হাম্বা! হাম্বা!!

সেপ্টেম্বর ১, ২০১৭ ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ

‘গোবেচারা’। লেজবিহীন কী নিরীহ একটা শব্দ! কী অদ্ভুত একটা অবলা বিশেষণ! খালি ‘বেচারা’ না। তার আগে একটা ‘গো’ আছে। ‘গো’—মানে গরু। তার মানে ‘গোবেচারা’ হলেন সেই অতি নিপাট ভদ্রলোক, যিনি গরুর মতো বেচারা। কারও সাতেও নাই পাঁচেও নাই। অর্থাৎ যিনি প্যাঁচ বাঁধাতে পারেন না; কিন্তু রেগুলার প্যাঁচে পড়েন।

মানুষরূপী এই অব্যক্ত হাম্বা সম্প্রদায় চার পায়ের অবলা গরুর কাছে চিরঋণী। গাইবান্ধার পাটের দড়িতে বজ্র আঁটুনি এবং ফসকা গেরোয় এই দুই আবাল্যের সাথির গাঁটছড়া বান্ধা।
শুধু কি গোবেচারারাই গরুর কাছে ঋণী? মোটেও না। ‘আবাল’বৃদ্ধবনিতার জীবনে-মরণে গরুর যে ভূমিকা, তা মামুলি ‘দি কাউ’ রচনা লিখে বোঝানো যাবে না।
ফল দেয় যে বৃক্ষ তাকে বলে ফলদ। বল দেয় যে গরু তাকে বলে বলদ। বলদকে বাল্যকালে খোজা করা হয় বলে তার আরেক নাম ‘আবাল’। দুধের বাছুরকে আবাল বানানো হলে তার নাম হয় ‘দুধ আবাল’। ‘বলদ’, ‘আবাল’ এবং ‘দুধ আবাল’—এই তিনটি অযুতবিশ্রুত শব্দ গ্রামবাংলায় অতি জনপ্রিয় বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তিবিশেষের প্রতি রাগ ঝাড়ার সময় এগুলো খুব কাজে দেয়।
‘আবাল’ বয়সে; মানে ইশকুলে পড়ার সময় ‘দি কাউ’ রচনা মুখস্থ করতে দিয়েছিলেন উপেন স্যার। পড়া ধরার পর ধরা পড়ে গেলাম। ‘দি কাউ ইজ এ ফোর ফুটেড অ্যানিমেল’—বলার পর দেখি আর কিছু মনে পড়ছে না। মাথা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে ভাসছে গোয়ালপালিত গরুর নয়নকাড়া এক জোড়া চোখ।
মুখস্থ পড়া ভুলে যাওয়ায় আমি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘অমলকান্তি’ কবিতার অমলকান্তির মতো মাথা চুলকাতে থাকি। জানালা দিয়ে উদাস চোখে আকাশের দিকে চাই। আকাশে ‘শুভ্র খণ্ডমেঘ। মাতৃদুগ্ধ পরিতৃপ্ত সুখনিদ্রারত/ সদ্যোজাত সুকুমার গোবৎসের মতো/ নীলাম্বরে শুয়ে।’ ঘুমিয়ে পড়া একটা সদ্যোজাত বাছুরের আকৃতি ধারণ করা এক খণ্ড মেঘের দিকে আমার গোবেচারা দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিকে সম্বল করে স্যারের মনে সিম্প্যাথি জাগানোর চেষ্টা। সাথে অসহায় বিড় বিড় আওয়াজ, ‘দি কাউ ইজ এ ফোর ফুটেড অ্যানিমেল…অ্যাঁ. . অ্যাঁ…’
স্যার ভাবলেন, পরের লাইনটা ধরিয়ে দিলে হয়তো ছেলেটা পারবে। তিনি বললেন, ‘ইট লিভস অন গ্রাস…তারপর কী বল…হোয়াট ইজ নেক্সট?’ আমার মাথা চুলকানি বেড়ে যায়। স্যার হুংকার দিয়ে ওঠেন। বেঞ্চিতে জোড়া বেত সপাং করে বাড়ি মেরে বলেন, ‘এই গরুর বাচ্চা গরু! বলিস না কেন, হোয়াট ইজ নেক্সট?’ আমি ভয়ের চোটে বলে ফেলি, ‘ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত! অ্যাঁ…অ্যাঁ…অ্যাঁ…।’ স্যার রক্তবর্ণ চোখে জিজ্ঞেস করেন, ‘মানে?’ আমি কাঁপতে কাঁপতে বলি, ‘দি কাউ ইজ দি ক্যাপিটাল অব বুড়িগঙ্গা! অ্যাঁ…অ্যাঁ…অ্যাঁ…বাথরুমে যাব।’ স্যার বেত বাগিয়ে বললেন, ‘নিল ডাউন! নিল ডাউন!’
টানা এক পিরিয়ড দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে কান ধরে আধা বসা আধা দাঁড়ানো অবস্থায় থাকতে হলো। নিচের দিকে মাথা; পশ্চাদ্দেশ ঊর্ধ্বমুখী। নাকের শিকনি-সর্দি বেয়ে বেয়ে ঝরছে। নাক ঝেড়ে আবার আগের পজিশনে যাওয়ার এজাজত চাইলাম। আবেদন খারিজ হয়ে গেল। অতি ধীর লয়ে নাসারন্ধ্র নিঃসৃত ঘনীভূত তরল পড়তে লাগল। সেই নিলডাউনের পর অবলা গরুর জীবনী আমার জন্মের মতো মুখস্থ হয়ে গেছে।
গরুর ব্যাপারে বৃদ্ধদের মত না নেওয়াই ভালো। গরুতে তাদের অনেকেরই অ্যালার্জি। অ্যালার্জির কারণেই তারা গরুর গোশত মুখে দেন না। তাদের কাছে নতুন প্রজন্ম হলো ‘গাধা-গরু’। এ কারণেই তাঁরা গাধা পিটিয়ে ঘোড়া এবং গরু পিটিয়ে মানুষ বানাতে চান।
‘আবাল’ এবং ‘বৃদ্ধের’ পর এবার ‘বনিতা’র কথা বলি। এক নারী সহকর্মীকে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে বলছিলাম, শাস্ত্রে আছে ‘পতি পরম গুরু’। খেয়াল ছিল না আজকালকার উত্তরাধুনিক স্ত্রী সম্প্রদায় সেই শাস্ত্রকথাকে নিরুত্তরাধুনিক ফরম্যাটে কনভার্ট করে ফেলেছে। সহকর্মীটি বললেন, ‘ভাইয়া, কথাটা একটু এডিট করে দিই; আসলে কথাটা হবে “পতি পরম গরু”।’ বরের প্রতি এই ‘গোমাতাসুলভ’ আচরণ দেখে তার মাথায় ‘গো’-‘বর’ ঢেলে দিতে মন চাইছিল। স্বামীকে গরুর মর্যাদা দেওয়া এই স্ত্রীকে আমি কবি জয় ‘গো’-স্বামীর মতো মিনমিন গলায় বলি, ‘গরুর সাথে এক গোয়ালে থাকেন; নজর রাইখেন, আবার গুঁতো না মারে!’
মনের মধ্যে প্রশ্ন ঠেলা দিয়ে উঠতে পারে, আচমকা এত ‘গরু গরু’ করা কেন? উত্তরটা ওয়াসার পানির মতো সোজা। দুই দিন বাদেই ঈদ। মানে কোরবানির ঈদ। আর কোরবানির কথা উঠলেই প্রথম যার নাম আসে, সে হলো ‘গরু’। রাজধানীর ‘হাটে মাঠে বাটে’ এখন গরু। অলি-গলি-গাবতলী সবখানে গরু।
জাত, অজাত এবং কুজাত—এই তিন প্রকার ভেদে গরু মূলত দুই প্রকার। একটি ‘দেশি’ আরেকটি ‘ইন্ডিয়ান’। দেশি গরু স্বায়ত্তশাসিত গোয়াল থেকে আসে। শেষোক্ত জন আসে বর্ডার পার হয়ে। পাসপোর্ট ভিসা কিছুই লাগে না। কখনো গভীর রজনীতে পায়ে হেঁটে; কখনো কপিকলে কাঁটাতারের বেড়া টপকে। সীমান্তের দুই পারে থাকে অতন্দ্রপ্রহরী। ট্যাঁকে কিছু গুঁজে দিলে অতন্দ্ররা গভীর তন্দ্রায় ডুবে যায়। তাদের তন্দ্রা বটিকার খরচ না দিয়ে পার হতে গেলেই গুলি। সেই গুলিতে গরুর রাহাবার ফেলানি খাতুনের মতো পড়ে থাকে।
এত দিন সীমান্তে কড়াকড়ি ছিল। ইন্ডিয়ান গরু ঢুকতে পারেনি। এতে বেজায় খুশি ছিলেন দেশি খামারিরা। অনেকেই দেশি গরুকে ওরাডেক্সান আর ইউরিয়া খাইয়ে বোগদাই বানিয়ে ফেলেছিলেন। আশা ছিল, কোরবানির হাটে ইন্ডিয়ান গরু থাকবে না; থাকবে দেশি ‘গো’ আর গো-বেচারা কাস্টমার। যা হোক টু-পাইস ট্যাঁকে আসবে। সেই আশার গুড়ে খাবলা খাবলা বালি ফেলে ইন্ডিয়ার বর্ডার শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। হাটে সমানে ঢুকছে ইন্ডিয়ান গরু। এতে ইন্ডয়ান গরুর যাচ্ছে ‘জাত মারা’; খামারিদের যাচ্ছে ‘ভাত মারা’ আর দেশি গরুর যাচ্ছে ‘ঘাস মারা’। বন্যাকবলিত এলাকার দেশি গরু ঘাসের অভাবে অনেক আগেই কোরবানি হওয়ার জন্য হাটে এসে বসে আছে। বাজার তাই কিছুটা ঠান্ডা। এতে স্বস্তিতে আছে মধ্যবিত্তের জান’ডা।
তারপরও ঠান্ডা মাথায় ভাবলে দেখা যাবে, এই সস্তার বাজারেও মানুষের জীবনের চেয়ে গরুর জীবনের দাম ঢের বেশি। এর জন্যই বোধ হয় সবাই গরু হতে চেষ্টা করে। কেউ এঁড়ে হয়, কেউ বলদ হয়, কেউ আবাল হয়, কেউ দুধ আবাল হয়। গাই হতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ বাংলার মরমি কবি তো আর খালি খালি বলেন নাই, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে গাই।’

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1173 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com