সাঁওতালী আহার্য ও রুচিবোধ : সীমান্ত সাহজাহান

মে ২৩, ২০১৭ ৫:০১ অপরাহ্ণ

: নগন্য পোষাক পরিচ্ছদের মত নগন্য আদিবাসীদের আহার্য দ্রব্যও। বাঙালীদের মতোই ভাত তাদের প্রধান খাদ্য। নৃতাত্বিকভাবে তারা যে বাঙ্গালী এই ভাত প্রিয়তা তার অন্যতম প্রমাণ।

কিন্তু তাদের মধ্যে দারিদ্র এত প্রকট যে, তারা ভাতের ফেনটুকুও খায়। ধনী ও ভদ্রলোকের বাড়ীতে যে ভাতের ফেন খায় গবাদি পশু ও অন্য গৃহপালিত জন্তুরা, সেই ফেনটুকুও অনেক আদিবাসীর ভাগ্যে জুটে না। কিন্ত তাদের মধ্যে ফেন খাওয়ার অভ্যাস শুধু দারিদ্রের জন্য নয়- খায় পুষ্টির জন্যও। অবশ্য ভদ্র লোকেরাও ফেন খায় কিন্তু সোজাভাবে খায় না- খায় চিকেন সুপের সঙ্গে মিশিয়ে। অন্যান্য খাদ্যের মধ্যে তারা সবই খায়। মাছ ও মাংস কিনে খাবার ক্ষমতা তাদের নাই। তবে মাছ খায় তারা খালবিল নালা নদীতে মাছ ধরে এবং মাংস খায় তারা বনে জঙ্গলে পশুপক্ষি শিকার করে অথবা বাড়ীতে গরু, শুকর, খাসী, ভেড়া ও হাঁস-মুরগী পালন করে। এছাড়া তারা অনেক ইতর জীবজন্তু খায়। ইঁদুর, কাঠবিড়ালী, শৃগাল, খরগোস, গুইসাপ ও সব রকমের কীটপতঙ্গ সবই তাদের প্রিয় খাদ্য। কথায় আছে তারা উড়োজাহাজ বাদে উড়ন্ত সবই খায় এবং নৌকা ছাড়া ভাসমান সবই ভক্ষণ করে। (They will eat anything that flies except Aero plans and they will sallow anything that swims except boats)

আর্থিক দুর্গতি ও ক্লিন্ন পরিবেশের মধ্যে বসবাস করার জন্য অন্যান্যোপায় হওয়ার দরুণ আদিবাসীরা সর্বপ্রকার কুখাদ্য ভক্ষন করে জীবন ধারণ করতে অভ্যস্থ হয়ে থাকে। তারা এত গরীব যে, ভাত ছাড়া অন্য কোন পুষ্টি জনিত সুস্বাদু খাদ্য বস্তুর স্বাদ তারা জানে না। আর সামান্য জানলেও সেটাকে তারা মনে করে ধনী ও ভদ্র লোকদের একমাত্র ভোগ্য। সব খাদ্য বস্তুর মধ্যে তাদের সর্বাধিক প্রিয় খাদ্য হল শূকর ও পরম প্রিয় পানীয় হল পঁচানী বা হাড়িয়া। কিন্তু দুটোই চরম নোংরা খাদ্য। কারণ কি ভাবে নমঃশূদ্রদের ঘরে শূকর পালন করা হয় ও পঁচানী তৈরি করা হয়- চাক্ষুষ দ্রষ্টাদের নিকট ওসব নিকৃষ্ট খাদ্যের ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রাখে না। পঁচানী পান করার জন্য তারা কিরূপ নেশা পাগল তার প্রমাণ মদ্যাসক্ত আদিবাসীদের মন খুড়ে দেখলেই বুঝতে পারা যায়। বিস্বাদ ও বিকট হলেও পঁচানী খুবই উত্তেজক পানীয়। অতি মাত্রায় এবং অসংখ্যবার পান করে তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মাতলামী, ফাজলামী নোংরামী প্রভৃতি ইতরোচিত আচরণ করতে তাদের খুব ভাল লাগে। ইদানিং শিক্ষিত ও সংস্কারকামী যুবকদের মধ্যে পঁচানী পানের জাতীয় কুঅভ্যাস অনেক পরিমাণে কমে গেছে এবং নোংরা অভ্যাসটি সমাজ দেহ থেকে মূলোৎপাটিত করার জন্য তারা এখন সমবেত ভাবে বদ্ধপরিকর। একমাত্র শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সংস্কার ও আর্থিক উন্নয়নের মাধ্যমে সামাজিক ব্যাধি নিরাময় করা সম্ভব হলে বলে আদিবাসী চিন্তাবিদগণ মনে করেন। বস্তুত খাদ্যাভাস গড়ে উঠে খাদ্যের প্রাপ্তি ও সহজলভ্যতার উপর। তাই এক সময় তারা পাহাড়ে বসবাসের কারণে সেখানে প্রাপ্ত খাদ্যদ্রব্যাদির উপর নির্ভর করতো, যা বেশী পাওয়া যেতো সেটাতেই অভ্যস্ত ছিলো। শিকার ছেড়ে তারা কৃষিতে অভ্যস্ত হওয়ায় কৃষিজপণ্যের উপর তাদের নির্ভরতা বাড়তে থাকে। আর আজকাল বহু সাঁওতালকে শহরে বসবাস করতে হচ্ছে, তাই তারা তাদের অতীতকে চর্চা করতে পারছেনা, তাদের অবস্থানের কারণে। শহুরে খাদ্যের উপর তাদের অভ্যস্ত হতে হচ্ছে, তবুও ঐতিহ্যের ডাক কি তারা অস্বীকার করতে পারবে, নাকি করবে। জীবন তাদের কাছ থেকে বহু কিছু কেড়ে নিয়েছে, আবার বহু কিছুতে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। হাড়িয়ার প্রতি টান, তাদের মজ্জাগত, রক্তের সাথে মিশে থাকা এক আহবান। তাইতো নানান উৎসবে, কোনো উপলক্ষ্যে সবার আগে চিন্তা থাকে পঁচানীর ব্যবস্থা হবে কিনা। অন্যের সম্পদের প্রতি ন্যুনতম লোভ লালসাহীন এই আদি সম্প্রদায় কখনোই বাড়তি কিছু আশা করেনা, সম্পদের পাহাড় কিংবা লুন্ঠন এদের রক্তে নেই, হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো সাঁওতালকে কারো সম্পদ চুরিতে দেখা যায়না। সুখে দুঃখে খেয়ে না খেয়ে ওরা দিনাতিপাত করছে কষ্টে শিষ্টে, তবুও বেঁচে থাকার আনন্দ তাদের মধ্যে আছে সবাইকে নিয়ে, কাউকে বঞ্চিত করে কখনোই নয়।
————————————————————————————
বি.দ্র.: আগামী পর্বে থাকবে সাঁওতালী শিল্পকলা ও সৃষ্টিশীলতা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি ।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1253 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com