ব্যাচেলর উপাখ্যান

এপ্রিল ৩০, ২০১৭ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

সকাল বেলা বের হবার আগে মা নাহলেও পনেরো বার বললেন, আমি যেন আজ তাড়াতাড়ি বাসায় আসি। তাড়াতাড়ি আসতে বললেই তো আর আসা যায়না। সামনে স্টুডেন্টদের ফাইনাল পরীক্ষা। হেড স্যার নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি এক্সট্রা ক্লাসেরও ব্যাবস্থা করছেন প্রতিদিন। আমি যে স্কুলে পড়াই সেখানে এমনিতেও শিক্ষক সংখ্যা কম তার উপর অতিরিক্ত ক্লাস নেয়া স্যারদের জন্য এক রকমের প্রেশার বটে। হেড স্যার চিন্তা করলেন, স্কুলের তহবিল থেকে বেতন দিয়ে হলেও ফাইনাল পরীক্ষা অবধি কয়জন টেম্পোরারি শিক্ষক নিয়োগ দেবেন। স্যার নোটিশও টানিয়ে দিলেন। বেতন খুবই কম। মাত্র তিন হাজার টাকা। তবে একটা সরকারি কোয়াটারে বাসা দেয়া যেতে পারে, এমনিতেই অনেক বাসা খালি পড়ে আছে। আমাদের স্কুলটা নদীর এপাড়ে। ওপাড়ে হলো শহর। যারা শহর থেকে এখানে চাকুরী করতে আসেন তারা শহরেই বাসা নিয়ে থাকেন। সেটাই আসলে সুবিধাজনক।তাদের বাচ্চারা শহরে নামি দামী স্কুলে পড়ে। তাছাড়া নদীর এপার ভালো কোনো হসপিটাল বা শপিংমল কিছুই নেই। সবাইকে যেকোনো কাজে নদী পাড় হয়ে শহরেই যেতে হয়। এজন্য সরকারী বাসার ভাড়া কম হলেও অনেকেই থাকতে চাননা।একারনে অনেক বাসা খালিই পড়ে থাকে।

আমি খুব চেষ্টা করলাম তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে কিন্তু তা আর হলো কই। সেইতো বিকাল চারটাই বাজলো। বাসায় ঢুকতেই মায়ের কড়া মেজাজে কথা শুনতে হলো। আমি বারবার বললাম, মা খেতে দাও। সেদিকেও মায়ের হুশ নেই। মা বললেন, এখন বাজে চারটা, তুই কখন রেডি হবি? কখন শহরে যাবো? আর কখন ফিরবো? রাতের খাবারটাও তো বানাতে হবে এসে। আমি হাতমুখ মুছতে মুছতে বললাম, কই যাবো? ডাক্তার দেখাবা? মা বললেন, আমি বলছি আমার কোনো অসুখ হইছে? একটা ছেলে তোকে দেখতে আসবে। তোর খালা বলছে বাসায় না দেখিয়ে রেস্টুরেন্টে দেখাতে। আর নদী পার হয়ে কার খেয়ে দেয়ে কাজ নাই তোর মতো বুড়িকে দেখতে আসবে? আমার বয়স ২৯ পেরোলো। মায়ের ধারনা আর অবিবাহিত মেয়ে এই দুনিয়াতে নাই। আমি কোনমতে খেয়ে রেডি হয়ে মায়ের সাথে রওনা দিলাম। রেডি বলতে আসলে কাপড়টা পালটিয়ে,চুল আছড়ানো। মা যদিও জোর করে চুড়ি পরিয়ে দিলেন। আর লিপস্টিক ও লাগানোর তাড়া দিলেন।

এপারের ফেরিঘাটে পৌছানো থেকে শুরু করে শহরের ঘাটে নামা পর্যন্ত মা একশতবার বললেন, দ্যাখ তুই কিন্তু এবার ভুলেও তোর অই ঘটনা এই ছেলেকে বলবিনা। তোর খালা খালুর কড়া নিষেধ। এই ছেলে তোর খালুর কম্পানিতে মার্চেন্টাইজার হিসাবে জয়েন করছে। ৭৫০০০ টাকা বেতন। সামনে আরো বাড়বে। ভয়াবহ অবস্থা। বয়স ৩৪। তোর সাথেতো মিলে গেলো একদম। তুই তো আর ১৮ বছর বয়সের খুকি না যে ৩৪ বছরের কারো দিকে ফিরেও তাকাবিনা। এই ছেলে তোকে দেখতে আসছে তোর খালুর রেফারেন্সে! কত্ত বড় একটা কম্পানীর ম্যানেজার তোর খালু! দুই দুইটা গাড়ি কিনে ফেলল আর তোর বাবা এখনো সরকারি অফিসের ঘানি টেনেই যাচ্ছে! কবে সে রিটায়ার্ড করবে, পেনশানের টাকা পাবে,তা দিয়ে জমি কিনবে তারপর সেখানে বাড়ী করবে। আমি বললাম, বাহ! কী সহজ হিসাব। মা প্রসঙ্গ পালটিয়ে আবার হুশিয়ার করলেন, আমি যেন কিছুতেই মুখ ফস্কে অতিরিক্ত কিছু না বলে ফেলি।

খালার গাড়ী রেস্টুরেন্ট এর সামনেই দেখলাম। খালা এসেছেন শুধু কিন্তু খালু আসেননি। ছেলে নাকি আগেই এসে ভিতরে বসে আছে, আমরা আসিনি দেখে খালা ঢোকেন নি। চিটাগাং এর এই রেস্টুরেন্টে সবসময় ভীড় লেগেই থাকে। বুঝলাম না কী ভেবে খালা এই রেস্টুরেন্ট বাছাই করলেন! কর্নারের টেবিলে বসা ছেলেটা খালাকে দেখতেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। বুঝলাম ইনি- ই সে। টেবিলের এ পাশে তিনটা চেয়ার ওপাশে দুটা চেয়ার। আমার একপাশে খালা আর একপাশে মা বসলেন। আমি যেন দুজনের চোখ দ্বারা বন্দি। খাবার টাবার অর্ডার দেয়ার পর মা আর খালা মিলে অনেক্ষণ ছেলের সাথে নানা রকম কথা বলেই গেলেন। ওয়েটার খাবার নিয়ে আসলে খালা বললেন, আপা চলো আমরা ওদিকের টেবিলে বসে খাই। খালা আমাকে চিমটি কাটতে কাটতে হাসিমুখে চলে গেলেন।

আমি খুব বিব্রত ছিলাম না। ফলাফল জানাই আছে। তাই বেশ স্বাভাবিকই রইলাম। ভদ্রলোক কে বললাম, আপনিতো মোটামুটি সব জেনেই আমাকে দেখতে এসেছেন। তাহলে তা নিয়ে আলোচনা করা যাক যা আপনি জানেন না। ভদ্রলোক খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন, দেখুন আমরাতো আর প্রেম করছিনা, বিয়ে করছি। বিয়ে করবার জন্য যা যা জানা লাগে তা জেনেই এসেছি। আসলে আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে করতে দেরি হওয়াতে আমারো একটু দেরি হয়ে গেলো। ভাইয়া দেশের বাইরে অনেকদিন থাকাতেই এই সমস্যা হলো। আপনার যদি আমার বয়স নিয়ে কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে কথা আগানো যেতে পারে। আমি বললাম, না আপনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক আর কিছু ব্যক্তিগত ব্যাপার জানেন। বিয়ে করার জন্য আরো কিছু ব্যাপার জানানো উচিৎ। তিনি বললেন, দেখুন আপনার অতীত নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই। আমি ভাবি বর্তমান নিয়ে। আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে এক নিশ্বাসে ভদ্রলোক কে সব খুলে বললাম। তিনি সব শুনে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেন এবং আমাকে বললেন, আপনার মা কে ডাকুন। এতক্ষণ আলাদা কথা বললে তারা বাজে কিছু ভাবতে পারে।

আমি আর মা বাসায় চলে এলাম। বাসায় পৌছাতেই খালার ফোন। মাকে ভয়ানক বকাঝকা করলেন। মা আমার গালে চড় বসিয়ে বললেন, এতবার না করার পরেও কথাটা ক্যান বললি? তোর বিয়ের ব্যাপারে আমি আর নাই। তোর জন্য যে নিতুর বিয়েও আটকে রাখবো তা ভাবিসনা। ওর ফাইনাল শেষেই ওকে বিয়ে দিয়ে দেব। ছোট বোনের বিয়ে দেখে তখন তুই হিংস্বায় জ্বলে মরবি। আমি গোসলখানায় চলে গেলাম সোজা। মা বাইরে বসে বকবক করে যেতেই থাকলেন।

আজকে আমাদের স্কুলে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে এজন্য বিকাল ৩ টায় শুরু হবে ইন্টার্ভিউ। আজ সবারই প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলে থাকতে হতে পারে। যারা পরীক্ষা দিতে এসেছেন তাদের অনেকেই পরিচিত। এই এলাকার অনার্স পাশ করা ছেলে মেয়েরাই বেশিরভাগ আবেদন করেছে। কয়েকজন দেখলাম অপরিচিত এবং কিছুটা সিনিয়র।পরীক্ষা শেষ হলো চারটায়। সবার ফলাফল বের করবার পর, ফলাফল জানিয়ে দিতে হবে আজই। আমরা সবাই খাতা দেখতে ব্যস্ত হলাম। যে তিনজন ভালো রেজাল্ট করলেন তাদের দুজনই অপরিচিত। আর এলাকার এক ছোট বোন হয়েছে থার্ড। আমরা প্রথম দ্বিতীয় এবং তৃতীয় যিনি হয়েছেন তাদেরই নিয়োগ দিলাম।

লেখক : জান্নাতুল ফেরদৌস

*** আজ আপাতত এটুকই লিখলাম।গল্পের বাকিটুকু পরে লেখা হবে, যদি আপনারা ভাল বলেন। গল্পে কোনো খাদ পেলেন আপনারা? পেলে জানাবেন। খাঁদ পূরণ করার চেষ্টা করা হবে।***

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1228 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com