সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করেন চম্পা

মে ২৭, ২০১৭ ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

আঁটসাঁট বাঁধা চুল। তার ওপর খাকি ক্যাপ। চোখে চশমা। সালোয়ার-কামিজের ওপর সাদা অ্যাপ্রোন। পোশাকটা খানিকটা নার্সদের মতো হলেও তাঁর পেশা ভিন্ন। তিনি বিক্রি করেন দৈনিক পত্রিকা। চলেনও সাইকেল চেপে। বলতে গেলে তাঁর জীবন চলে সাইকেলের চাকায় ভর করে। তাঁর নাম চম্পা। পোশাকি নাম জান্নাতুল সরকার হলেও চম্পা নামেই পরিচিতি তাঁর।

প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পাবনার চাটমোহর উপজেলা সদরের বিভিন্ন অলিগলি ও বাজারে দেখা মেলে এই নারীর। সাইকেলের দুই পাশে দুই ব্যাগভর্তি সংবাদপত্র নিয়ে বিলি করেন চম্পা। ৩২ বছরের এই নারীর বাড়ি উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের মল্লিক বাইন গ্রামে।

সাইকেলে পত্রিকা নিয়ে ছুটছেন চম্পাসাইকেলে পত্রিকা নিয়ে ছুটছেন চম্পাজীবনের গল্প

জীবনে বহু ঘাত-প্রতিঘাত সয়েছেন জান্নাতুল সরকার। স্বামী–সংসার ছেড়ে আশ্রয় মিলেছে বাবার বাড়িতে। কাজের খোঁজে এখানে–ওখানে ঘুরেছেন। শেষ পর্যন্ত পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সংবাদপত্র সরবরাহ কর্মীর। দিনের অর্ধভাগ সংবাদপত্র সরবরাহ করেন। বাকি সময়টা পরিবারকে দেন। কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন বেশ। মানিয়ে তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাদের কাছে তিনি পত্রিকার হকার চম্পা।

কথা হয় চম্পার সঙ্গে। বাবা ইছাক আলী সরকার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকা পর্যন্ত সংসারে সচ্ছলতা ছিল। ২০০৪ সালে এইচএসসি পাসের পর চম্পার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। এর মধ্যেই বাবা মারা যান। সংসারে নেমে আসে অসচ্ছলতা। ভেস্তে যায় পড়ালেখার স্বপ্ন। ২০০৫ সালে তাঁকে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। সুখের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় সংসার। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই সেখানে শনি ভর করে। স্বামী নেশা করতেন। বিষয়টি জানার পর প্রতিবাদ করেন চম্পা। শুরু হয় অত্যাচার।

বাধ্য হয়ে এক বছরের মাথায় সংসার ছেড়ে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়ি। দুই বোন, চার ভাইয়ের পরিবার। অসচ্ছলতা সেখানেও অশান্তি নামায়। বড় বোনের বিয়ে হয়। ভাইয়েরা সব আলাদা সংসার গড়ে। ছোট এক ভাই ও মাকে নিয়ে তিনি শুরু করেন নতুন পথচলা।

২০০৭ সালে নিজের এলাকায় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক চাকরি নেন। সে কাজে কিছুদিন ভালোই চলে। এরপর বদলিজনিত কারণে চাকরিটা ছাড়তে হয় চম্পাকে। আবার শুরু হয় অভাব–অনটন। বহুভাবে কাজের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথাও মনমতো কাজ জোটে না। এবার নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

.গ্রাহকের হাতে পত্রিকা তুলে দিচ্ছেন চম্পাগ্রাহকের হাতে পত্রিকা তুলে দিচ্ছেন চম্পা২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচন করেন। কিন্তু হেরে যান। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন সংবাদপত্র বিক্রির। ২০১২ সালের শুরুর দিকে কোনো কিছু না ভেবেই একটি সাইকেল নিয়ে হাজির হন উপজেলা সদরে। মাত্র ১০টি পত্রিকা নিয়ে শুরু করেন সংবাদপত্র সরবরাহ কর্মীর কাজ।

চম্পাদের গ্রামের বাড়ি থেকে চাটমোহর উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতিদিন ভোরে গ্রাম থেকে সাইকেল চালিয়ে সদরে এসে পত্রিকা বিলি করা খুব সহজ ছিল না। এখন প্রায় ৩০০ পত্রিকা বিক্রি করেন প্রতিদিন। যা আয় হয় তা দিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই চলে সংসার।

চম্পা বলেন, ‘কোনো কাজই ছোট নয়, কোনো কাজই শুধু পুরুষের নয়। মনোযোগ ও সততা থাকলে সব কাজেই স্বীকৃতি মেলে। তাই আমিও কাজটি করতে পারছি।’

একজন নারীর সংবাদপত্র বিক্রিকে স্থানীয় লোকেরাও বেশ সম্মানের চোখে দেখছেন। দিনমজুর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত প্রত্যেক মানুষ এখন তাঁকে মূল্যায়ন করেন। অন্যদিকে নারী কর্মী হয়েও স্থানীয় সংবাদপত্র এজেন্টের কাছেও চম্পা মর্যাদায় আছেন।

হিসাব-নিকাশ, টাকাপয়সার লেনদেন—সবকিছুতেই চম্পা বেশ স্বচ্ছ বলে জানান চাটমোহর উপজেলা সদরের সংবাদপত্র এজেন্ট অজয় কুমার পাল। তিনি বলেন, ‘চম্পার ব্যাগে দিনে দিনে পত্রিকা বাড়ছে। সে খুব যত্ন নিয়ে কাজটি করে। দোকানে এসে নিজেই পত্রিকা গুনে, গুছিয়ে নেন। আবার মাস শেষ হতেই বিক্রির টাকা বুঝিয়ে দেয়। ফলে তার সঙ্গে কাজ করতে কোনো সমস্যা হয় না।’

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1339 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com