মিশন মিসিবাবা

ডিসেম্বর ১২, ২০১৬ ২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ইস্কুলের টিফিন পিরিয়ড এগারোটায় শুরু হয়ে পৌনে বারোটায় শেষ। বিহঙ্গঁমা, গিনি, চান্দ্রেয়ী, রাকারা বসেছিল প্লেগ্রাউণ্ডের কোণে একটা সুপুরি গাছের নীচে লোহার বেঞ্চে। ওদের স্কুলটা দক্ষিণ কলকাতার বেশ নামী ইংরিজি মিডিয়ম স্কুল। দামীও বটে। দূরে স্যাণ্ডপিটে বালি দিয়ে প্রাইমেরী উইঙ্গসের বাচ্চারা স্যাণ্ড কাসল বানাচ্ছে। ব্যাডমিণ্টন কোর্টে সিনিয়র মেয়েদের আজ বেশ ভিড়। নরম সবুজ ঘাসে সোনালী রোদ দৌড়ে বেড়াচ্ছে বাচ্চাদের সাথে। চিকেন স্যাণ্ডউইচে এক কামড় বসিয়ে থমথমে গলায় বিহঙ্গঁমা বললো, ‘দোজ রটন ফিলদি কাওয়ার্ডস হ্যাভ্ রিটার্নড এগেইন।’ দলটা নড়েচড়ে বসলো। কেবল বেঞ্চের পাশে ঘাসে সাদা কাউবয় মার্কা হ্যাটে মুখ ঢেকে শুয়ে থাকা মৌর্বী নট নড়ন চড়ন।

গিনি তার লাঞ্চ বক্স থেকে স্পিনাচ্ রিসোতো সাবধানে ফর্কে গেঁথে মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে বললো, ‘এনি হ্যাসল?’

তেমনি থমথমে গলায় বিহঙ্গঁমা বললো, ‘কেস  সিরিয়াস। দিদি ইজ টোট্যালি নকড্ আউট্।’

গিনি রিসোতো চিবোনো বন্ধ রেখে বললো, ‘গো অন্, কি হয়েছে বল্?’

টিস্যু পেপারে মুখ মুছে আইস্ টির ক্যানে সিপ্ করলো বিহঙ্গঁমা। তারপর মুখটাকে তুম্বো  করে বললো, ‘আরে, কাল কোচিং এর বন্ধুদের সাথে গুলতানি সেরে সবে বাড়ি ঢুকেছি দেখি দিদি বিছানায় বডি ফেলে এন্তার ফোঁপাচ্ছে, মা পাশে দাঁড়িয়ে। মুখে পুরো গন্ কেসের ভাব। জানতে চাইলাম, কি হয়েছে। তা, নো অ্যান্সার। শেষে বাবা বললো ঐ বখাটে  গুণ্ডাগুলোকে ইভ্টিজিং-এর চাজের্ পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে কোনো লাভ হয়নি। কোচিং এর ত্রিদিব স্যার নাকি ওদের পুরো গ্রুপটাকে দেখেছে পাড়ার মাঠের ভাঙা পাঁচিলে বসে ঠ্যাং দোলাতে। স্যারকে দেখেই নাকি ওরা তুমুল হাসাহাসি, মুখ বাজানো আর নোংরা কথার টিটকিরি ছুঁড়তে শুরু করে। শুধু তাই নয়, দিন গড়ালে আবার আগের মতোই পাড়ায় পাড়ায় দোকানে দোকানে মাস্তানি ফলিয়ে বিনে পয়সায় জিনিস তোলা, ভয় দেখানো, পথ চলতি মহিলাদের যা খুশি বলা কিছুই বাদ রাখেনি। স্যার বাবাকে বলে গেছেন সাবধানে থাকতে কারণ অলরেডি পাড়ার সবচেয়ে সিনিয়র দীনেশ জ্যাঠাকে ওরা হুমকি দিয়ে গেছে যে পুলিশে নালিশ করার বদলা ওরা নিয়ে ছাড়বে।’

উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায় গিনি। শোওয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে মৌবর্ী। সেই কোন প্রাইমেরী উইং থেকে একসাথে বড় হয়ে ওঠা। বিহঙ্গঁমা বিষন্ন সুরে বলে চলে, ‘স্যার চলে গেলে ন্যাচারালি বাবা মা খুব ভয় পেয়ে যায়। কাল দিদিরও কোচিং ছিল। সামনেই এইচ্.এস. প্রি-টেস্টের তোড়জোড়। কিন্তু বেচারী এমন ভয় পেয়ে আছে যে প্রিপারেশান মাথায় উঠেছে। কালকের ঘটনাই শোন। দিদিকে দেখে পুরো দলটা রক ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। দিদি ওদের একেবারেই এক্সপেক্ট করে নি। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেলেও ও হাঁটা থামায়নি। দিদির কাছাকাছি এসে ওরা সিটি দিয়ে তুড়ি মেরে মেরে ছড়া কাটে, ‘ফ্যাটি অ্যাসিড ফ্যাটি অ্যাসিড, সঙ্গে থাকো না! জিয়া জ্বলে জান জ্বলে ঠাণ্ডা করো না।’ তারপর বিশ্রীভাবে ঢেঁকুর তুলতে থাকে। বাকি রাস্তা দিদি প্রায় দৌড়ে আসে। অব্ভিয়াস্লি শি ইজ্ শ্যাটাডর্ বাই দ্য ইন্সিডেন্ট।’ গলা প্রায় বুজে আসে বিহঙ্গঁমার।

ঘাস থেকে উঠে স্কাটর্ ঝাড়তে ঝাড়তে বিহঙ্গঁমার পাশে এসে বসে মৌবর্ী। বন্ধুর কাঁধে  হাত রাখে। সমব্যাথীর সুরে বলে, ‘হ‍্যাঁ, সুরঙ্গঁমা একটু ওভারওয়েট ঠিকই কিন্তু শি ইজ্ অ্যান্ অ্যামেজিং পাসর্ন।’

রাকা, চান্দ্রেয়ী সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,  ‘শি ইজ্ কাইণ্ড, সফ্ট স্পোকেন, অসাধারণ গান করে, আ গুড পেইন্টার, কবিতা লেখে — কতো গুণ!’

‘অথচ জানিস, বাড়িতেও দিদি সিলি সিচুয়েশনের  ভিক্টিম,’ বন্ধুদের কথা কাটে বিহঙ্গঁমা।

‘মানে’? অবাক হয় ওরা।

বিমষর্ বিহঙ্গঁমা বলে, ‘দিদির গায়ের রঙটা তো ঠিক .. মানে.. আই মীন্.. ঠিক ফর্সা বলা যায় না, তাই আত্মীয় স্বজন তো বটেই ওর ক্লাসমেটরা ওর নীক্ নেম দিয়েছে মো-বে-কা, মানে মোটা বেঁটে কালো। আর মাও পারে বটে! রাতদিন শুধু ওর ডায়েট আর মুখে লেবু-দই-ডালবাটা-শশা-তরমুজ-পেঁপে-টোম্যাটো যা পাচ্ছে লাগাচ্ছে। বাবা মাঝে মাঝে চ‍্যাঁচায়, “মেয়েকে ওর মতো থাকতে দাও। তোমার ম্যাগাজিনি বিদ্যে ওর ওপর ফলাতে এসো না। অ্যাহঃ, লোকে খেতে পায় না, তিরিশ টাকা কিলো পেঁয়াজ, আর এনারা ফলমূল দিয়ে অঙ্গ সাজাচ্ছেন!” মাও কি চুপ থাকার লোক? অপমানে লজ্জায় দিদির কালো হয়ে যাওয়া মুখের তোয়াক্কা না করেই শুরু করবে, “হ‍্যাঁ হ্যাঁ, সব দোষ আমার। কতোবার বলেছি মেয়েটাকে জিমখানায় ভতির্ করে দাও না হোক সাঁতারে দাও। না, তা দেবে না। কি?  না- বাল্কি বডি ডুবে যাবে!” সে রাত্রে দিদির ফেভারিট প্রন্ পোলাও হয়েছিল। ও ছুঁয়েও দেখল না, অদ্ধের্ক রাত অবধি ফোঁপালো।’

‘মিসিবাবা, সুরঙ্গঁমার ইভ্টিজারদের কেলাতেই হবে।’ গজর্ে ওঠে বন্ধুর দল।

মিসিবাবা ওরফে মৌবর্ী গাঢ় গলায় বললো, ‘বিহঙ্গঁমা, তোর দিদি যে সিচুয়েশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে  ইটস্ নো গুড। ব্যাপারটা আর ক্যাজুয়াল নেই। তুই যদি চাস উই ক্যান ডেফিনিট্লি ইণ্টারভেন।’

রিসেস্ পরের কোনো ক্লাসে হাজার চেষ্টা করেও মন বসাতে পারলো না বিহঙ্গঁমা। পাড়ার বয়োঃজেষ্ঠরা, লোকাল কাউন্সিলার, এমনকি পুলিশ পর্য্যন্ত যেখানে হাত গুটিয়ে নিয়েছে, সেখানে মিসিবাবা?

কাঁকুলিয়া রেল কলোনীর এলাকাটায় মোটামুটি শিক্ষিত মধ্যবিত্তদেরই বাস। ছাপোষা গৃহস্থপাড়া বললেও অত্যুক্তি হয় না। বেপাড়ার কিছু উৎপাত সব পাড়াতেই থাকে। কিন্তু সেই সব উৎপাত রোখার মতো পাল্টা শক্তি এই শান্ত ভদ্র কলোনীর মানুষগুলোর কোথায়?

আজ সকাল থেকে কলোনী পাড়ায় হৈ হৈ কাণ্ড। পাড়ার তপনবাবুর মূক ছেলে নন্দু মার কথামতো আটটা ডিম কিনে ফিরছিল। ভাঙা পাঁচিলের কাছে আসতেই মাতব্বরের দল ঘেরাও করে দাঁড়ালো। হতবাক নন্দু না পারে প্রতিবাদ করতে, না পারে পালাতে। কুলকুল করে ঘামতে থাকে। মাতব্বর তার হাতে নোংরা কথায় ভরা একটা চিঠি দিয়ে সুরঙ্গঁমাদের বাড়ি ফেলে আসতে বলে।

‘না হলে এই তোর অশ্বডিম্বর এক দশা,’ বলে নন্দুরই মাথায় একটা ডিম ঠোকা মেরে ফাটায় তারা। হা হা হাসে।

‘এইভাবে অষ্ট ডিমের অষ্ট দশা, ভেবে দ্যাখ।’ ঠোঙা লোফালুফি চলতে থাকে। তখনি পাড়ায় পাড়ায় ইস্ত্রির কাপড় নেয় কামতাপ্রসাদ এসে পৌঁছায় আর গোটা ব্যাপার বুঝে তপনবাবুকে খবর দেয়। ছুটে আসে পাড়ার কিছু লোক। ততক্ষণে পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েছে পাঁচটা ডিমের। নন্দুর দশাও ভগ্নপ্রায়। আদতেই কাপুরুষ গুণ্ডাগুলো পাড়ার কিছু লোক নিয়ে তপনবাবুকে আসতে দেখেই পালায়। ক্রোধে, ভয়ে, অপমানে মুখ দিয়ে জান্তব শব্দের প্রতিবাদ করতে থাকে নন্দু।

স্কুল ছুটির পর স্কুলগেটের সামনে বিশাল জারুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিল বিহঙ্গঁমা। কমলালেবুর কোয়া ছাড়ানো রঙের মতো নরম একতাল সূযর্ের আলো ছড়িয়ে আছে। ‘সামনেই রাখী পূণর্িমা,’ মুখে দু-একটা চুরন গোলি চালান করতে করতে ভাবল বিহঙ্গঁমা। মিসিবাবাদের জন্য অপেক্ষা করছে সে। আজ ফাইন্যাল প্ল্যান বলবে মিসিবাবা।

কাল ঘটে যাওয়া নন্দুর ঘটনায় তার বুকে যেন পাথর চেপে বসেছে। তাদের আদিবাড়ি বিহারের ভাগলপুরে। ছোট থেকে দেখেছে ভাইফোঁটার চেয়েও রাখী পূণর্িমায় ধূমধাম হয় বেশী। বার্ণপুর থেকে পিসিমণিরা আসে। বাবার মুখে প্রশ্রয়ের হাসি ফোটে। বাড়িতে পিসিদের পছন্দের মাছ, তরকারি, মিষ্টি কতো  কি আনে বাবা। মা পছন্দ করে কেনে শাড়ি। বাড়িতে খুশীর ধূম পড়ে যায়। অথচ এবার কেমন যেন সব মরা মরা। বেপাড়ার কতোগুলো গুণ্ডাবদমাইশ যেন জবরদস্তি দখল নিয়েছে ওদের জীবনের রোজনামচায়। ইচ্ছেমতো কণ্ট্রোল করছে ওদের সুখ দুঃখ হাসি কান্না। অন্ধ রাগে জ্বলতে থাকে বিহঙ্গঁমা।

‘কি রে লাট্টুর মতো গাছের নীচে বোঁ বোঁ ঘুরছিস যে?’ কাছে আসে বন্ধুর দল।

কোনোরকম ভণিতা না করে বিহঙ্গঁমা নন্দুর খবরটা দিলো। চুপচাপ হাঁটতে থাকে ওরা।

‘ক্রাউড জোগাড় করতে পারবি?’ প্রশ্ন করে মিসিবাবা।

একটু ভেবে বিহঙ্গঁমা বলে, ‘হঠাৎ ক্রাউড কেন’?….. ধীরে ধীরে গভীর আলোচনায় ডুবে যায় ওরা। স্কুল গেট ছাড়িয়ে বড় রাস্তা, সামনের সবুজ ঘাসের এবড়ো খেবড়ো ছিটে পড়া মাঠ, তারই পাশে এলাকার ফুল গাছে ভরা একফালি পার্ক। পাকর্ের পাশে সরু গলিতে মিসিবাবার অপেক্ষায় থাকা দুধসাদা অক্টেভিয়ানের দরজা আর তার অধৈযর্্য শোফার রামতারণ।

‘মিসিবাবা, জোলদি কোরেন। আপনাকে ঘরে ছেড়ে ম্যাডামকে হামার পহুঁছাতে হোবে লিণ্ডসে স্ট্রিট। সোকালেই আপনাকে বললাম আজ থোড়া জোলদি আনে কে লিয়ে..’

রামতারণকে হাতের মুদ্রায় চুপ করায় মৌবর্ী, গম্ভীর চালে ভিতরে ঢুকে যায়, পুরো দলের মুখও থমথমে, কি যেন এক মিশন সাকসেসফুল করার অঙ্গীকারে লক্ষ্যবদ্ধ। স্থির।

নিউআলিপুরের ভট্টারক ভিলায় তখন অন্য দৃশ্য। মৌবর্ীর মা আম্রপালী, বিশিষ্ট সমাজসেবিকা কপালে সাত ভাঁজ আর নাকের ডগায় টেনশানের বিন্দু ঘাম নিয়ে ভাবছেন সময় মতো জরুরী মিটিং-এ পৌঁছতে পারবেন তো? মেয়েকে বলা না বলা সমান ভেবে পইপই করে রামতারণকে বলেছিলেন। নিশ্চয়ই মেয়েই কিছু গণ্ডগোল পাকিয়ে ছেড়েছে। যতো রাগ তাঁর গিয়ে পড়ে শ্বশুর মশাই-এর উপর।

মৌবর্ীর দাদু চন্দ্রচূড় ভট্টারক নামকরা চিকিৎসক হলেও ভ্রমণ আর সাহিত্যটা ছিল রক্তে। বহু বছর আগে নেপালের পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন একটি অভাবি গৃহের কষ্টে পালিত বালককে। লেখাপড়া শেখালেন, আদব কায়দা, দোকান বাজার, ব্যাঙ্কের কাজ সব শেখালেন। তাঁর একমাত্র পুত্র রুদ্রপ্রতাপের সেবক সখা হয়ে উঠল সেই বালক – কাঞ্ছারাম।

রুদ্রপ্রতাপ ও আম্রপালীর একমাত্র কন্যা সন্তান জন্মালে কাঞ্ছারাম সেই নবশিশুর প্রতিপালনের ভার নেয়। শিশুর প্রতি কাঞ্ছার মনে শুধু ভালবাসা নয়, ছিল সম্ভ্রমবোধ। অচিরেই শিশু তার কাছে পরিচিত হল মিসিবাবা নামে। সাহিত্যপ্রিয় দাদু নামকরণ করলেন মৌবর্ী।

নামের সাথর্কতা বজায় রাখতেই বোধহয় ধনুকের জ্যার মতই তীক্ষ্ণ তীব্রতায় বেড়ে উঠতে লাগলো শিশু। একরোখা, জেদী। কখন কোন লক্ষে্য বিঁধবে বোঝা দায়। এই একবগ্গা মেয়ের শাসন পালন দমন ভট্টারক দম্পতির একরকম শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াল।

মেয়েকে নিয়ে দাম্পত্য কলহের সময় প্রায়ই রুদ্রপ্রতাপ স্ত্রীকে এই বলে দুষতেন যে গর্ভাবস্থায় অতিভোজন এবং স্বল্প কায়িক পরিশ্রমের ফলে আম্রপালীর চেহারাখানা ধনুকের ন্যায় অগ্রে স্ফীত এবং পশ্চাতে হেলে পড়েছিল বলেই তাঁর পিতা পুত্রবধূকে দেখে পৌত্রীর এহেন নামকরণ করেছিলেন। এখন সেই নামের তীর স্ত্রীর গর্ভছিলা থেকে সটান বেরিয়ে এসে সমাজে তাঁর নাম মান সম্ভ্রম সবই ফুটো করে ছাড়বে।

এ কি বেহিসেবী জীবন! লেখাপড়ার সাথে সাথে নাচ গান আবৃত্তি যেমন আর পাঁচজন শেখে তাই শেখো!  না!  ইনি গিয়ে ভতর্ি হলেন বক্সিং-এ। ইচ্ছে হল উইকএণ্ডে বেলা একটা অবধি পড়ে পড়ে ঘুমোল আবার ইচ্ছে হল তো সারারাত বই মুখে করে বসে থাকলো। কিছু বলতে গেলেই শুনতে হবে, ‘ডোণ্ট বদার।’

স্বামী সমাজের উঁচুতলার ব্যুরোক্রাট্। তিনি নিজে সমাজসেবী। বাড়িতে লোকজন লেগেই আছে। কার সামনে কি বলবে, কেমন ব্যবহার করবে ভেবে কাঁটা হয়ে থাকেন দুজনে।

বাড়িতে যতক্ষণ থাকবে রুমের দরজা বন্ধ। জামার্ন ভাষা শেখানো কাল হয়েছে। দরজায় ‘নীশট্ স্টোরেন’ অর্থাৎ ‘বিরক্ত করো না’ ফলক ঝোলানো। পুরো ফ্যামিলি মীট্ করে রাত্রে ডিনার টেবিলে। সেখানেও মেয়ের কানে গোঁজা থাকে আইপড্ ইয়ারফোন। বাপ মার সাথে কোনো কথার  বালাই নেই। এ পক্ষ থেকে যদি প্রশ্ন যায়, ‘ওয়েল, তোমার স্টাডিজ্ কেমন চলছে? বোডর্ একজামের প্ল্যানশীট্ বানিয়েছ তো?’ অথবা ‘ফিউচার প্ল্যানস্ কি ভাবছো?’ মেয়ে এমন চোখে তাকাবে যেন কোন এলীয়ান ভাষা শুনছে।

এই তো গত মাসের ঘটনা। রুদ্রপ্রতাপের হঠাৎ মাথায় চাপলো, উঠতি বয়সের মেয়ে, কি করতে কি করে বসে, নজর রাখা দরকার। শুরু হল যখন তখন মেয়ের ঘরে  ‘নীশট্ স্টোরেনের’ তোয়াক্কা না করে হানা দেওয়া। দু দিন গেল না বাপকে শুনতে হল, ‘হে গাইজ্, ওয়াটস্ আপ? আই নীড্ সাম্ প্রীভেসি।’

শেষে কাঞ্ছারামকে ফিট্ করলেন রুদ্র। হাজার বার মানা করেছিলেন আম্রপালী। কে কার কথা শোনে! রোজ রাতে ডিনারের পর বাংলোর পিছনে সুইমিং পুলের লাগোয়া টেরেসে ওয়াইনের গ্লাস হাতে বসতেন রুদ্র, পাশে ভগ্নদূত কাঞ্ছা।

ক’দিন গতানুগতিক খবরের লেনদেন গেলো। সপ্তাহকাল পরে এক রাতে কাঞ্ছা শোনায়,  ‘আইজ মিসিবাবা ফুনে মুআহ্ দিয়েসেন্।’

তিরিক্ষি হ’ন রুদ্র। ‘কি দিয়েছেন? মোয়া?’

মিচকি হেসে মাথা নাড়ে কাঞ্ছা। হাসিতে তার খুদে খুদে চোখ দুটি প্রায় বুজে আসে। ‘মোয়া নেহি সাব, মুয়াহ্!’ চারপাশে চোখ বুলিয়ে সতকর্ গলায় বলে, ‘চুম্মা!’

আমর্চেয়ারের আরাম ছেড়ে উঠে বসেন রুদ্র। গম্ভীর গলায় বলেন, ‘খুলে বল।’ বাবুর মতিগতি জটিল বুঝে গভীর গলায় কাঞ্ছা বলে, ‘আইজ ইস্কুলসে ওয়াপস্ আকে মিসিবাবা কুছু খেলেন না। হামাকে বুইললেন, “আউট”। হামিও বেপার বুঝে দরোজাকে পাস্ গেলাম সেঁইটে। শুনি মিসিবাবা বুইলছেন, “ফালতুমে রাগ দেখাবি না। হামি ইগনুর করছি না তুই ইগনুর করছিস্”? কিছু পরে হাসতে হাসতে বুইললেন, “ওলে বাবালে, থোপলা খোকার গোঁসা হইয়েসেরে।”’ এই অবধি বলে কাঞ্ছা আমতা আমতা করতে লাগলো।

‘কি হলো, বাকিটা বল্?’ এক ধমক লাগান রুদ্র। ‘আইঁজ্ঞে!’ দম নিয়ে সে বলে, ‘তাইরপর মিসিবাবা কি যেনো বুক খুইল্যে দেইখতে বুইললেন যে কত্তো মুআহ্ দিয়েসেন।’

‘ক্বি বললি বেয়াদপ!?’ অসহ্য রাগে ফেটে পড়েন রুদ্র। ‘এ কি হনুমানের ছাতি খুলে রামদশর্ন করানো হচ্ছে? অ‍্যাঁ?’

কাঞ্ছা পেল্লায় জিভ কেটে নিজের দু কান মলে উবু হয়ে বসে মাথা দোলায়। ‘আরে রাম রাম! সি সি সি বাবু! মিসিবাবা ছাতি কেনো দেখাবেন… উনি তো ফোনে বাতচীৎ করছিলেন!’

‘আঃ’, হাত উঁচু করে কাঞ্ছাকে থামান রুদ্র। ‘তুই যা’ বলে বিদায় করেন।

থোপলা খোকাটি কে হতে পারে ভেবে ভেবে তাঁর মাথা আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠে।

দম্পতির শোয়ার ঘরে সে রাতে যে অগ্নিস্ফুরণ হল তার ধোঁয়ায় ধূমাবতীর ন্যায় মেয়ের ঘরে পরদিন ঢুকলেন আম্রপালী। উলুম ঝুলুম জামাকাপড়, জুতোর পাহাড়, রাশিকৃত বইখাতা কাগজ ছড়ানো। কানে ইয়ারফোন গুঁজে মাথা কোমর ঝাঁকাচ্ছিল মেয়ে। সোজা গিয়ে ইয়ারফোন ধরে দিলেন টান। এক সেকেণ্ডের অবাক দৃষ্টি, তারপর ‘ইটস হাইলি ডিসরেসপেক্টফুল!’ বলে বিরক্ত হয়ে ধপাস্ করে ঘন সবুজ বীন ব্যাগে গিয়ে বসলো। আম্রপালী বললেন, ‘সামনে সেকেণ্ড সেমিস্টার। কি শুনছো এসব?’

চরম বিরক্তির গলায় মেয়ে উত্তর দিলো, ‘কি শুনছি বললে বুঝবে?’

কাঞ্ছা তখনই মেয়ের ঘরে হট্ চকলেটের কাপ হাতে ঢুকছিল। ওকেই পাকড়াও করলেন, ‘আ্যই, ও কি শোনেটা কি শুনি!’

বুড়ো মিটমিট হেসে বললো, ‘হামি কি জানে মাঈজী। মিসিবাবার কানে হামেশা নল থাকে। তোবে কখুনো উনি স্যাক্সিম্যাক্সি বোলে গীত গান।’

বীন ব্যাগ থেকে লাফিয়ে উঠে হট্ চকলেটের কাপ নিয়ে মেয়ে বললো, ‘ডিসগাস্টিং! স্যাক্সি ম্যাক্সি আবার কি? বাই দ্য ওয়ে, ওটা স্যারা সিণ্ডি-র নিউ আ্যলবাম – ওহ্ বেবি, ইউ আর সো হট্ আ্যণ্ড্ সেক্সি!’

লজ্জা বাঁচাতে মেয়ের ঘর থেকে ধাঁ হয়ে গেলেন আম্রপালী। সেদিন রাত্রে টেবিলে মুখটাকে তুম্বো করে রূদ্রপ্রতাপ মেয়েকে বললেন, ‘লুক! ক্লাস টেন মানেই কিন্তু ইউ আর অন্ বোর্ড ফর ইয়োর ফাইনাল এক্জাম্। ফার্স্ট ডিভিশন আজকাল কিস্যু না। মিনিমাম পাঁচ ছ’টা লেটার না থাকলে ফিউচার ইজ টোটালি ডার্ক আর নীল।’

মাংসের ঝোলে নান্ রুটি ডুবিয়ে মুখ গোঁজ করে মৌর্বী বললো, ‘আই আ্যাম ট্রাইং।’

নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না আম্রপালী। এদিকে স্বামীর গুঁতো মেয়ের কোন ব্যাপারে পান থেকে চুন খসলে, অন্যদিকে মেয়ের কিম্ভূত ব্যবহার আর কথাবার্তা। আবার নিজেরা কি ভদ্রভাবে কথা বলছে দ‍্যাখো! রেগে বলে ওঠেন, ‘ইজ্ ইট সো? দেন ইউ হিয়ার মি, ইট্স্ নট এনাফ্!’

চেয়ারটাকে হ্যাঁচকা টানে পিছনে পাঠিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল মৌবর্ী। কেটে কেটে বললো, ‘ইয়্যাহ্, ইটস্ এনাফ! ক্লাস টেনে ওঠার পর থেকে তোমার আর ড্যাডের শুধু পড়ো আর পড়ো ডে অ্যাণ্ড নাইট্! রিপিট অফ্ সেম্ কোয়েশ্চেনস্! লাইফের এইম্ কি? ফিউচার প্ল্যান কি? আবার ফাস্টর্ ডিভিশন এনাফ্ নয়, লেটার চাই-পাঁচ ছ খানা! ওয়াও! সুপার ডুপার বাম্পার রেজাল্ট চাই। আরে আমি কি লাস্ ভেগাসের ক্যাসিনো মেশিন নাকি যে যা দাঁও লাগাবে তার ডাবল, ট্রিপল্ উগরে দেবো?’

সবার খাওয়া মাথায় উঠল। চন্দ্রচূড় মেজাজি নাতনীকে ঠাণ্ডা করার শত চেষ্টা করলেন। ফল হল না। বাপের দিকে তাকিয়ে সে সপাটে বলে উঠলো,‘স্পাইং এর জন্য কাঞ্ছা ইজ্ ভেরি ভেরি আন্প্রোফেশনাল, ড‍্যাড্। তোমরা মুখে বলো আমায় ফ্রিডম দিয়েছো, কিন্তু ট্রাস্ট করো না। আমার বিহেভিয়ার দেখে আমায় জাজ্ করো। স্টক্ করার ব্যাবস্থা করো ইন্ মাই ওন্ হাউজ্। হাম্বীর ইজ্ নো ওয়ান্ স্পেশাল ইন্ মাই লাইফ। জাস্ট আ গুড ফ্রেণ্ড, বক্সিং কো মেট্। ফেসবুক ফ্রেণ্ড! কিউরিওসিটিটা ভদ্রভাবে দেখাতে পারতে।’

সেই থেকে সামলেছেন আম্রপালী-রুদ্রপ্রতাপ। ধীরে হলেও মেয়ের প্রতি জন্মাচ্ছে বিশ্বাস, ভরসা।

রবিবার বিকেল গড়াতে নিশিকান্তবাবু দেখেন দুই মেয়ে সুন্দর সেজেগুজে তৈরী। অবাক হয়ে ওদের প্রশ্ন করলেন, ‘কোথাও বেরোচ্ছিস? সিনেমা টিনেমা না কি?’ বহুদিন পর বড়মেয়ের হাসিমাখা মুখখানা দেখে তাঁর পিতৃহৃদয় ভরে গেল। আজ তাঁর খুশি উছলে পড়ছে। বেছে বেছে রাখীর দিনটা রবিবারেই পড়েছে; বেশ জম্পেশ করে দুপুরের ভুরিভোজ হয়েছে।

ফড়ফড় করে উঠল ছোটজন। ‘হ্যাঁ, বাবা বেরবো, তবে আমরা একলা নই, তোমরাও। প্লীজ্ পিসি, চট্পট্ তৈরী হয়ে নাও! কুইক!’ তাগাদা দেয় বিহঙ্গঁমা। ‘আগে বলতে হয়, কি গেরো,’ বলতে বলতে তৈরী হতে যায় সবাই।

বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এঁরা দেখেন গলিভরা ভিড়। পাড়ার মহিলারা, বয়োঃজেষ্ঠরা, কচি কাচাঁর দল, আছে ত্রিদিববাবুর কোচিং ক্লাসের ছাত্র ছাত্রীরা, পাড়ার ওষুধ দোকানের পরেশ পাল, চা দোকানের হাতকাটা বুড়ো গোপাল, মুদি দোকানের উড়ে মালিক তালপত্রী, ইস্ত্রীওয়ালা কামতাপ্রসাদ, মায় ওঁমা তারা সেলুনের নাপিত পাচুঁগোপাল পযর্ন্ত। ‘ব্যাপার কি, পাড়ায় কিছু শো টো-এর আয়োজন না কি রে?’ নিশিকান্ত শুধোন মেয়েদের।

এমন সময় ব্যস্তসমস্ত পায়ে নিশিকান্তবাবুর দিকে এগিয়ে আসেন ত্রিদিববাবু। হাত বাড়িয়ে বলে ওঠেন, ‘আসুন আসুন, আপনাদের অপেক্ষাতেই ছিলাম। চলুন আর দেরী নয়, শুভস্য শীঘ্রম্। আপনারা জোড়ায় জোড়ায় দাড়াঁন প্লীজ্, মেক্ আ লাইন্।’

বলতে বলতে পিছনে চলে যান ত্রিদিববাবু। বহুকাল বাঙালি শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় নি, তাতে সময় লাগলো কিছু বেশী। অবশ্য ত্রিদিববাবু তাতে দমবার পাত্র নন। কি যেন এক আশার আলোয় ভরে আছে তাঁর মুখ। চলনে বলনে কি উদ্দীপনা! পাড়ার বৌ মেয়েরা সুন্দর সাজে সজ্জিত। সকলের হাতে ডালা। ধূপ-দীপ। রাজপথের বিস্মিত লোকের ভিড় কাটিয়ে চললো এই বিচিত্র পথশোভা পূণর্ মিছিল। থামলো মাঠপাড়ের ভাঙা পাঁচিলের সামনে।

রকের পুরোভাগে তখন গুণ্ডা মাতব্বরের দল। ছুটির দিন, ফুতর্ির দিন। হাতে হাতে ঘুরছে নেশাদ্রব্য, চলছে পথচারীদের নিয়ে তামাশা, মেয়েদের নিয়ে কুৎসিত চুটকি। হঠাৎ অসংখ্য দীপের আলোয় ভরা মিছিল দেখে পুরো দলটা কৌতুহলী হয়ে উঠল। একটু হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল যখন দেখল কোচিং এর সেই মাস্টারটা তাদের রকের সামনে এসে জোর গলায় বলতে লাগলো, ‘পাড়ার সকল অধিবাসীরা! আজ বড় শুভ দিন। রাখী পূণর্িমা! শত্রু মিত্র, মুচি মেথর, গুণ্ডা বদমাইশ সকলকে ভলোবেসে “ভাই” বলে আজ বুকে টানার দিন। আজ একটি বিশেষ ঘোষণা আছে। আপনারা সকলে এই শুভ মুহূতর্ের সাক্ষী থাকুন।’

চারি দিকে প্রচুর ভিড় জমেছে। পথচলতি মানুষের আর পাড়া বেপাড়ার দল মিলে। ত্রিদিববাবু তারই মধ্যে থেকে চোখ দিয়ে খুঁজে নিলেন সুরঙ্গঁমাকে। ‘এসো মা, সময় হয়েছে,’ বলে ডাকলেন। চোখ ফেড়ে মাতব্বর দেখে বরাবর চোখ নীচু করে হেঁটে যাওয়া মেয়েটা গট্গট্ করে এগিয়ে আসছে তার দিকে। ‘এতো ভিড়ের মধে্য মেয়েছেলেটার হাতে মার খেলে সব পেস্টিজ্ পাংচার’ ভেবে মাতব্বরের জিভ শুকিয়ে এলো। হাত পা যেন বশে নেই। এ কি, ঘোর লাগা চোখে মাতব্বর দেখে মেয়েটা তার হাতে পরিয়ে দিলো বড়সড় রঙচঙে একটা রাখী! কপালে এঁকে দিলো ভাই জয়টীকা! চতর্ুদিক থেকে হাততালির শব্দে কান পাতা দায়। মাতব্বরের চামচাগুলো পর্য‍্যন্ত বেভুলে হাত চটাপটি দিতে লাগলো।

‘শালার পুলিশ যখন তুলে নিয়ে গেসলো, তখনো মাইরি এতো লজ্জা লাগে নি।’ মাথা নীচু করে মনে মনে ভাবছিল মাতব্বর।

একে একে পাড়ার সব মেয়েরা মাতব্বরের  দলের ছেলেদের হাতে রাখী বেঁধে দিলো। পাড়ার মহিলারা উলু ধ্বনি দিয়ে বললেন, ‘দেখো বাছারা, আজ থেকে পাড়ার মেয়ে বোনেদের মান শরমের ভার রইলো তোমাদের উপর।’

হঠাৎ সবার গায়ে মাথায় উপর থেকে ঝরে পড়ল ফুলের পাপড়ি। এবার বেজায় চমকালো মাতব্বর। স্বগর্ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে ভেবে উপরে তাকাতেই দেখে রক বাড়ির বাড়িওয়ালা বুড়ো। মুঠো ভরা গাঁদা ফুলের পাপড়ি সুরঙ্গঁমাদের মাথায় ছড়িয়ে দিয়ে, নড়বড়িয়ে নীচে নেমে আসেন বৃদ্ধ সতীশবাবু। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁফ নেন। তাঁকে দেখে সবাই চুপ করে। বৃদ্ধ কোনমতে দম নিয়ে বলেন, ‘মায়েরা, এ বুড়োর তিনকুলে কেউ নেই। দিন কাটাচ্ছিলাম নিজের বাড়িতেই বন্দী হয়ে। ওপরের ওই জালনাটুকুই সার। এ বাড়ির রক বারান্দা বড় সাধের ছিলো। শখ করে বানিয়েছিলাম,  বেহাত হয়ে গেলো।’ হাত দেখিয়ে সতীশবাবু গুণ্ডা দলের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

‘নিজের বাড়ির সদর মজির্ মতো ব্যবহার করতে পারতাম না। খিড়কি দিয়ে যাতায়াত করি। কিছু বলতে পারি না ভাই সকল, প্রাণের ভয়ে, অপমানের ভয়ে। কিন্তু আজ উপর থেকে যা দেখলাম, তাতে সব ভয় জয় করে নীচে না এসে পারলাম না।’

এবার গুণ্ডাদলের দিকে ফিরে বুড়ো হাঁকলেন, ‘হাড়হাবাতের দল, গায়ে যদি মানুষ চামড়া থাকে তো এই মেয়েগুলোর আব্রু রক্ষার ভার নে। নিত্যদিন এই মেয়েগুলোর হেনস্থা দেখি তোদের হাতে, সেই হাতে আজ বাঁধা হয়েছে রাখী, এর সম্মান যদি না রাখতে পারিস তবে এই সবাই সাক্ষী, তোরা হলি নামর্দের দল!’

সতীশবাবু এক হাজার টাকা তুলে দেন সুরঙ্গঁমার হাতে। আবার তুমুল তালি বৃষ্টি। বৃদ্ধ বলেন, ‘মা, এই টাকা দিয়ে তোমরা সবাই মিষ্টি কিনে খাবে। তোমাদের এই অভিযানে এই বুড়োর যে কি উপকার হলো, তা আর বলার নয়। বাড়ির সদর লক্ষ্মীর দুয়ার। আজ তা পঙ্কমুক্ত হল মা।’

উপস্থিত জনতা এতক্ষণ যেন কোন পথ চলতি নাটকের দশর্ক মাত্র ছিলো, এবার নাটকের কুশীলবদের সাথে একাত্মা হয়ে বলে উঠলো, ‘জিন্দাবাদ! জিন্দাবাদ!’ তারা রণে বনে জলে জঙ্গঁলে এটাই বলতে অভ‍্যস্ত।

পরিচিত অপরিচিত, পাড়ার বেপাড়ার মানুষ যখন মিষ্টি মুখে ব্যস্ত, সবার অগোচরে কোনমতে লুকিয়ে পালায় মাতব্বরের দল। কেউ তাদের খেয়ালও করে না। মিষ্টি মুখের ফাঁকে চট্ করে মিসিবাবাকে ফোনে ধরে বিহঙ্গঁমা। বলে, ‘মিসিবাবা! মিশন সাকসেসফুল!’

রাত্রে বাড়ির দরবারি ঘরে বসে আসর। সেখানেই বিহঙ্গঁমা খুলে বলে কি ভাবে বোনের বন্ধুরা তার আত্মপ্রত‍্যয় ফিরিয়ে দিতে এই প্ল‍্যান বানায়। সুরঙ্গঁমা বলে পাড়ার ত্রিদিব স‍্যারকে একবার বুঝিয়ে দিতে উনিই বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে সামিল করেন এই কর্মযজ্ঞে। পাড়ার দোকানীরাও পিছিয়ে থাকেনি। শুনে সানন্দে এগিয়ে এসেছে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে সাকসেসফুল করতে এই “মিশন মিসিবাবা”।

এত দিনের মনের গ্লানি উদ্বেগ হতাশা কাটিয়ে মেয়েদের প্রতি গর্বে আনন্দে নিশিকান্তবাবু ঘর ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘ডি লা গ্রাণ্ডি মেফিস্টোফেলিস!’

ঘরের সবাই চমকে উঠে মিহি সুরে বলে উঠল, ‘ইয়াক! ইয়াক!’

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1268 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com