ফনি মামার মশাপাখি

ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৭ ৩:০৮ অপরাহ্ণ

ঘরে ঢুকেই অবাক হওয়ার মতো একটা ঘটনা দেখল রোটন। দিনের বেলা ফনি মামা মশারির ভেতর ঢুকে বসে আছেন। বিজ্ঞানীদের মতো হাতে মাইক্রোস্কোপ, মাথায় টর্চলাইট। মশারির ভেতর গভীর মনোযোগে কী যেন দেখছেন। মাঝেমধ্যে খাতায় নোটও নিচ্ছেন। ঘটনা অবাক হওয়ার মতো হলেও রোটন খুব একটা অবাক হলো না। বরং ঘরের ভেতর মামাকে পেয়ে খুশিই হলো। মামার এ রকম কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সে আগে থেকেই পরিচিত।
‘কী করছ মামা?’
মামা রোটনের কথার জবাব না দিয়ে বললেন, ‘পাশের চেয়ারটায় চুপ করে বোস।’
রোটন লক্ষ্মী ছেলের মতো চুপ করে বসে পড়ল। তার ভীষণ ভালো লাগছে। ফনি মামাকে রোটনের এমনিতেই একটু বেশি ভালো লাগে। তার ওপর মামার অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড তো আছেই। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর মশারির ভেতর থেকে ফনি মামা বেরিয়ে এলেন। তাঁর মুখে তৃপ্তির হাসি। হাত দিয়ে রোটনের চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, ‘হুটোন মিয়াঁ কী খবর?’
মুহূর্তেই রোটনের মন ভালো হয়ে গেল। মামার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল সে। ফনি মামা রোটনকে হুটোন বলে ডাকেন। অন্য কেউ এই নামে ডাকলে রোটনের রাগ লাগে, কিন্তু ফনি মামা ডাকলে কেন জানি ভালোই লাগে। ভালো লাগার কারণ রোটন জানে না। মামার দিকে তাকিয়ে রোটন কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, ‘মশারির ভেতর কী করছিলে মামা?’
ফনি মামা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘মশাপাখি নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম।’
রোটন চোখ কপালে তুলে বলল, ‘মশাদের নিয়ে আবার কিসের এক্সপেরিমেন্ট? তা ছাড়া মশা আবার কবে থেকে পাখি হলো?’
মামা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘তুই তো দেখি মহা গাধা, কিছুই জানিস না!’ এরপরই হাত নেড়ে নেড়ে বললেন, ‘মশা পাখিদের মতো উড়তে পারে। পাখিদের মতো ডিম পাড়ে, পাখিদের মতো গানও গায়, তাহলে মশা কেন পাখি নয়?’
রোটনের চোখমুখ বিস্ময়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনে মনে বলল, ‘সত্যিই তো!’ এরপর মামার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘তাহলে তো মাছি, তেলাপোকা এগুলো সবই পাখি, তাই না মামা?’
রোটনের কথায় মামা আরও উৎসাহ পেলেন। বললেন, ‘ঠিক বলেছিস। এরাও পাখি। তবে এক এক করে কাজ করতে হবে। আগে মশাকে পাখিসমাজে মর্যাদা দিই, তারপর এক এক করে সবাইকে দেব।’
রোটন বলল, ‘কীভাবে এদের পাখিসমাজে মর্যাদা দেওয়া হবে?’
মামা বললেন, ‘একটু অপেক্ষা কর, ছেলেপেলে চলে আসবে। তখনই বলব।’
কিছুক্ষণ বসে থাকার পর রোটন দেখল, তার বয়সী দশ-পনেরোজন ছেলে মামার ঘরে এসে ঢুকল। সবাই হইহুল্লোড় করছিল, মামা ওদের শান্ত হয়ে বসতে বললেন। সবাই শান্ত হওয়ার পর মামা কথা বলা শুরু করলেন। মশাদের কীভাবে পাখিসমাজের মর্যাদা দেওয়া যায়, এই হলো আলোচ্য বিষয়।
মশার প্রতি মামার ভালোবাসা দেখে মামার প্রতি রোটনের ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ রোটনের মনেও মশাদের প্রতি এক রকম ভালোবাসা জন্ম নিল।

২.
মশাদের পাখিসমাজে মর্যাদা দেওয়ার আন্দোলন ভালোই চলছিল। পাড়ার ছেলেপুলেদের অনেকেই যোগ দিয়েছিল মামার সঙ্গে।
হঠাৎ এক সকালের ঘটনা। চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে রোটনের ঘুম ভাঙল। বারান্দায় বেরিয়ে রোটন অবাক হয়ে দেখল, বাড়ির সবাই উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নানাভাই। তাঁর মুখে তৃপ্তির হাসি। সামনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনে তিনি কী যেন পুড়ছেন। কাছে যেতেই রোটন চমকে উঠল। এ তো ফনি মামার মশাপাখি চাষের মশারি! সঙ্গে মামার বিছানার তোশকও।
ফনি মামার কথা মনে পড়ল রোটনের। গতকালও মামাকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ায় জমজমাট আন্দোলন হয়েছে। মশাকে পাখির মর্যাদা দেওয়ার আন্দোলন। স্লোগানে স্লোগানে পুরো পাড়া সরগরম করে ফেলেছিল ওরা। ‘মশা নিধন বন্ধ করো, মশাপাখি রক্ষা করো’, ‘আমার ভাই তোমার ভাই, মশাপাখি ভাই মশাপাখি ভাই’…এমন আরও কত স্লোগান! মামা বলেছেন, লোকজন এবার মশাকে পাখির মর্যাদা না দিয়ে যাবে কোথায়! রোটনেরও তাই মনে হয়েছিল। মামার কথা মনে হতেই রোটন দৌড়ে ফনি মামার ঘরের দিকে গেল।
মামার ঘরে ঢুকে রোটন এবার সত্যি সত্যি অবাক হলো। পুরো ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মশা তো দূরের কথা, একটা পিঁপড়াও নেই। মামা বিছানায় শুয়ে আছেন। লেপ মুড়ি দিয়ে শোয়া যাকে বলে। পা থেকে মাথা অবধি ঢাকা। মামার গায়ের ওপর আলতো করে হাত রাখল রোটন। মামা একটু নড়েচড়ে উঠলেন। মুখের ওপর থেকে লেপ সরিয়ে একগাল হেসে বললেন, ‘রুটোন নাকি রে?’
রোটন বলল, হু। তোমার কী হয়েছে মামা?’
‘আর বলিস না, মশার কামড় খেয়ে ম্যালেরিয়া বাঁধিয়ে ফেলেছি। চিন্তা করিস না, জ্বর সেরে গেলে নতুন কিছু নিয়ে কাজ করব। মশা, মাছি, তেলাপোকাকে পাখি বানানোর আন্দোলন আপাতত বাদ। এরা পোকা আছে পোকাই থাকুক। পাখিসমাজে এদের এনে কোনো কাজ নেই, বুঝলি?’
রোটন বিড়বিড় করে বলল, ‘হু!’
মামা আর কথা বাড়ালেন না। ‘তুই এখন যা, আমি একটু ঘুমোব’ বলেই আবার লেপের ভেতর হারিয়ে গেলেন।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1175 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com