বাজারে আগুন, মনে হয় আত্মহত্যা করি

নভেম্বর ৯, ২০১৭ ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ

পারভীন সাঁকো:

একজন মানুষের শরীর ৬০% পুড়ে গেলে, তার আর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে না! আজ আমার গায়ে আগুন লেগেছে ! আমি পুড়ে গেছি ১০০% পুড়ে গেছি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের আগুনে! আমার শরীরটা না জ্বললেও, মনটাকে ১০০% পোড়াতে সক্ষম হয়েছে! আর সেই পোড়া মন নিয়ে দিব্যি বেঁচে আছি, বৃদ্ধা “মা” আর দুই মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাকে বেঁচে থাকতে হয়, তাই বেঁচে আছি।

শুধু আমিই না, আমার মতো অনেকেই বেঁচে আছে এমনি করে ধুঁকে ধুঁকে! গত কয়েকদিন টাউন হল বাজার, কৃষিমার্কেট আর শিয়া মসজিদ বাজারের এক মাথা থেকে আরেক মাথা হেঁটে হেঁটে স্যান্ডেলের সাথে মনটাকেও ক্ষয় করে ফেললাম!

তিন আঁটি মুলা শাক ৭০ টাকা, অনেক দরাদরি করে ৬০ টাকায় কিনতে সক্ষম হয়েছি! ছোট ছোট দুইটা ফুলকপি ৮০ টাকা, নিজ দেশের নদীর ইলিশ, প্রতিদিন দেখে দেখে ফিরে আসি! এক কেজি সাইজের একটা ইলিশের দামে এক আনি স্বর্ণ কেনা যাবে। দেখতে রুপালী হলেও দামের ঠ্যালায় এর নাম দিয়েছি আমি সোনালি ইলিশ! ভারত আমাদের দেশের পানি নিতে অস্বীকৃতি জানালেও ইলিশ নিতে অস্বীকৃতি নেই! বরং দিগুণ আগ্রহ আর উদ্দীপনার সহিত এগিয়ে না আসলে, রুপালি ইলিশ সোনার দামে নয়, তখন রুপার দামেই এদেশের মানুষ কিনে খেতে পারতো।

প্রতি মাসে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ( ছোট একটা জিম ও পার্লার চালাই) আর বাড়ি ভাড়ার ৪০ হাজার টাকা, ব্যাংক লোনের কিস্তি ১০ হাজার টাকা, এরপর ডিশের বিল, নেটের ভিল, কারেন্ট বিল, জোগাড় করতে রক্তমাসের শরীরটাকে পুরা রোবট করে ফেলেছি! তার উপর দুই মেয়ের লেখাপড়া আর আনুষঙ্গিক খরচের কথা না হয় বাদই দিলাম! কোনরকম শাকপাতা খেয়ে বাচ্চা দুইটা আর মাকে নিয়ে বেঁচে ছিলাম এতোদিন। মাছ মাংস তো দূর অস্ত, এখন তো শাকসবজি খেয়ে বেঁচে থাকাটাই একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার জন্য! খাবো! নাকি ভাড়া-বিল জোগাড় করবো!

কিছুদিন আগেই চিকনগুনিয়ার তাণ্ডবে পুরো শরীর ও মন এমনিতেই বিপর্যস্ত। অথচ সরকারিভাবে এটার বিরুদ্ধে তেমন কিছুই চোখে পড়লো না, কিন্তু আমার জানা মতেই আশপাশের প্রতিটা বাড়ি, প্রতিটা পরিচিত মানুষের বাসায় এর তাণ্ডব ঘটে গেছে। অথর্ব, পঙ্গু অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি আমরা আক্রান্তরা।

স্বপ্ন দেখতাম বড় মেয়েটা কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পাবে! সেই স্বপ্ন আমার স্বপ্নই রয়ে গেলো! মেয়েটাও একই স্বপ্ন দেখে গত কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিতে গিয়ে হাড় জিরজিরে হয়ে গেছে, না দিতে পেরেছি ভালো খাবার, না পুষ্টি। ভালো কোনো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াতে গেলে মিনিমাম ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা লাগে, হয়তো সংখ্যাটা আরও বেশিও হতে পারে। আমার শরীরের সবগুলা পার্টস বিক্রি করেও এতো টাকা জোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই শেষ ভরসা।

বিবিএ করেই যে সে চাকরি পাবে এমনটাও কিন্তু না! এখন বিবিএ/ এমবিএ করা ছেলেমেয়ে প্রতিটা ঘরে ঘরে। আমার দেখা এইরকম অনেকেই আছে যারা বিবিএ শেষে বিয়ে করে স্বামীর বাড়িতে হাউজ ওয়াইফের চাকরি করছে। জানি না শেষ পর্যন্ত মেয়ের কপালে কী আছে!

মাঝে মাঝে মন চায় চারজন একসাথে আত্মহত্যা করি! এইভাবে বেঁচে থাকা যায় না! তারপরেও বেঁচে আছি, বেঁচে থাকতে হবে আমাকে। হার মানতে শিখিনি যে! তবে দিন দিন টিকে থাকার লড়াইটা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে! প্রতিটা ক্ষেত্রে এতো বেশি প্রতিযোগিতা যে, ভালো খারাপের যাচাই করা মুশকিল! যার যতো বেশি টাকার পাওয়ার, তার ততো বেশি শো অফ! কথায় আছে, (প্যাহলে দর্শনদারী, বাদমে গুণবিচারি) আমার না আছে টাকার পাওয়ার, না আছে চোপার পাওয়ার!

আমার একমাত্র পুঁজি আমার সততার পাওয়ার। সততা দিয়ে আর যাই হোক চাকচিক্য হয় না! তাই আমার কাছে তারাই আসে যারা প্যাহলে গুণ বিচার করে বাদমে দর্শন! এইরকম মানুষের সংখ্যা যে খুবই কম! আর তাই প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার লড়াইয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি! হয়তো একসময় পিছুতে পিছুতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবো! তখন কেউ আর মনে রাখবেনা সাঁকো নামের এক জীবন যোদ্ধা এই আমাকে!

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1043 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com