বেগম জীয়ার আটকাদেশ অবৈধ

ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮ ৯:৪৪ অপরাহ্ণ

:: ব্যারিষ্টার আফজাল জামি
বৃটেন আর বাংলাদেশে আইনী কাঠামোর মাঝে এত বেশী ফারাক থাকতে পারেনা যে বিলাতের একজন পেশাদার হিসাবে এটাকে আমি সম্পূর্ণ ভুল বুঝবো ।

আরো কিছু লেখার আগে আমি প্রথমে এক বাক্যে বিষয়বস্তুর অবতারণা করবো যেন পাঠকেরা পরবর্তীতে ভাবতে পারে : জনাব মায়ার ১৩ বছরের জেলদন্ড হয়েছে তথাপি তিনি জেলে সময় না কাটিয়ে হাসািনার মন্ত্রী সভায় কাজ করছেন ।

বাংলাদেশ একটি কমন ল রাষ্ট্র যেখানে দন্ড বিধি আর ফৌজদারি আইনের বেশিরভাগ আইন বৃটিশ কলোনীর রেখে যাওয়া ।

স্বাভাবিক ভাবেই শুনানী ফৌজদারি আইনেই হোক আর বিশেষ আইনেই হোকনা কেন সাজা হবার পরের বিষয়টা একই রকম । আন্তত: ইংল্যান্ডের ক্রাইম প্রসিকিউটর সার্ভিসের এজেন্ট হিসাবে এক বছরেরও বেশি সময় কাজ করার পর আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি কখনো এই নিয়মের ব্যাতিক্রম দেখিনি ।

সুতরাং বেগম জিয়ার সাজা ঘোষণার পর যে বিষয় গুলো হতে পারতো তা হলো : বিচারক বিবাদিকে আহব্বান জানাতে পারতেন যে তাদের কোন আবেদন করার আছে কিনা ।

সাধারণত: এই প্রথম আবেদনটি কনভিকশণ ও সাজার বিরুদ্ধ আপিল করার অনুমতি চেয়ে করা হয়।
যদি এ আবেদন মৌখিক ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয় তখন উকিলেরা আদালতকে জানায় তারা লিমিটেশন পিরিয়ডের মাঝেই আপিল আবেদন করবে ।

দ্বিতীয় আবেদন করা হয় সাধারণত জামিন বহাল রাখার জন্য । কারন মানুষের স্বাধীন থাকার অধিকার সাংবিধানিক । যেহেতু বিবাদি মামলা চলা কালীন জামিনে থাকার মধ্যে দিয়ে তার মুক্ত থাকার সাংবিধানিক অধিকারের চর্চা করছেন কাজেই আপিল করার যে নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে সে পর্যন্ত তার জামিন বহাল রাখাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত । বাংলাদেশে ২৮ দিনের মধ্যেই আপিল করতে হয় । এ আইনটি বৃটিশ আমল থেকে পরিবর্তন হয়নি । আপিলের সময় সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেল দন্ড শুরু হবার দরকার হয়না । ( অন্যান্য আবেদন গুলি মামলার ব্যায় ও প্রমাণাদির ব্যাবস্থাপনার জন্য করা হয় ।)

বেগম জিয়াকে জেলে নিয়ে আদালত যে দুটি অপরাধ করেছে তা হল ; জি ঠিকই পরেছেন আদালত অপরাধও করতে পারে ! যখন বেগম জিয়া আরো অন্তত: ২৮ দিন মুক্ত থেকে আপিল আবেদন প্রস্তুত করতে পারতেন সেটা অস্বীকার করে এবং দ্বিতীয়ত তাঁকে তার আইনজীবি নিয়োগে বাধা দেয়ার মাধ্যমে ।
আইনজীবিরা জেলখানায় তার সাথে দেখা করতে পারবেন কিনা সেটা কোন সমাধান নয় । সর্বশেষে: আদালত তাঁকে অন্তরীন করে রাখলেন যখন তিনি আইনগতভাবে অন্তরীন থাকতে বাধ্য নন ।

যখন তার জামিনের আবেদন করা হয় তখন আদালত বিষয়টি বিবেচনা করতে পারত । অবশ্যই ক্রিমিন্যাল প্রসিডিউর ( CrPC) ও সংবিধান সকল আইনের উপর ।

সবচেয়ে সামন্জস্যপূর্ণ ধারাটি হল ফৌজদারি আইনের ৪২৬ ধারা যেটা বকেয়া আপিলের শুনানী না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত নিয়ে এবং আপিল কারীর জামিনে মুক্তি নিয়ে কাজ করে ।

৪২৬ ধারার ১ উপধারা মতে, ” কনভিক্টেট ব্যাক্তির
কোন আবেদন বকেয়া থাকলে, আপিল কৃত আদালত যে সাজার বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে সেটি মুলতবি করার আদেশ দিতে পারেন এবং আপিল কারীকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন ।

এমন একটি আপিল বকেয়া হয়ে যায় যখন কোন এক পক্ষ মৌখিক ভাবে আপিল আবেদন করে বা আবেদনের নোটিশ প্রদান করে । আপিলকারীর উকিল একই দিনে ফর্ম পূরণ করে টাকা জমা দিয়ে আপিলের সংক্ষিপ্ত গ্রাউন্ড লিখে জমা দিতে পারে । পরবর্তীতে আরো এবং অধিকতর উন্নত গ্রাউন্ড লিখে জমা দেয়ার সুযোগ থাকে । এসব কিছুই হয় মামলার ব্যাবস্থাপনার অংশ ।

বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্টের আপিলেড ডিভিশণ ডিসক্রেশনের ব্যাবহার বিধি সম্পর্কে বলেছে ; যেহেতু আপিল নিস্পতিতে সময় লাগে বিধায় স্বল্প সাজার বিরুদ্ধে আপিল চলা কালীন কোর্টের জামিন প্রদানে যথাযথ ডিসক্রশণ প্রয়োগ করা উচিত নতুবা আপিল অর্থহীন হয়ে পরে ।
আলাউদ্দীন বনাম রাষ্ট্র মামলা ১৯ বিএলডি(এডি)২০২ দেখুন । একই সাথে দেখুন কিভাবে এটাকে রাষ্ট্র বনাম আব্দুল মমিন সরদার [৫০ ডিএলআর ৫৮৮] এ মামলায় যেখানে আসামীর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছিলো তার সাথে থেকে পৃথক করা হয় ।

জামিন দেয়া হবে কি নি সেটা বিবেচনায় আদালতের ডিসক্রেশনারী ক্ষমতার ব্যাবহারের জন্যআদালত যে বিষয় গুলো বিবেচনায় নেয় তা হল আসামীর বয়স, পেশাগত অসুবিধা অথবা আর্থিক দূর্ভোগ, স্বত:প্রণোদিত আত্মসমর্পন, বিচার চলাকালীন ব্যাবহার এ সব কিছুই বিবেচনায় আনে । দেখুন : আব্দুল হোসেন(মো:) বনাম রাষ্ট্র [৪ বিএলসি ১৫১]

বেগম খালেদা জিয়া তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী । বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক সেনা প্রধান ও মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী । তার ক্ষেত্রে পালিয়ে যাবার কোন ঝুঁকিই নেই । এমনকি আইনের ধারা ব্যাহত হবার কোন ঝুঁকিও নেই । নতুবা তিনি যুক্তরাজ্য ভ্রমন থেকে ফিরে যেতেননা । আথবা হয়রানি মূলক ও দমন মূলক ভাবে করা শুনানিতে উপস্থিত হতেননা ।

যদিও ৪২৬ এক ৩ ধারা মতে ” যখন আপিলকারীর অনিবার্য ভাবেই জেল দন্ডে দন্ডিত হবেন অথবা স্থানাম্তরের জন্য আদিষ্ট হবেন, সে সময়টা তার সাজার মেয়াদ থেকে বাদ যাবে, প্রশ্ন হলো যদি সে নির্দোষ প্রমাণ হয় তাহলে তার সাজার ক্ষতি কিভাবে পূরণ হব ? পুরো বিচার বিষয়টাই একটা ভ্রান্ত সাব্যস্ত হবে না কি ?

উপরল্লেখিত কারণে আমি তাঁর বর্তমান কনভিকশণের আপিলের আবেদনে বেআইনী অন্তরীণ একটি অতিরিক্ত গ্রাউন্ড হিসাবে যুক্ত করতে আবেদন করছি । অবশ্যই তার আপিল আবেদনের ফোকাস পয়েন্ট হবে নির্যাতন ও দমনমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া এবং মামলার সারবত্তাহীনতা ।

:: লেখক বৃটিশ আইনজীবি ।

অনুলিখন : আখতার মাহমুদ ।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 7278 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com