ফ্রাঙ্কেনস্টাইনদের পরিণতি কখনোই ভালো হয়না

ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৮ ৯:১১ পূর্বাহ্ণ

:: ১৮১৮ সালে মেরি শেলীর লেখা ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ ইংরেজি সাহিত্যের একটি কালজয়ী উপন্যাস। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নামক এক ব্যক্তি। তিনি জেনেভার একটি অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই বিদ্যানুরাগী এবং অসম্ভব মেধার অধিকারী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি মানুষের শরীরে প্রবাহিত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করেন। এই গবেষণার মাধ্যমে তিনি মৃত মানুষকে জীবিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

খ্রিষ্টান ধর্মমতে মৃত মানুষেকে জীবিত করার সংকল্প নিয়ে গবেষণা করা নিষিদ্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দ্ধতন শিক্ষকদের সাথে তার প্রচন্ড বাক্যবিনিময় হয়। অতঃপর অন্য এক শিক্ষকের সহায়তায় তিনি তার গবেষণাকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেন। ইতোপূর্বেই উক্ত শিক্ষকের গবেষণালব্ধ ডাটা থেকে তিনি বিভিন্ন মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একসাথে সেলাই করে জোড়া লাগিয়ে তাতে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহিত করে মৃত মানুষকে জীবিত করার কৌশল আয়ত্ব করেন।

এই কৌশলের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ একসাথে জোড়া লাগিয়ে একটি মানুষ তৈরি করেন। নতুন জন্মলাভ করা এই মানুষটির দেখতে ছিল অনেকটা মানুষরূপী দৈত্যের মতো। এর সারা শরীর ছিল আজস্র কাটা-ছেঁড়া এবং অসংখ্য সেলাই। দৈত্যের মতো দেখতে এই মানুষটি যখন সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে মিশতে চেয়েছিল তখন মানুষ তাকে সমাজ থেকে নির্যাতন করে বিতাড়িত করে দেয়। ঐ সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি।

বিতাড়িত এই দৈত্যেরূপী মানুষটি একসময় প্রতিজ্ঞা করে যে তাকে সৃষ্টি করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি তাকে সে ক্ষমা করবেনা। তাকে সে হত্যা করবে।

দৈত্যরূপের মানুষটি তার সৃষ্টিকর্তার সন্ধান করতে লাগলো। এক সময় সে তার সৃষ্টিকর্তা ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সন্ধান লাভ করে। দৈত্যরূপী মানুষটি প্রথমে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের পিতা ও ছোট ভাইকে হত্যা করে। এক পর্যায়ে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে সে বলে আমি তোমাকে এবং তোমার পরিবারের আর কাউকে হত্যা করবোনা যদি তুমি আমার জন্য আরেকজন মেয়ে সঙ্গিনী বানিয়ে দাও। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এই প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি তাকে জানিয়ে দেন আমি আর এই কাজ করতে পারবোনা।

রেগে গিয়ে দৈত্যরূপী মানুষটি ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বাসর ঘর থেকে তার ছোটবেলার বান্ধবী, প্রেমিকা এবং নববিবাহিত স্ত্রী ইসাবেলার হৃদপিণ্ড টেনে ছিড়ে বের করে নিয়ে আসে । প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাঁচিয়ে রাখতে অসহায় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ওই রাতেই অন্য আরেকটি মৃত নারীর শরীরের সাথে তার মৃত স্ত্রীর মাথা জোড়া লাগিয়ে স্ত্রীকে সে বাঁচিয়ে তোলে। নতুন জন্মলাভ করা তার স্ত্রী প্রথমে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের আবেদনে সাড়া দিয়ে তাকে গ্রহণ করে। ঠিক একই সময়ে দৈত্য মানুষটি তার স্ত্রীর সামনে আসলে স্ত্রী কনফিউশনে পড়ে যায় আসলে সে কার কাছে যাবে। একদিকে তার ভালবাসার স্বামী অন্যদিকে তার চেহারার অবয়বের কাটাছেঁড়ার সাথে মিল থাকা দৈত্য। এইরকম একটি উভয় সংকটপূর্ণ অবস্থায় তার স্ত্রী ইসাবেলা নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে আত্মহত্যা করেন।

মানুষরূপী দৈত্যটি তখন সেখান থেকে পালিয়ে উত্তরে চলে যায়। অন্যদিকে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দৈত্যকে হত্যা করার জন্য তার পিছু নিতে থাকে। এভাবে তারা উত্তরের আর্কটিক মহাসাগরের পৌঁছে যায়। ঐ সাগরের ওপরের অংশের পানি জমে পুরো বরফের স্তর হয়ে গিয়েছিল। এ সময় ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সাথে হঠাৎ করে একদল নাবিকের দেখা হয়। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মুখ থেকে মানুষরূপী দৈত্যের কথা নাবিকদলের সবাই জানতে পারে। এমত অবস্থায় প্রচন্ড শীতে নাবিকদের জাহাজে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন মৃত্যুবরণ করেন।

সাগরের মাঝখানে বরফের উপর আগুন ধরিয়ে সেখানে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কে পুড়িয়ে শব যাত্রার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সেখানে মানুষরূপী এই দৈত্যটি উপস্থিত হয়। ঠিক ওই মুহুর্তে সাগরের বরফের টুকরো ভেঙে খানখান হয়ে যায়। নাবিক দলের সকলেই জাহাজে আশ্রয় নেয়। মানুষরূপী দৈত্যকেও জাহাজে আশ্রয় নেয়ার জন্য জাহাজের ক্যাপ্টেন আহ্বান করে। কিন্তু দৈত্যটি ক্যাপ্টেন কে বলে আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে ছেড়ে কোথাও যাবনা। কারন মৃত ফ্রাংকেনস্টাইন হচ্ছে আমার জন্মদাতা।

বরফের ওপর ফ্রাঙ্কনেরস্টাইনের মৃতদেহকে মশাল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দৈত্যটি নিজেই। উক্ত আগুনের দৈত্যটি নিজেও পুড়ে মারা যায়। এভাবেই সমাপ্তি হয় বিখ্যাত ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসের নায়ক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেস্টাইন ও সৃষ্টির।

পৃথিবীর রাজনীতিতে একটি বহুল আলোচিত শব্দ হলো ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। যখনই কোনো সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অস্বাভাবিক আচরণ করে, মানুষের উপর নির্যাতন চালায় এবং উক্ত সরকার জনগণকে বাদ দিয়ে একনায়কতান্ত্রিক আচরণ শুরু করে তখন বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উক্ত সরকার এবং তার কর্মকান্ডকে নির্দেশ করতে ফ্রান্কেনস্টাইন শব্দটি ব্যবহার করেন।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের সাথে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন শব্দটিও খুব বেশি যুতসই বলে আমার কাছে মনে হয়। এই মনে হওয়ার পিছনে বর্তমান সরকারের আচরণ অনেকটাই দায়ী ।

বিনা ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ (organ) অঙ্গ-প্রতঙ্গ যেমন আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ মারাত্মক একনায়কতান্ত্রিক ভাবে ব্যবহার হচ্ছে। যার কারণে সরকারের এসব অঙ্গ-প্রতঙ্গ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন গল্পের মত এক একটি মানুষরূপী দৈত্যে পরিণত হচ্ছে। বিশেষকরে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ অতীতের যেকোনো ইতিহাস ভঙ্গ করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

বিভাগের কথা নাই বললাম। যেখানে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। বিচারকরা দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। আর এই সরকার যেহেতু বিনা ভোটে নির্বাচিত সেহেতু আইন বিভাগ বলতে কিছু একটা আছে বলে মনে হয়না। যারা আইন প্রণয়ন করবেন তারা যদি জনপ্রতিনিধি না হন তাহলে তারা কিসের আইন প্রণয়ন করবেন? আর এসব আইনের কোন বৈধতা আছে বলে মনে হয়না। সরকারের এসব অর্গান সমূহের এমন আচরণ ক্রমেই মানুষের মনে সন্দেহর দানা বাঁধিয়ে দিচ্ছে।

এছাড়াও ক্ষমতায় থাকা আওয়ামীলীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী এবং ভুঁইফোড় সংগঠন গুলো দেশের মানুষের সাথে যেরকম আচরণ করছে মানুষ তা কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। এমতবস্থায় ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ছত্রছায়ায় আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পরিণত হচ্ছে এক একটি দৈত্যে। আর সবগুলো দৈত্য মিলিয়েই যেন বহুরূপী সরকার এক বিশালাকার দৈত্য।

ফ্রাঙ্কেনস্টাইন গল্পে দৈত্যটি যেমন তার নিজের সৃষ্টিকর্তা পিতাকে সাথে নিয়ে আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করেছিল ঠিক তেমনি সরকারের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং সরকারের বিশৃংখল organ সমুহ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতোই সরকারকে এক সাথে নিয়ে ঝরে পড়বে কিনা তা ভাবার বিষয়।

-শ্যামল মালুম, আহ্বায়ক
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রদল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1160 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com