হারিয়ে যাচ্ছে ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্প

জুন ৭, ২০১৭ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ

কাঁসা তৈরির টুং টাং শব্দ আর ক্রেতাদের পদভারে একসময় মুখরিত থাকতো জামালপুর জেলার ইসলামপুরের কাঁসারীপাড়া। এখানকার কাঁসার কদর ছিল দেশজুড়ে। ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্পটি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল। এখন আর সেই চিত্র নেই। একদিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পুঁজির অভাব অন্যদিকে মেলামাইন ও প্লাষ্টিকসহ সহজলভ্য নানা সামগ্রীর দখলে থাকায় বাজারে টিকতে না পেরে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে ইসলামপুরের কাঁসাশিল্প।

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ইসলামপুরের ফকিরপাড়া গ্রামে কাঁসা শিল্প গড়ে উঠে। পরে এলাকাটি কাঁসারীপাড়া নামে পরিচিতি লাভ করে। এক সময় ইসলামপুরের কাঁসা শিল্প বিশ্ববাজারে বেশ কদর ছিল। আজ থেকে একযুগ আগেও কোনো বিয়ে-শাদী, আকিকা, সুন্নতে খৎনাসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসাবে দেওয়া হতো কাঁসার জিনিসপত্র।

এছাড়াও কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাকরিতে যোগদান কিংবা অন্যত্র বদলির সময় এমনকি কোনো এমপি-মন্ত্রীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তাদের সংবর্ধিত করা হতো কাঁসার তৈরি সামগ্রী দিয়ে। এসব নানা কারণে ক্রমেই কাঁসার জিনিসপত্র জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাই তখন সারাদেশ থেকে কাঁসা ব্যবসায়ীরা, কাঁসা সামগ্রী কিনতে ভীড় জমাতো ইসলামপুরে। কাঁসার কারখানাগুলোতে কারিগররা দিনরাত কাজ করেও কাঁসা সামগ্রী সরবরাহে হিমশিম খেতো।

ইসলামপুরের কাঁসা শিল্পীদের নিপুণ হাতের তৈরি কারূকার্যপূর্ণ নান্দনিক কাঁসা একসময় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে স্থান করে নিয়েছিল সুদুর লন্ডনে। তৎকালীন বৃটিশ সরকার ১৯৪২ সালে লন্ডনের বার্মিংহাম শহরে সারা বিশ্বের হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। ওই প্রদর্শনীতে ইসলামপুরের কাঁসা শিল্পের কারিগর স্বর্গীয় জগতচন্দ্র কর্মকার ইসলামপুরের কাঁসার তৈজসপত্রাদি প্রদর্শন করেছিল। ওই প্রদর্শনীতে ইসলামপুরের কাঁসা শিল্প সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্প হিসাবে স্বর্ণপদক লাভ করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে ইসলামপুরের কাঁসা শিল্পের পরিচিতি ঘটে। ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে পাঠ্যপুস্তকেও স্থান করে নেয় ইসলামপুরের কাঁসা শিল্প।

কাঁসা শিল্প কারখানায় কর্মরত কারিগররা জানালেন, কাঁসা হলো একটি মিশ্র ধাতব পদার্থ। তামা বা কপার ৮০০ গ্রাম এর সাথে টিনএ্যাংগট ২০০ গ্রাম মিশিয়ে আগুনে পুড়ালে ১ কেজি কাঁসা তৈরি হয়। এছাড়া তামা, দস্তা, রাং বা অন্যান্য ধাতব পদার্থ মিশ্রণ উপর নির্ভর করে এ শিল্পের স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা, মসৃণতা ও উজ্জ্বলতা।

ইসলামপুরের উল্লেখযোগ্য কাঁসার তৈজসপত্রাদির মধ্যে কাস্তেশ্বরী, রাজভোগী, রাঁধাকান্তি, বংগী, বেতমুড়ি, চায়নিজ, মালা, দরাজ, রাজেশ্বরী, রত্নবিলাস, ঘুটা ও কলতুলা নামে রয়েছে থালা ও গ্লাস।

কৃষ্ণচুড়া, ময়ুরকণ্ঠি, বকঠুট, ময়ুর আঁধার, মলিকা ইত্যাদি নামে পাওয়া যায় জগ। সাদাবাটি, কাংরিবাঠি, বোলবাটি, রাজভোগী, রাঁধেশ্বরী, জলতরঙ্গ, রামভোগী, গোলবাটি, কাজল বাটি, ঝিনাই বাটি, ফুলতুলি বাটি, মালা বাটি ইত্যাদি নাম রয়েছে বাটির নাম। বোয়াল মুখী, হাতা, চন্দ্রমুখী, চাপিলামুখী, পঞ্চমুখী, কবুতর বুটি, ঝিনাইমুখী ইত্যাদি নামে পাওয়া যায় চামচ।

সন্দেশ গ্লাস নামে একটি বিশেষ গ্লাস তৈরি হয়। এই গ্লাসটিতে চারটি পার্ট রয়েছে। ১ম পার্টে পানি, ২য় পার্টে মিষ্টি, ৩য় পাটে পানসুপারী এবং ৪র্থ পার্টে পান মসলা একই সাথে রাখা যায়।

এছাড়াও নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদির বাইরে রয়েছে কাঁসার তৈরি নানা সামগ্রী। পূজা-অর্চনায় মঙ্গল প্রদীপ, কোসাকুর্ষি, মঙ্গলঘট, ইত্যাদি কাঁসার বাদ্যযন্ত্র উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের মানুষজন ওইসব তৈজসপত্র বড় দরদ দিয়েই পারিবারিক ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করে আসছেন।

হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এ শিল্পের সাথে বেশি জড়িত ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ শিল্পের সাথে জড়িত অনেকেই দেশ ত্যাগ করে প্রতিবেশী ভারতে চলে যায়। পাকহানাদার বাহিনী কাঁসা শিল্পের সাথে জড়িতদের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ায় স্বাধীনতার পর অনেকেই দেশে ফিরে তাদের পৈত্রিক পেশা বাদ দিয়ে বর্তমানে অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়ে পড়েন।

বর্তমানে নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীর ধরণ বদলে যাওয়ায় এ শিল্পে ধ্বস নেমেছে। গত ১৫ বছরে কাঁসা-পিতলের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। কাঁচামাল ঊর্ধ্ব মূল্যের কারণে প্রতিযোগীতার বাজারে টিকতে পারছে না এ শিল্পটি।

অমল কর্মকার জানান, আগের মতো অর্ডার নেই তাই প্রায় সময় হাতে কাজ থাকেনা। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে দিন কাটালেও পৈত্রিক পেশার মায়ায় পেশাটি ছাড়তে পারছিনা। অনেকেই টিকতে না পেরে নানা পেশায় চলে গেছে। পৈত্রিক পেশা আঁকড়ে ধরে থাকা প্রায় ২০/২৫টি পরিবার আজও কাঁসা শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে।

ইসলামপুরের কাঁসা শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক অঙ্কন চন্দ্র কর্মকার জানান, কাঁসার নানা উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়েছে। তবে ক্রেতারা উচ্চমূল্যে খরিদ করতে চায় না। তাই বর্তমানে এ শিল্পের দুর্দিন চলছে। অনেকেই বাঁচার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। তবে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এ শিল্পটির হারানো ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1225 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com