যেমনটি করেছিল বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ (যে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল) কিংবা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বারবার আলোচিত হতে থাকবে। ষষ্ঠ সংসদে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। আর দশম জাতীয় সংসদে বিএনপি অংশ নেয়নি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় দুটি নির্বাচনেরই প্রয়োজন ছিল। তবে তুলনামূলক বিচারে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে বেশি। ১৫৪টি সংসদীয় আসনে (৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১২৮, ওয়ার্কার্স পার্টি ২, জাসদ ৩, জাপা-মঞ্জু ১, জাতীয় পার্টি-এরশাদ ২০) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া, ৫ জেলায় কোনো নির্বাচন না হওয়া কিংবা ৫২ ভাগ জনগোষ্ঠীর ভোট না দেওয়ার সুযোগ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য কোনো ভালো খবর নয়। এটা নিয়ে যে যুক্তিই আমরা টিভির টক শোতে দেখাই না কেন, এতে করে দেশে কোনো আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠতে সাহায্য করেনি। অথচ গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে আস্থার সম্পর্ক, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। পঞ্চম সংসদে (১৯৯১) এই ‘আস্থার সম্পর্ক’ ছিল বিধায় আমরা দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী এনে দেশে পুনরায় সংসদীয় রাজনীতির ধারা প্রবর্তন করেছিলাম। সেদিন বিএনপি সংসদীয় সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ধারণা করেছিলাম ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল তা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠতে পারছি বলে মনে হচ্ছে না।
এর পর এলো চলতি ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারির ঘটনা। বিএনপির ‘কালো পতাকা’ দিবসে পুলিশি হামলা প্রমাণ করল ‘আস্থার সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত সহজ নয়। আস্থার সম্পর্কের পূর্বশর্ত হচ্ছে, বিএনপিকে ‘স্পেস’ দেওয়া। অর্থাৎ বিএনপিকে তার কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া। এটা তো সত্য ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল, তার দায়ভার বিএনপি এড়াতে পারে না। বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারার সংস্কৃতি আর যাই হোক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য মানানসই নয়। ওই ঘটনায় বিএনপি তার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল বিএনপি ও ১৪ দল। কিন্তু আন্দোলন তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। অর্থাৎ সরকারের পতন হয়নি। কিন্তু সহিংসতায় অনেক মানুষ মারা গেছে। অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের করুণ কাহিনি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। টিভি পর্দায় তাদের আর্তি দেখে সাধারণ মানুষ কেঁদেছে। মানুষ বিএনপিকেই দোষারোপ করেছে। এটা থেকে বিএনপি বের হয়ে আসতে পারেনি। তার পরও কথা থেকে যায়। বিএনপি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকেছে। এটা সরকারের জন্য একটা প্লাস পয়েন্টও বটে। সরকার বিএনপিকে মূল ধারায় নিয়ে আসতে পেরেছে। এটাকে ধরে রাখতে হবে, যাতে করে বিএনপি ২০১৯ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপি অংশ না নিলে জটিলতা থেকে যাবে। তাতে করে কেউই লাভবান হবে না। সরকারের জন্য তো নয়ই, বিএনপির জন্যও নয়। তাই সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশের জন্য আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠা জরুরি।
এ দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য দুটো বড় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মানসিকতায় পরিবর্তন দরকার। মানসিকতায় যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে এ দেশে গণতন্ত্রের হাওয়া বইবে না। আর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি বিভেদ-অসন্তোষ থাকে, তাহলে এ থেকে ফায়দা নেবে অসাংবিধানিক শক্তিগুলো, যা গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গল নয়। দীর্ঘ ৪৫ বছর আমরা পার করেছি। আমাদের অনেক অর্জন আছে। অনেকগুলো সেক্টরে আমরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে আমাদের সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ, তৈরি পোশাকশিল্পে আমাদের সক্ষমতা, ওষুধশিল্পের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি নানা কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটা পরিচিতি আছে। আমরা সফটপাওয়ার হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছি। ‘নেক্সট ইলেভেন’-এ বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭-এর ঘরে থাকবে বলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এখন এই যে ‘অর্জন’, এই অর্জন মুখ থুবড়ে পড়বে যদি রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে দুটি বড় দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হয়। এই আস্থার সম্পর্ক শুধু দেশের বিকাশমান গণতন্ত্রের জন্যই মঙ্গল নয়, বরং দেশের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন উপরন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্যও প্রয়োজন। জনগণ এমনটি দেখতে চায়। সাধারণ মানুষ চায় দুটি বড় দলের নেতারা পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে কোনো বক্তব্য রাখবেন না। পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবেন। দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে। এই প্রতিযোগিতা হতে হবে রাজনৈতিক ও কর্মসূচিভিত্তিক। খালেদা জিয়ার সাজা হবে কী হবে না, এটা নিয়ে যত কম আলোচনা হবে, ততই ভালো। এটা আদালতের বিষয়। এ নিয়ে ‘জনমত’ সৃষ্টি করারও দরকার নেই। প্রধানমন্ত্রী পরোক্ষভাবে নির্বাচনী প্রচারণা এক রকম শুরু করে দিয়েছেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বগুড়ায় জনসভা করেছেন। সেখানে তিনি উন্নয়নের কথা বলেছেন। বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি বলে বিবেচিত। সেখানে তিনি বলেছেন, উন্নয়নে কোনো বিশেষ এলাকা বিবেচ্য নয়। এর অর্থ উন্নয়ন কর্মকা-কে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় নিয়ে আসবেন। সামনে আছে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের বিষয়টি, যা ২০১৮ সালে চালু হওয়ার কথা। হয়তো পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেই তিনি নির্বাচনের তারিখ দেবেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপি কী করবে? বিএনপির উচিত হবে ইস্যুভিত্তিকভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা। সিনিয়র নেতাদের উচিত বিভাগীয় শহরগুলোয় যাওয়া। খালেদা জিয়া বিভাগীয় শহরে জনসভাও করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত বিএনপিকে জনসভা করতে দেওয়া। আর এর মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে একটি নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।
তারেক শামসুর রেহমান
প্রফেসর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

‘শহীদ জিয়া শিশু পার্কের’ নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)

রাজধানীর শাহবাগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্কের’ নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। উন্নয়নের নামে কৌশলে নাম পরিবর্তনের এ উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পার্কটির পরিবর্তিত নাম হবে ‘সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক’। বর্তমানে এসংক্রান্ত একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করবে ডিএসসিসি।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, সোহরাওয়াদী উদ্যান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪০০-৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে শিশুপার্কটির উন্নয়নও করা হবে। এজন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুসারে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে ১৫৩ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। আনিছুর রহমান বলেন, শহীদ জিয়া শিশু পার্কটির আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের যে প্রকল্পপ্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে তাতে সেটির নাম ‘সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক’ নামকরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শহীদ জিয়া শিশু পার্কটির নাম পরিবর্তনের জন্য গত দেড়-দুই বছর আগে শাহবাগে মানববন্ধন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ডিএসসিসির কাউন্সিলরদের নিয়ে গঠিত নামকরণ সংক্রান্ত কমিটি শহীদ জিয়া শিশু পার্কের নাম ‘সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক’ নামকরণের প্রস্তাব করে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল নয়া দিগন্তকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনের উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। এ পরিকল্পনার মধ্যে শিশু পার্কটির উন্নয়নও রয়েছে। শহীদ জিয়া শিশু পার্কের নাম পরিবর্তন হবে কিনা তা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলতে পারবে।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, শহীদ জিয়া শিশু পার্কটি শাহবাগ থেকে সরানো নিয়ে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত এক রায় দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে রিট পিটিশন করা হলে উচ্চ আদালত পার্ক কর্তৃপক্ষের পক্ষে রায় দিয়ে নির্দেশনা দেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বিদ্যমান স্থাপনা অপসারণ করে এসংক্রান্ত কমিটি কর্তৃক চিহ্নিত স্থানগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, বিবেচনাপ্রসূত দৃষ্টিনন্দন ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর সরকার পার্কটি সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয় তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনকে (ডিসিসি) পার্কটি যথাস্থানে রেখে উন্নয়নের জন্য একটি পত্র দেয়। পত্র পাওয়ার পর ডিসিসি ২০১১ সালের ৩ মার্চ শহীদ জিয়া শিশু পার্ক উন্নতকরণের বিষয়ে জানতে চেয়ে পত্র দেয় এলজিআরডি এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। ওই দুই মন্ত্রণালয় একই বছরের ৭ জুন জানায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু পার্কটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণে ডিসিসি উপযুক্ত প্রকল্প গ্রহণ করবে এবং এর সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন ধরে চিঠি চালাচালি চলে এবং বিভক্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন দায়িত্ব নেয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগকে একটি প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। সে অনুযায়ী গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ১৫৩ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে অনুমোদনের জন্য ওই দুই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে ওই দুই মন্ত্রণালয় থেকে ডিএসসিসিকে এখনো কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি বলে জানা যায়।
শহীদ জিয়া শিশু পার্কের নাম পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক নামে যে প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে পার্কটির উন্নয়ন, আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজে ব্যয় হবে ১৫৩ কোটি টাকা। ব্যয়ের সারাংশে উল্লেখ করা হয়, রাজস্ব উপাদান খাতে কনসালট্যান্ট ফি দেড় কোটি টাকা, জ্বালানি খাতে ২৫ লাখ, পুরনো খেলনাসহ স্থাপনা অপসারণে ৫ কোটি এবং সভার সম্মানী বাবদ ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। এ ছাড়া মূল ব্যয়ের মধ্যে ৪৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে ৫০ লাখ টাকা, পাঁচটি গেটের জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা তল্লাশিসামগ্রী কেনায় দেড় কোটি, সীমানা প্রাচীর নির্মাণে ১৫ কোটি, ২০০ স্কয়ার ফিটের ৩০টি দোকান নির্মাণে আড়াই কোটি, দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার দু’টি টিকিট কাউন্টারসহ গেট নির্মাণে ৩ কোটি, শেল্টার শেড নির্মাণে দেড় কোটি, অফিস ভবন, পাবলিক টয়লেট, মসজিদ, স্টোর রুম, সিকিউরিটি রুম, আসবাবপত্রসহ মেরামত কারখানা নির্মাণে ১০০ কোটি, বৃক্ষ রোপণসহ সৌন্দর্য বর্ধনে ২ কোটি, বৈদ্যুতিক কাজের জন্য ২২০ কোটি, স্যানিটারি ও পানি সরবরাহে ৭ কোটি টাকা রয়েছে। খেলনাসামগ্রী কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছেÑ মিনি কোস্টার, কেরোসেল ডাবল ডেক, ভাইকিং ২৪ সেট, সুপার সুইং, টি কাপ ৩৬ সেট, স্পেস শাটল, মিউজিক বোট, জেলি ফিশ, ঘূর্ণায়মান বাগান ট্রেন, এয়ার বাই সাইকেল ১৫টি, আর্থ কোয়াক, ফোর ডি থিয়েটার এলার্ট, ক্লামবিং কার, নাচ পার্টি ও জাদুঘরসহ থিয়েটার।
ডিএসসিসির যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান নয়া দিগন্তকে জানান, বর্তমানে শহীদ জিয়া শিশু পার্কে ১১টি খেলনা সচল রয়েছে। সেগুলো হচ্ছেÑ রোমাঞ্চ চক্র, আনন্দ ঘূর্ণি, এসো গাড়ি চড়ি, উড়ন্ত বিমান, উড়ন্ত নভোযান, ফুলদানি আমেজ, ঝুলন্ত চেয়ার, লম্ফঝম্প, এফ-সিক্স জঙ্গি বিমান, রেলগাড়ি ও বিস্ময় চক্র। নতুন প্রকল্পের আওতায় আরো ১৫টি মজার মজার আধুনিক খেলনা সংযোজিত হবে। পার্কটির সম্প্রসারণ ঘটবে। বিনোদনে নতুন মাত্রা আসবে।
তিনি বলেন, শহীদ জিয়া শিশু পার্কটি ১৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে। শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমের জায়গা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রার্থিত কিছু জায়গা পেলে এর আয়তন বেড়ে যাবে। স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করা যাবে।
ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, শিশুদের বিনোদনের জন্য ১৯৭৯ সালে শহীদ জিয়া শিশু পার্কটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ১৯৮৩ সাল থেকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। শনি থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পার্ক চালু থাকে। শুক্রবার পার্কটি বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চালু থাকে। বুধবার সুবিধাবঞ্চিত ও অসচ্ছল শিশুদের বিনামূল্যে প্রবেশের ও খেলনায় ওঠার সুযোগ দেয়া হয়। রোববার পার্ক বন্ধ রাখা হয়। শিশুপার্কে প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজারের বেশি দর্শনার্থী আসে। তবে বিভিন্ন উৎসবে দর্শনার্থী কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
সরজমিনে দেখা গেছে, জিয়া শিশু পার্কে সরকারি ১১টি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় তিনটি খেলনা রয়েছে। চালুর সময় খেলনাগুলোর মেয়াদ ধরা হয়েছিল ১০ বছর। এখন এ পার্কের খেলনা যন্ত্রগুলো অনেক পুরনো হয়ে গেছে। সব ক’টি খেলনাই কারিগরি দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জোড়াতালি দিয়ে এগুলো সচল রাখা হয়েছে।
‘রোমাঞ্চ চক্র’ খেলনাটির বেহাল দশা। ‘উড়ন্ত বিমান’ নামক খেলনার পর্যাপ্ত সিটবেল্ট নেই। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখের সময় উড়ন্ত বিমানের সিটবেল্ট লাগানো হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে সিটবেল্ট ছাড়াই উড়ন্ত বিমান খেলনা চালাতে হয় বছরের বাকি সময়ে।
উড়ন্ত নভোযানেরও বেহাল দশা। নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই ঝুলন্ত তারে ঘুরছে শিশুরা। ‘ব্যাটারি কার’ খেলনাও অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ। ‘ফুলদানি আমেজ’ খেলনার বসার সিট, নিচের মেঝে ও দড়ির বেহাল দশা। ‘এফ-৬ জঙ্গি বিমান’ অত্যন্ত নোংরা। অনেক দিন ধরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বা রঙ করা হয় না। এ ছাড়া বিস্ময়চক্র, আনন্দ ঘূর্ণি, ঝুলন্ত চেয়ার, লম্ফজম্ফ ও রেলগাড়িরও করুণ দশা। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব খেলনা ঝুঁকি নিয়ে চালানো হচ্ছে। অনেক সময় শিশুরা খেলনা থেকে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ডিএসসিসির যান্ত্রিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, শহীদ জিয়া শিশু পার্কের অবস্থা খুব একটা ভালো না। অনেক পুরনো যন্ত্রাংশ দিয়ে কোনো রকমে খেলনাগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন।
সরকারি খেলনার বাইরে তিনটি খেলনা রয়েছে শিশুপার্কে। ডিএসসিসির অনুমতি নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ৯-ডি এনিমেশন ও দু’টি ঝুলন্ত নৌকার খেলনা রাখে। সবচেয়ে বেশি ফি আদায় করা হয় এ তিনটি খেলনায়। এসব খেলনা সাধারণ পরিবারের শিশুরা ব্যবহার করতে পারে না।
শিশু পার্কের ভেতর কিছু বৈধ দোকান বরাদ্দ দিয়েছে ডিএসসিসি। তবে এসব দোকানের মালিকেরা অবৈধভাবে পার্কের ভেতরে ফাস্টফুড বিক্রি করছে। দোকানের জন্য জায়গা নির্ধারিত থাকলেও দোকান মালিকেরা নির্ধারিত সীমানার বাইরে খোলা জায়গা দখল করে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে খাবার পরিবেশন করায় খোলা জায়গা কমে গেছে। ফলে দর্শনার্থীদের চলাচলে মারাত্মক বিঘœ ঘটছে।
শিশু পার্কের সামনের পার্কিংয়ের জায়গায় গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ দোকান। এ তালিকায় রয়েছে রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড, বিভিন্ন কসমেটিক সামগ্রীর দোকান। বিগত ছয় মাসে ডিএসসিসি একাধিকবার ওইসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও পুনরায় দখলদারেরা দোকানপাট বসিয়েছেন। জানা যায়, শিশু পার্কের সামনের পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধ অর্ধশতাধিক দোকানপাট থেকে ভাড়াবাণিজ্য করছেন স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতারা।
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বলেন, শিশু পার্ক কর্তৃপক্ষ বারবার হকার উচ্ছেদ করলেও তারা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় আবার বসে পড়ে। যার কারণে উচ্ছেদের কোনো সুফল পাওয়া যায় না।
শিশু পার্কের যত্রতত্র আবর্জনার ছড়াছড়ি। দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা রুটিন অনুযায়ী পার্ক পরিষ্কার করেন না বলে জানা গেছে। ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খোন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, প্রতিদিন শিশু পার্কের আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। তবে অবৈধ দোকানপাটের কারণে আবর্জনা বেশি হয় বলে তিনি জানান।
উৎসঃ nayadiganta

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ !

সারাদেশে চলমান পরিবহন ধর্মঘট প্রসঙ্গে …

“সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই পারেন। এটাকে ধর্মঘট নয় ‘স্বেচ্ছায় অবসর’ বলা যেতে পারে।”
-নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান

“আমাদের নেতা শাজাহান খান কেবিনেট মন্ত্রী। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললে দুই মিনিটের ব্যাপার।”
-বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাক চালক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। আবার তিনি পারিবারিকভাবে পরিবহন মালিক। তাঁর পরিবারের কোম্পানির অধীনে ঢাকা-মাদারীপুর ‘সার্বিক পরিবহন’ ও রাজধানীর মিরপুর-আবদুল্লাহপুর পথের ‘কনক’ পরিবহনের বাস চলাচল করে।

সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ উপদফা বলেছে, “এইরূপ কোন পদে নিযুক্ত বা কর্মরত ব্যক্তি কোন লাভজনক পদ কিংবা বেতনাদিযুক্ত পদ বা মর্যাদায় বহাল হবেন না কিংবা মুনাফালাভের উদ্দেশ্যযুক্ত কোন কোম্পানী, সমিতি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় বা পরিচালনায় কোনরূপ অংশগ্রহণ করবেন না।”

এটা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ !

এটা সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

ড. তুহিন মালিক

লেখক আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশ হঠাৎ ধর্মঘটে চরম বিপাকে দেশবাসী

হঠাত্ করেই পরিবহন ধর্মঘটে চরম বিপাকে পড়েছে দেশবাসী। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এত বড় কর্মসূচি আসায় স্থবির হয়ে পড়েছে দৈনন্দিন জীবন। রাস্তাঘাটে হাজারো যাত্রী গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে ঢাকা থেকে কোনো গাড়ি বের না হওয়ায় এবং ঢাকায় কোনো গাড়ি ঢুকতে না পারায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।
সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেয়ার প্রতিবাদে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিকেরা। এই কর্মসূচি থেকে সরেই এসেছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। কিন্তু ঢাকার সাভারে ট্রাকচাপায় এক নারীকে হত্যার দায়ে সোমবার এক চালককে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। এরই প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল থেকে হঠাত্ করেই ধর্মঘট শুরু করেছেন পরিবহনশ্রমিকরা।
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে ও দারুস সালামে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন শ্রমিকরা। অবরোধের কারণে কোনো যান চলাচল করতে পারছে না। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন।
বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বাসচালক জামির হোসেনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে এক ট্রাকচালকের মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাহার করতে হবে। এই দাবি না মানা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি চলবে। পাশাপাশি সারা দেশে ধর্মঘটও চলবে।’
সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকেও দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে না। শহরতলীর বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলে বাধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাড়ি না পেয়ে রাস্তায় নাকাল হতে হচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন রুটের যাত্রীরাদেরও। এছাড়াও খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় থেকে পরিবহন ধর্মঘট চলছে। সেখান থেকে সব ধরনের যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। এদিকে ধর্মঘটের কারণে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে কয়েকশ পণ্যবাহী ট্রাক আটকে পড়ায় ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছেন। বাস না থাকায় চাপ বেড়েছে ছোট যানবাহন ও ট্রেনে।

দুই বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ

নওগাঁর পোরশা উপজেলার নিতপুর সীমান্ত থেকে দুই বাংলাদেশীকে আটক করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ।

সোমবার রাতে ভারতের অভ্যন্তরে গরু কিনতে প্রবেশ করলে তাদের আটক করা হয় বলে দাবি করে বিএসএফ।

আটককৃতরা হলেন- উপজেলার বিষ্ণপুর বটতলি গ্রামের টুলুর ছেলে রাকিব (৩০) ও কলেরা গ্রামের মাইদুলের ছেলে আবুল কালাম(৩৩)।

স্থানীয়রা জানান, রাতে ১০/১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল গরু আনতে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এসময় ভারত সীমান্তে প্রবেশ করলে ক্যাদারীপাড়া ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা ভোর ৩টার দিকে তাদের ধাওয়া করে। এতে অন্যরা পালিয়ে আসতে পারলেও রাকিব ও কালামকে আটক করে বিএসএফ সদস্যরা।
১৪ বিজিবির অধিনায়ক কর্নেল আলী রেজা দুই বাংলাদেশীকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আটককৃতদের ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতের ক্যাদারীপাড়া ক্যাম্পের বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।