শিশুদের পাশে যখন শিশুরাই

ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৭ ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

কতবেলের খোসা দিয়ে তৈরি মোমবাতির স্ট্যান্ড। খবরের কাগজ, পারফিউমের প্যাকেটে থাকা প্লাস্টিক, দাওয়াত কার্ড, ওয়ান টাইম প্লেট দিয়ে তৈরি কানের দুল, গলার মালা। গাড়ির ভাঙা কাচের টুকরার ওপর রং করে সাজানো হয়েছে ফটোফ্রেম। ডেস্ক ক্যালেন্ডার সুন্দর সুন্দর ফটোফ্রেম তৈরি করা হয়েছে। মেহগনির ছাল থেকে তৈরি হয়েছে লকেট। শ্যাম্পু, লোশনের পরিত্যক্ত বোতল প্রক্রিয়াজাত করে বানানো হয়েছে নানা ধরনের অলংকার।

আশপাশের ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র কোমল হাতের ছোঁয়ায় এমন দৃষ্টিনন্দন রূপ পেয়েছে। কোনো জিনিসই যেন ফেলনা নয়। একনজর দেখলে যে কেউ মনে করতে পারেন, এসব কোনো দক্ষ কারিগরের তৈরি। আশ্চর্যের বিষয় ৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরা এসব তৈরি করেছে দক্ষ একজন শিক্ষকের তদারকিতে। শুধু কাজটি শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এই শিশুরা। নিজেদের হাতের তৈরি জিনিসগুলো বিক্রি করছে। আর সেই অর্থ তুলে দিচ্ছে তারই সমবয়সী সুবিধাবঞ্চিত আরেক শিশুর হাতে।
শিশুদের আঁকা ছবি।রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার ৩ নম্বর সড়কে অবস্থিত চারুকানন নামের ছবি আঁকা ও কারুশিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০ জন শিশু সম্প্রতি এ ধরনের নানা পণ্য তৈরি করে বিক্রি করেছে। আর বিক্রি থেকে পাওয়া ২৫ হাজার টাকা তুলে দিচ্ছে রাজধানীর রায়েরবাজারে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এনজিও পরিচালিত একটি স্কুলে। কাল শনিবার চারুকাননের শিশুরা আনুষ্ঠানিকভাবে এ অর্থ তুলে দেবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে গড়া তহবিলে।

ফেলে দেওয়া সাধারণ জিনিসপত্র থেকে শিশুদের তৈরি গয়না।চারুকাননের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক সুকন্যা আইন প্রথম আলোকে জানান, গত বছর গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় ২০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে তাঁর ঝিগাতলার বাসায় আর্টক্যাম্প করেন। ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি, ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র থেকে তৈরি গয়না, কর্নার ল্যাম্প, শোপিস নিয়ে গত ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দুই দিনব্যাপী প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। প্রদর্শনী থেকে পাওয়া পুরোটা অর্থ তুলে দেওয়া হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের তহবিলে।
চারুকাননের শিশু শিক্ষার্থীরা।সুকন্যা আইন বলেন, ‘প্রদর্শনীতে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। শিশুদের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখে দর্শক-ক্রেতারা মুগ্ধ হয়েছিলেন।’ তিনি বলেন, চারুকাননের এই প্রদর্শনী অন্য কোনো সাধারণ প্রদর্শনীর মতো শুধু ছবি আঁকা বা কারুশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্বের একধরনের সেতুবন্ধন তৈরি হতে পারে। এ ধরনের কাজ শিশুদের নিজেদের ছাড়াও অন্যের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে শেখায়।
১৮ বছরের পুরোনো এই চারুকাননে পরিবারের নানা সমস্যায় প্রভাবিত শিশুদের বয়স অনুসারে আলাদাভাবে কাউন্সেলিং করা হয় বলেও তিনি জানান।

চারুকাননে দুই সন্তানকে ছবি আঁকা ও কারুশিল্প শিখতে পাঠিয়েছেন ফারজানা তুহিন। তিনি জানালেন, তাঁর দুই মেয়ে ফারিজা তানভীর (১৫) ও সাবিহা তানভীর (৮) তিন বছর বয়স থেকে চারুকাননে শিখছে। বড় মেয়ে ধানমন্ডিতে সেন্ট জেভিয়ার্স গ্রিন হেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে একই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।
চারুকাননের শিশু শিক্ষার্থীরা।শিশুদের সৃজনশীলতার জন্য এ ধরনের শিক্ষা খুব জরুরি বলে মনে করেন ফারজানা তুহিন। তিনি বলেন, ‘একক পরিবারগুলোতে শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বড় হতে শেখে। আমরা পরিবার থেকে তাদের সেভাবে সময় দিতে পারি না। শেখাতে পারি না। আমার সন্তানদের ক্ষেত্রে দেখেছি, তারা এত বেশি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হচ্ছে যে, তাদের বয়সী অন্য এক শিশু যে মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হতে পারে সেটা তাদের ধারণাতেই ছিল না। এখন আমার সন্তানদের দেখি, তারা অন্যদের সঙ্গে সবকিছু ভাগাভাগি করে নিতে চায়। স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তার কাজ আরেক শিশুর উপকারে আসবে এটা ভাবতে তারা ভালোবাসে। আনন্দ নিয়ে কাজগুলো করে।’
মায়ের কথায় যেন সায় দিয়ে আট বছরের ছোট্ট সাবিহা বলল, বিভিন্ন জিনিস দিয়ে গয়না বানাতে তার খুব ভালো লাগে। বেশি ভালো লাগে ছবি আঁকতে। তার আঁকা কয়েকটি ছবি বিক্রি হয়েছে।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1199 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com