মেঘের বাড়ি

অক্টোবর ১৬, ২০১৭ ৬:২২ অপরাহ্ণ

:: সাব্বির ইমন

“অংক টা একটু খেয়াল করে দেখো। মন দাও আপু!”
ইমন একটু রাগ করেই বল্লো। আজ মিতুর পড়ায় মন নেই। এমনি তে মিতু খুব ই ভালো পড়াশোনায়। ক্লাসের সেকেন্ড গার্ল। মিতু ক্লাস সেভেনে পড়ে। খুব লক্ষী একটা মেয়ে। ইমন তিন টা টিউশনী করে। এর মধ্যে এই টিউশনী টা খুব দামী। মাসে ছয় হাজার পায়। বাকী দুই টা এলেবেলে টাইপ।
মিতুর বাবা লোক টা কেমন ইমন বুঝতে পারে না। খুব ই বড়োলোক। দেখা হলে ইমন সালাম দিলে লোক টা কেমন একটা ঘোৎ টাইপের শব্দ করে। আর কিছু ই বলে না। কেমন পড়া চলছে, মিতুর কি অবস্থা জানতে ও চায় না।
অবশ্য মিতুর মা খুব ভালো মানুষ। অনেক বেশি মা মা টাইপের। খুব যত্ন করে নাস্তা দেয়। টুক টাক কথাবার্তা বলে। টিউশনি টা খুব প্রয়োজন ছিলো ইমনের। এক বড় ভাই প্রথম মাসের অর্ধেক বেতন তাকে দেবার চুক্তি তে ইমন কে টিউশনি টা পাইয়ে দিয়েছিলো।
মিতু বার বার ঘড়ি দেখছে। ইমন এবার ভ্রু কুচকে বল্লো, “কি ব্যাপার মিতু, পড়ায় মন নাই ক্যানো?”
মিতু খুব রহস্য নিয়ে বল্লো, “আজ একটা বড় সারপ্রাইজ আছে ভাইয়া। আপনি একটু থাকেন প্লিজ!”
ইমন পড়া শেষ করে উঠতে যাবে, মিতু বার বার জোড় করছে, “ভাইয়া, প্লিজ, প্লিজ থাকেন একটু”
মিতুর মা স্মিত হেসে বল্লো, “থাকো একটু, মিতুর সারপ্রাইজ টা দেখেই যাও”
ইমন ইতস্তত করে বসে রইলো। কিছুক্ষন পর গ্যারেজে বেশ হৈচৈ শুরু হলো। মিতু ও ছুটে গেলো। ইমন ও নিচে নামলো।
একটা চকচকে কালো বি,এম,ডব্লিউ গাড়ি গ্যারেজে দাঁড়িয়ে আছে। মিতুর বাবা ইমন কে দেখে যথারীতি একটা ঘোৎ সাউন্ড করলো। কিন্তু সে তার স্ত্রী কন্যার সাথে বেশ কথা বলছে।
গাড়ি টার দাম দেড় কোটি টাকা। মিতু মারাত্নক খুশি। সে খুশি তে লাফাচ্ছে। গাড়ি টা অসম্ভব সুন্দর। ইমনের খুব ইচ্ছে করছে গাড়ি টার ভেতরে একটু বসার। স্টিয়ারিং টা ধরার। স্টিয়ারিং টা নাকি ম্যাপল উডের।
“ভাইয়া, আমার সারপ্রাইজ দেখেছেন!!!”
“হুম, খুব সুন্দর, মন দিয়ে পড়া শুনা কর বলে তোমার বাবা তোমাকে এই সারপ্রাইজ টা দিয়েছে, সব সময় বাবা মা এর কথা শুনবে, বাবা মা এর স্বপ্ন পূরনের চেষ্টা করবে”
ইমন মিতুর মাথায় হাত রাখলো। মিতুর মা বল্লো, “বাবা উপরে চলো, গাড়ি উপলক্ষে একটু ডিনারের আয়োজন করেছিলাম, খেয়ে যাও।”
ইমন না বলার আগেই মিতুর বাবা বল্লো, “থাক, উনার দেরী হচ্ছে, কি দরকার”
ইমন লজ্জায় নিচু হয়ে গেলো। মিতু টা ঘ্যান ঘ্যান করছেই। ইমন জোড়জাড় করে বিদায় নিলো।
সারা রাস্তায় ইমনের মাথায় বি,এম,ডব্লিউ টা ঘুরছে। দেড় কোটি টাকা!!! গত বছর এক রাতে অহনা ফোনে বলেছিলো, “তোমার যদি তিন চার টা লাখ টাকাও থাকতো, আমরা পালিয়ে যেতাম”
ইমনের পালানো হয় নি অহনার হাত ধরে। ইমনের তখনো পড়াশুনা শেষ হয়নি। আরো এক বছর বাকি ছিলো। আর ইমনের ঢাকা শহরে একটা সভ্য ভাবে থাকার যায়গাও নেই। অহনার বাবা অহনাকে বিয়ে দিয়ে দিলো চমৎকার একটা ছেলের সাথে। হায় রে তিন লাখ টাকা! ইমন সংখ্যায় প্যাচ লাগিয়ে ফেলছে। যখন ই কেউ বড় কোনো সংখ্যা বলে, ইমন মনে মনে এক এর পেছনের শূন্য গোনা শুরু করে। একক, দশক, শতক, হাজার, অযুত, লক্ষ, নিযুত, কোটি…
অহনার তিন লাখের কথা টা বলার সময় ও ইমন শূন্য গোনার চেষ্টা করছিলো। আজ গাড়ি র দাম টা শুনে ও একই কাজ করলো। দেড় কোটি তে এক আর পাচের পিছনে ছয় টা শূন্য, নাকি সাত টা শূন্য? পাচ টা গন্ডোগল লাগিয়ে দিয়েছে!
ধূর! কি সব চিন্তা করছে। ইমন একটা সিগারেট ধরালো। অহনা সিগারেট ধরালে প্রচন্ড রাগ করতো। একদিন তো ইমন সিগারেট ধরানোর কারনে রাগারাগি করে চলেই গিয়েছিলো। পরে মাফ টাফ চেয়ে একাকার কান্ড। “প্রতিদিন এক প্যাকেট সিগারেট খাও!! মাসে কত টাকা লাগে? আটাশ শ টাকা! মানে তিন বছর সিগারেট না খেলে এক লাখ টাকা জমে যাবে! আর ফুসফুস টা ও বেচে যাবে! খবরদার! আর সিগারেট খাবা না!”
এক লাখে এক এর পেছনে পাচ টা শূন্য। যাক! প্যাচ লাগে নাই! ইমন খুব লুকিয়ে সিগারেট খেতো। অহনা দেখলে!!!
আশ্চর্য! কয়েকদিন আগে রাস্তায় অবিকল অহনার মতো একটা মেয়ে দেখেছিলো ইমন। দেখার সাথে সাথেই সিগারেট টা হাত থেকে অটোমেটিক পরে গেলো! ক্যানো এমন হলো! অহনা ঢাকাতে কিভাবে আসবে! ও থাকে ইউ,এস,এ!
ইমন মেসে ফিরে গেলো। মিতুর মা ডিনারের জন্য সেধেছিলো। মিস্টার ঘোৎ ওই ভাবে না বললে ইমন খেয়ে আসতো! পোলাও এর গন্ধ টা এখনো মাথার ভেতর সূক্ষ্ম ভাবে আন্দোলিত করছে।
পোলাও, কাটা মশলার মাংস, ইলিশের কোর্মা, বেগুন ভাজি, চিংড়ির মালাইকারি!!! ইমনের সত্যি সত্যি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে! নাহ! রান্না ঘরে ঠান্ডা ভাত, করল্লা ভাজি আর অসহ্য তেলাপিয়ার একটা পিস।
সমস্যা নাই, আজ ইমন মুণি ঋষি – যা খাবে, তা ই পোলাও এর মতো লাগবে। খাওয়ার মাঝে মা ফোন দিলো।
“কি রে বাবা! খেয়েছিস? কি দিয়ে খেলি”
“এই তো মা, ভালোই খেয়েছি”
“আজ খুব মন চাচ্ছিলো, তোকে একটু পোলাও রেধে খাওয়াই”
মা এর গলা টা ধরে এলো। ইমন এর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। “হ্যালো, হ্যালো! মা, মা, নেটওয়ার্ক পাচ্ছি না” – ফোন কেটে দিলো ইমন।
দিন দিন ইমন কেমন বাচ্চা মেয়ে দের মতো হয়ে যাচ্ছে! এতো অভিমান, ভালোবাসা, কষ্ট তার মতো ছেলের থাকা উচিৎ না।
ইমন সিগারেট ধরিয়ে মেসের ময়লা বারান্দাটায় দাড়ালো। আকাশ দেখা যায় না, কিন্তু আজ সে কল্পনা করছে ক্যাসিওপিয়া আকাশের মাঝে। তার পাশে অহনা, চমৎকার একটা শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি সুন্দর একটা মুখ!
রুমে রাসেল ঘড় ঘড় করে নাক ডাকছে। রাসেল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সাথে পার্ট টাইম জব করে। ছেলে টা অসহ্য লেভেলের যন্ত্রণাদায়ক। এখন ইমন লাইট না জ্বালিয়ে নিজের খাটে শুয়ে পড়লো। লাইট জ্বালালেই হয়তো দেখবে রাসেলের লুঙ্গি কোমরের উপর উঠে আছে। সে মহা আনন্দে ঘুমাচ্ছে। হা করে ঘুমাচ্ছে, লালা বালিশে মেখে টেখে অস্থির। এই দৃশ্য দেখার চেয়ে অন্ধকারে কাজ করেই ইমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রাতে একটা অদ্ভুৎ স্বপ্ন দেখলো। একটা বি,এম,ডব্লিউ গাড়ির সাথে তার বিয়ে হয়েছে। গাড়ি টা পিংক কালারের। সে আবার কথা ও বলতে পারে। সে আহ্লাদী ঢং এ ইমন কে বলছে, “তুমি আমাকে একদম ভালোবাসো না! জানো! আমার দাম পাচ কোটি টাকা! ওহ! তুমি তো আবার পাচের পর কয় টা শূন্য দিলে পাচ কোটি হয়, সে টা ও জানো না!” ইমন লজ্জা পাচ্ছিলো। ইমন স্বপ্নের ভেতর ই ভাবছে, বউ বি,এম,ডব্লিউ হলে, শ্বশুর, শাশুড়িও কি বি,এম,ডব্লিউ হবে?
সকালে রাসেলের সাথে নাস্তা করছে ইমন। রাসেল কুৎসিৎ ভাবে প্লেট থেকে চেটে চেটে ডিমের কুসুমের অবশিষ্টাংশ খাচ্ছে। চড় মারার ইচ্ছা দমন করে ইমন চা এ চুমুক দিতে দিতে রাসেল কে বল্লো, “আচ্ছা, একটা বি,এম,ডব্লিউ এর দাম কতো?”
রাসেল অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। “বস, বি,এম,ডব্লিউ জাঙ্গিয়া?” ইমন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। রাসেল দাত বের করে বলে, “বস, বি,এম,ডব্লিউ গাড়ির দাম আপনে বা আমার মতো লোক নিশ্চই জানতে চাইবো না, তাই গেস কইরা নিলাম।”
ইমন একটা টেক্সটাইল কোম্পানির ছোটখাটো কন্সাল্টেন্সি করে দিচ্ছে। মালিক বলেছে যদি ইমনের ডিজাইনে এনার্জি সেভিংস হয়, তাহলে সেটা কমিটি তে পাশ করিয়ে ইমন কে একটা ভলো এমাউন্ট দেয়া হবে। ইমন বেশ ভালোই খাটাখাটনি করছে। বেশ মোটা একটা প্রপোজাল বানানো হয়েছে। প্রায় দশ বারো হাজার খরচ করে ফেলেছে।
আজ কোম্পানির ম্যানেজার সুসংবাদ দিলো, “ভাই, আপনার প্রপোজাল তো অ্যাক্সেপ্টেড! কংগ্রাচুলেশন্স!” ইমনের আনন্দে চোখে পানি চলে এলো। ইমন তেজগাও এর কাছে ই ছিলো। সে অফিসে গেলো। তার ডিজাইনে ফ্যাক্টরির একটা অংশ হচ্ছে, হোক ছোট একটা অংশ, তারপরও, তার একটা অবদান থাকবে। ভাবতেই অসম্ভব আনন্দ হচ্ছে। মন চাচ্ছে অহনা কে জানাতে! কোম্পানির জি,এম তাকে বেশ খাতির করলো। চা টা খাওালো। “ভাই, ফাটায়া দিসেন! এম,ডি স্যার তো ইমপ্রেসড! আপনাকে ডাকবে প্রিটি সুন! আপনার জন্য পাচ লাখ টাকা রেকমেন্ড করেছে এমডি স্যার”
ইমন চায়ে চুমুক দিচ্ছে। এই অফিসের চা ইমনের খুব ই বাজে লাগে। মনে হয় কফিনের চায়ে দুধ গুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ সেই চা ইমনের বেস্ট দার্জিলিং এর চা মনে হচ্ছে। আসলে সব ই রিলেটিভিটি। এই যে ইমনে চোখে পানি চলে আসছে! এই টা ও মনে হচ্ছে রিলেটিভিটি। অহনার বিয়ের দিন ও পানি আসে নি। আজ আসছে। সে দিন পাজর টা গুড়িয়ে যাচ্ছিলো, সেটা ভিন্ন কথা!
ইমন বের হয়ে সামনে এক্সিকিউটিভ মোটরস এর শো রুম দেখলো। ভেতরে ঢুকতে লজ্জাই লাগছে। অনেক আগে অহনা কে নিয়ে একটা গাড়ির দোকানে ঢুকেছিলো ইমন। অহনার একটা লাল রঙ এর গাড়ি পছন্দ হয়েছিলো। ইমন খুব আগ্রহ নিয়ে সেলস ম্যান কে দাম জিজ্ঞাসা করতে সেলস ম্যান কান চুলকাতে চুলকাতে বলেছিলো “পনেরো”
ইমন বোকার মতো বল্লো, “বাকি টা কি”
সেলস ম্যান হাই তুলে বলে, “বুইঝা নেন!!!” অহনা চাপা গলায় বল্লো, “চলো”
পনেরো লাখে, এক আর পাচের পেছনে পাচ টা শূন্য। হয় দশ হোক, নয় বিশ হোক! এই সব ভাঙতি সংখ্যা সত্যিই খুব জ্বালাতন করে।
আজ এক্সিকিউটিভ মোটরস এর সেলস ম্যান টা খুব ই ভালো! অনেক সন্মান করে কথা বল্লো। ইমন একটা মলিন শার্ট পড়ে আছে। সেলস ম্যান এই সবের ধার ই ধারলো না। “স্যার, প্লিজ এই দিকে আসেন, দিস ইজ আওয়ার নিউ অ্যারাইভাল, সেভেন সিরিজ।”
সে বিভিন্ন ফিচারস বলছে।
ইমন গম্ভীর ভাবে বল্লো, “প্রাইস কতো”
স্যার “থ্রি ক্রোর”
ইমন ঠান্ডা গলায় বল্লো, “ভাই, তিন কোটি, মানে, একক, দশক, শতক, হাজার, অযুত, লক্ষ, নিযুত, কোটি… তিন এর পেছনে সাত টা শূন্য!”
সেলস ম্যান কিছুক্ষন তাকিয়ে হেসে ফেল্লো। “স্যার, সমস্যা নেই, আপনি দেখেন, ভেতরে বসে দেখেন, ড্যাশ বোর্ড টা খুব ইউনিক। ইন্টেরওর লাইটিং ও দারুন। প্লিজ স্যার হ্যাভ আ লুক”
ইমন ভেতরে বসলো। স্টিয়ারিং এ হাত রাখলো। সেলস ম্যান হেসে বল্লো, “আজ না হোক, কাল, কাল না হোক অন্য কোনো দিন, আপনি স্যার এই রকম গাড়ি কিনবেন, ভালো মতো দেখে নিন। হয়তো কোনো দিন আপনি এর চেয়ে দামী গাড়ির ওনার হবেন। স্বপ্ন দেখি বলেই তো আমরা বেচে থাকি”
ইমন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। “ইউ আর আ প্রমিজিং সেলস ম্যান”
লোক টা এক প্রকার জোড় করে তাকে একটা স্যান্ডউইচ আর কোক খাইয়ে দিলো।
মানুষ সবাই খারাপ না।
সন্ধ্যায় মা ফোন দিলো। … … … বাবা! বাবার হার্টে তিন টা ব্লক ধরা পড়েছে। অপারেশন করতে হবে সাত দিনের ভেতর। ঢাকায় নিয়ে আসতে হবে। নেত্রকোনায় চিকিৎসা হবে না।
বাবা!!! এই জীবনে এই লোক টা অনেক অনেক যুদ্ধ করে গেছে। দুই ছেলে আর এক মেয়ে কে মানুষ করতে গিয়ে আজ সে নিঃস্ব। তবুও এক টা কিছু সে কখনো চায়নি তার সন্তান দের কাছে। ইমন একপ্রকার জোর করেই প্রতি মাসে টাকা পাঠায়। বাকি ছেলে মেয়ে কি করে ইমন জানে না। তার বড় ভাই অনেক দূরে চলে গেছে। যোগাযোগ ও করে না। এই নিয়ে মায়ের তীব্র কষ্ট ইমন বোঝে। বোন টা আছে তার সংসার নিয়ে।
বাবা ইমনের সব ছোট্ট ছোট্ট চাহিদা পূরন করতো। নিজে হয়তো সারা মাসে দুইটা একটা শার্ট পড়তো, কিন্তু ছেলে মেয়ে দের কারো কাছে কখনো ছোট হতে দেয়নি। ছেলে মেয়ের শখ পূরন করা তার কাছে ছিলো প্রধানতম কাজ। আজ সেই বাবার চিকিৎসার জন্য তিন লাখ টাকা তাকে জোগাড় করতেই হবে।
ইমন ছোট্ট করে শুধু বল্লো, “মা, কোনো চিন্তা ই করবা না। দুই তিন দিনের মধ্যে আমি গিয়ে তোমাদের নিয়ে আসছি। বাবার অপারেশন হচ্ছে।”
মা কাদছে। তার জীবনে এই লোক টা ছাড়া আর কেউ নেই। ভালোবাসার মানুষ কে হারানোর ভয় খুব বেশী দূর্বিসহ।
ইমন কিছুদিনের মধ্যে সেই কোম্পানি থেকে পাচ লাখ টাকা পাচ্ছে। ইমন অফিসে গেলো।
জি,এম অনেকক্ষন পর দেখা করলেন। “ভাই রে! এতো তাড়াতাড়ি তো হবে না! এম,ডি স্যার বিজনেস মিটিং এ চায়না গিয়েছেন। তিন দিন পর আসেন।
তিন দিন পর ইমন গেলো। চার ঘন্টা বসে রইলো। দুই কাপ চা খেলো। কেউ ই দেখা করলো না। অফিসে কি নাকি মিটিং চলছে। আজ হবে না।
মা বাবা কে ঢাকা নিয়ে এসেছে ইমন। আপাতত খালার বাসায় উঠেছে। খালার মুখ কালো। টাকা পয়সার কথা শুনে মনে হলো মূক-বধির হয়ে গেলো। তিন লাখ টাকা!!! এই মাসের শেষে তিন হাজার ই তো ম্যানেজ করা কঠিন। জোগাড় করবেন কিভাবে?
আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলো এর উপর সিন্দাবাদের ভূতের মতো আপনারা ঘাড়ে চড়ে বসেছেন, কয়দিন থাকবেন কে জানে!
ইমন পাগলের মতো টাকা জোগাড়ের চেষ্টা চালাচ্ছে। তার কাছে আছে পয়তাল্লিশ হাজার টাকা। হাজারের ঘরের শূন্য নিয়ে ইমনের সমস্যা হয় না। অনেক টাকার প্রয়োজন।
রাসেল! এই অসহ্য চরিত্র টা হঠাৎ একটা বান্ডিল নিয়ে ইমন কে দিলো। “বস, এই খানে পচিশ আছে। আমার যতখানি সম্ভব ধার দিলাম। আমার টাকা যখন খুশি রিটার্ন কইরেন। বস, বাপ টারে বাচান।” রাসেলের চোখে পানি। আজই ইমন জানলো, প্রায় বিনা চিকিৎসায় ছেলে টার বাবা মারা গিয়েছিলো।
সন্ধ্যা তে টিউশানি ছিলো মিতুর বাসায়। আজ ইমন পড়িয়ে মিতু কে বল্লো, “তোমার আম্মু কে একটু ডাকবে?” – কেন জানি ইমনের মনে হচ্ছে এই ভদ্রমহিলার মাঝে মা ভাব টা প্রবল। উনি সব শুনে কিছু না বলে উঠে গেলেন।
ভেতরে উচ্চ স্বরে বাক্যালাপ হচ্ছে। ইমন শুধু মিষ্টার ঘোৎ এর কিছু উত্তপ্ত বাক্য শুনলো “দেখো শারমিন! এই সব বাটপারি গল্পে তুমি গলতে পারো, আমি না! আমি মানুষ চড়ায়া খাই, এই সব লো ক্লাস ছেলে পেলে দের কথা কিভাবে তুমি বিশ্বাস কর! অবাক লাগে! এই সব মাস্টার, ড্রাইভার, কাজের লোক রা হইলো এক জাতের। এরা বাটপারি তে ওস্তাদ! এরপর ও যদি চাও পাচ হাজার টাকা দিয়ে দাও”
ইমন একজন শিক্ষক। আজ ইমনের লজ্জা লাগছে। খুব বেশি লজ্জা। মিতু কে কিছুদিন আগে আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেটের একটা উক্তির ব্যাখ্যা দিয়েছিলো – “আমি বেচে থাকার জন্য বাবার কাছে ঋণী, কিন্তু বাচার মতো বেচে থাকার জন্য আমার শিক্ষকের কাছে ঋণী।”
মিতু আজ ওর বাবার সব কথা ই শুনছে। নিশ্চই তার ছোট্ট মনে অনেক প্রশ্ন এসেছে! শিক্ষক কে সে হয়তো সন্মান করতো! এখন কি করবে???
দুই লাখ টাকা আসলে ওর চাওয়া টা ঠিক হয়নি! একজন সামান্য গৃহশিক্ষক কে কেউ ই দুই লাখ টাকা ধার দেবে না। এই মহিলা টা অনেক বেশী সরল, তাই হয়তো চেষ্টা করেছিলো। বেচারী অনেকক্ষন হয়ে গেলো ইমনের সামনেই আসছে না।
উনি এলেন। দুই লাখ টাকার পেছনের পাচ টা শূন্য যে অনেক কঠিন একটা ব্যাপার ইমন আজ বুঝতে পারছে। উনি ইমন কে বললেন, “বাবা, আমার কাছে এতো টাকা নেই, কিন্তু কাল সকালে এসো, আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করবো”
ইমন হেসে বল্লো “আন্টি, আপনি সত্যিই আমার মায়ের মতো ই! আমার টাকা টা জোগাড় হয়েছে। টাকা লাগবে না। এই মাত্র আমার মামা ফোন দিলো, আপনাকে কষ্ট দিলাম আন্টি, সরি”
উনি ইমনের মাথায় হাত রাখলো। “তুমি, কাল আসবে!”
ইমন বাড়ি থেকে বের হলো। কাল বাবা কে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। দুই দিনের মধ্যে অপারেশন। মা জানে টাকা জোগাড় হয়েছে। থাক! জানুক। আশা ভাঙ্গার কষ্ট অনেক।
সেই তিন লাখ টাকা! তিনের পেছনের পাচ টা শূন্য! যা একদিন জোগাড় হয়নি বলে অহনা আজ অনেক দূরে। আবারো সেই তিন লাখ টাকা! আজ তার সব চেয়ে প্রিয় মানুষ কে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আজ ও কি সে তিনের পেছনের শূন্য গুলো শুধু গুনেই যাবে?
রাতে একটা স্বপ্ন দেখলো ইমন। ওই এম,ডি সাহেব তার ভাঙ্গা মেসে এসেছেন। “কি ব্যাপার ইমন, মন খারাপ করে বসে আছো! তোমার বাবার অপারেশন করাবে না! বি,এম,ডব্লিউ টা কিনবে না! অহনা কে তো নিয়ে এলাম, বিয়ে টা ও তো করানো প্রয়োজন। অনেক টাকা লাগবে।”
তার হাতে একটা চেক বই। উনি টাকার অংক বসাচ্ছেন! এক এর পেছনে অনেক অনেক অনেক শূন্য! এতো শূন্য দিলে তো অনেক টাকা হয়ে যাবে। এক্সিকিউটিভ মোটরস এর সেই সেলসম্যান বি,এম,ডব্লিউ সেভেন সিরিজের গাড়ি টা চালিয়ে নিয়ে এসেছে। ভেতরে অহনা। পরীর মতো সেজেছে। আর রাসেল! ওর আনন্দ দেখে কে! ভাঙ্গা বাড়ি কে সাজানোর কাজে সে ব্যাস্ত! আর মিতুর আম্মু পরম মমতায় পোলাও রাধছে।
অহনা ইমনের হাত ধরলো, দেখো! চেক টায় এক এর পেছনে কত্ত গুলো শূন্য! অনেক টাকা!!! বাবার চিকিৎসা করাও। আমাদের জীবনে আর কোনো কষ্ট নেই!”
কী সুন্দর স্বপ্ন! ইমনের মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। রাসেল আজ নাক ডাকছে না। ক্যানো নাক ডাকছে না রাসেল! সব আগের মতো ক্যানো হচ্ছে না! ইমন বারান্দায় এসে দাড়ালো।
কাল সে আবার অফিসে যাবে। মন বলছে কাল এম,ডি সাহেব নিজের হাতে ইমন কে চেক টা দেবে। সেই চেকে পাচ এর পেছনে অসংখ্য শূন্য না থাকুক, পাচ টা শূন্য ঠিক ই থাকবে।
এক্সিকিউটিভ মোটরস এর সেই ছেলে টা কে একদিন “স্বাদ তেহারি ঘরের” তেহারি খাওাতে হবে। ছেলে টা খুব ভালো। অন্ততঃ স্যান্ডউইচের ঋণ টা শোধ করা দরকার। মিতুর আম্মু কে একদিন মা বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। উনি জানুক, মিথ্যে ছিলো না তার কথা। মহিলা টা বড়ো ভালো।
টাকা টা পেলে বাবার অপারেশন টা তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হবে। বাবাকে খুব জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করছে “বাবা, এতো এতো ভালোবাসি তোমাকে, তোমার পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকা চুরি করতাম, বুঝেও তুমি না বোঝার ভান করতে, আর আমি ভাবতাম তুমি বুঝি কতো বোকা!!! বাবা তুমি এতো ভালো কেনো!”
খুব ইচ্ছে করছে ভাবতে, কাল ই সব ঠিক হয়ে যাবে। আজ যতটা কষ্ট পাচ্ছে, কাল ঠিক তত টাই আনন্দ তাকে ঘিরে রাখবে। ইমনের চোখে পানি। কেনো যেনো মনে হচ্ছে, অহনা তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। ইমনের কাধে হাত দিয়ে অহনা বলছে, তুমি আমার দেখা সব চেয়ে ভালো ছেলে, তোমার কোনো ক্ষতি হবে না”
মাঝ রাতের ভ্রম গুলো কেমন যেনো সত্যি মনে হয়। ইমন অহনার মুখ টা দেখতে পাচ্ছে। পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দর মায়া কাড়া এক জোড়া চোখ। যে চোখে চোখ রেখে মিথ্যে বলা যায় না, কিন্তু মিথ্যে স্বপ্ন দেখা যায় সারা জীবন।
ইমন খুব চেষ্টা করে ভাঙ্গা বারান্দার গ্রীল থেকে আকাশ টা দেখার চেষ্টা করলো। আজ আকাশে লক্ষ কোটি তারা। কিন্তু তার জীবন টা এতো শূন্যে ভরা কেনো? কেনো এতো শূন্যের বাম পাশে একটা “সংখ্যা” নেই!!!

সাব্বির ইমন
২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭

লেখক প্রকৌশলী ।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1173 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com