নীল ফুল

নভেম্বর ১১, ২০১৬ ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

নীল ফুল
মূল: হেনরি ভ্যান ডাইক
অনুবাদ: বিদ্যুত খোশনবীশ

মা-বাবা ঘুমিয়ে। অলস দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দে বুঝা যাচ্ছিলো সময় ফুরিয়ে যাবার কোন চিন্তা ওটার নেই। জানালার বিরক্তিকর খটখট শব্দের মধ্যেও কানে আসছিল চঞ্চল বাতাসের ফিসফিসানি । আকাশে তখন চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি। ঘরে অদ্ভুত আলো-আঁধারি। একটি কিশোর; বিছানায় শুয়ে আছে নির্ঘুম। তার মন ও মগজে এক আগন্তুক আর তার থেকে শোনা গল্পের-দৌড়ঝাপ।
‘লোকটি যে গুপ্তধনের কথা বলেছিলো আমি তা নিয়ে ভাবছি না।’ বিছানায় শুয়ে নিজের সাথে এভাবেই কথা বলছিলো ছেলেটি। ‘লোকটির গল্প শুনে আমার মধ্যে যে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরী হয়েছে তা ঐ গুপ্তধনের প্রতি নয়। ধন-সম্পদের প্রতি আমার কোন লোভ নেই। কিন্তু যে নীল ফুলটির কথা উনি বললেন, আমার সব চিন্তা ওটাকে নিয়েই। আমি আর অন্য কিছুই ভাবতে পারছিনা। আগে কখনোই আমার এমন হয়নি। মনে হচ্ছে, আমি এখনো স্বপ্নের মধ্যে আছি, নতুবা ঘুমের মধ্যেই এসে গেছি নতুন এক পৃথিবীতে।’
‘ঐ পুরনো পৃথিবীতে ক’জনই বা ফুল নিয়ে মাথা ঘামায়? আমি কখনো এমন কারো কথা শুনিনি, যে একটা ফুলের জন্যে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে। অথচ একটা ফুলের জন্যে আমি অন্য সবকিছুই ভুলে গেছি। মনে হচ্ছে, আমি এখন স্বপ্নলোকে আছি; একটা নীল ফুলের ভালবাসায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আছি। যখনই ঐ ফুলের ছবি আমার মনের আয়নায় অস্পষ্ট হয়ে যায় আমি তখনই তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠি, নিঃসঙ্গ বোধ করি। জানি,আমার এই অনুভূতি অন্য কাউকেই বুঝাতে পারবো না।

বিছানায় শুয়ে এসব কথাই ভাবছিলো ছেলেটি।
‘লোকে বলে, অনেক অনেক দিন আগে ফুল-পাখি-প্রজাপতিও নাকি কথা বলতো মানুষের সাথে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, সেই দিনগুলো হাঁটিহাঁটি করে আবার ফিরে আসছে। পশু-পাখি, গাছপালা, পাহাড়, নদী ওরা সবাই আবারো কথা বলতে চায়। ওদের দিকে তাকালেই আমি বুঝতে পারি ওরা কী বলতে চাইছে। তবে ওদের ভাষা পুরোপুরি জানা নেই আমার। থাকলে,আরো ভাল করে বুঝতে পারতাম ওদের।’
এভাবেই ছেলেটি ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলো তার মায়াবী কল্পলোকে। নিজেকে আবিস্কার করলো কোন এক অজানা দূর দেশে। অদ্ভুত সেই দেশ। চোখের পলকেই সে পাড় হয়ে গেল আঁকাবাঁকা এক নদী। ওর সামনে দিয়ে এদিক ওদিক ছুটে গেল আজব কিছু জন্তু-জানোয়ার। দেখা হলো; কথা হলো বার রকম মানুষের সাথে কখনো যুদ্ধের ময়দানে, কখনো কোন ব্যস্ত নগরে কিংবা ছোট্ট কোন কুড়ে ঘরে। সৈন্যদের হাতে একবার বন্দীও হলো সে। কল্পনাতেই প্রচন্ডভাবে ও অনুভব করলো বন্দীশালার দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে হয়নি ওকে। ছাড়া পেয়েই বুক ভরে দম নিল মুক্ত বাতাসে,মুক্ত পৃথিবীতে।
রাত পেড়িয়ে হলো ভোর, তারপর সকাল।

দিনের আলোতে চারপাশের সবকিছু আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল ওর চোখে।
সামনে পর্বত; ঘন বন। মোটেও ভয় না পেয়ে সেদিকেই পা বাড়ালো ছেলেটি। গাছের ফাঁক-ফোকড় গলিয়ে বনের গভীরে তখন চলছিলো আলোর নাচন। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে পৌঁছে গেল এক গিরিপথে। যেদিকে চোখ যায় শুধু পাথর আর পাথর। ছোট, বড়, লম্বা, গোলÑ হরেক রকম পাথর। সরু একটা নদীও চোখে পড়লো তার। মৃদু কলকল শব্দে নদীটি যেন গোপনেই ছুটে চলছিলো নিচের পৃথিবীর দিকে। তবে নদীর সঙ্গী হয়ে নয়, তার উল্টো দিকে পর্বতের গা বেয়ে উঠতে শুরু করলো সে। ছেলেটি যতোই উপরে উঠছিলো ততোই হালকা হয়ে আসছিলো বনের গভীরতা।
কিছু দূর উঠবার পর সে এসে থামলো পর্বতের ঢালুতে; সুন্দর এক তৃণভূমিতে। সবুজ ঘাস আর রঙবেরঙের বুনো ফুলের চাদরে মুরানো সে এক অদ্ভুত জায়গা। তৃণভূমির ওপারে দুপাশে আকাশ সমান উঁচু পাহারের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সরু এক পথ। আঁকাবাঁকা, খানিক অন্ধকার। দেখে মনে হয়, এ পথ ধরে এগুলেই পৌঁছা যাবে পাতালপুরীতে। ঐ পথ ধরেই এগুলো ছেলেটি। কী আশ্চর্য! অন্ধকার অথচ মসৃণ পথ। হোঁচট খাবার ভয় নেই কোথাও; অতিকায় এক গুহামুখে যার সমাপ্তি। কিন্তু অন্ধকার নয়, চোখ ঝলসানো অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা ঠিকরে বের হচ্ছিলো সে গুহা থেকে। গুহার ভেতর ঢুকে পড়লো সে। অদ্ভুত উজ্জ্বল আলো গুহার দেয়ালে আছড়ে পড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো স্ফুলিঙ্গের মতো। সামনে বিশাল এক দিঘি। সেখানেও আলোর প্রপাত। যেন এক অলৌকিক আলোর সরোবর। স্বর্ণের চাইতেও চকচকে সে আলো। কিন্তু কোন শব্দ নেই তার উত্থানে, তার পতনে। এ যেন এক সমাধিমন্দির; চারিদিকে পবিত্র নিস্তব্ধতা। আনন্দ আর বিস্ময়ে পুরো গুহায় ছড়িয়ে আছে এক গভীর মৌনতা যা এর আগে কেউ কখনো লংঘন করেনি। গুহার গা বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়া আলোর ফোটা চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো রহস্যময় নীল আভা।
কিন্তু ছেলেটি ঐ সরোবরের কাছে যেতেই ওটার জল কেঁপে উঠলো, শুরু হলো বর্ণিল আলোর ঝলকানি। এতো রঙের খেলা এর আগে কখনো সে দেখেনি। হাত দিয়ে কিছু জল তুলে ছেলেটি তার ঠোট ভেজালো। ঐ জলের স্পর্শে ওর হৃদয়ে শীতল হাওয়া বয়ে গেল। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি!
ওর তখন ইচ্ছে হল ঐ জলে ডুব দিতে। তাই দেরি না করে ও ঝাঁপিয়ে পড়লো। গোধুলি লগ্নে আকাশে যে মেঘ জমে, ওর মনে হলো সেই মেঘেই ও স্নান করছে। এক স্বর্গীয় আনন্দে ও মগ্ন হয়ে গেলো। ছেলেটির তখন কেন জানি মনে হলো সরোবরের ঢেউগুলো আস্তে আস্তে এক ঝাঁক জলপরী হয়ে তাকে ঘিরে ধরেছে। ওর তখন বেশ আনন্দ হচ্ছিলো। সরোবরের প্রতিটি ঢেউয়ের স্পর্শ ও অনুভব করছিলো গভীরভাবে। হুট করে মৃদু ঢেউগুলো বড় হতে শুরু করলো। ঢেউয়ের ধাক্কায় ও গিয়ে আছড়ে পড়লো পাহারের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া আরো একটি সরু পথের সামনে। ঢেউয়ের আঘাতে ছেলেটির চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। স্বপ্নীল যন্ত্রণায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ওখানেই কিছুক্ষণ পড়ে রইলো সে।
জেগে উঠার পর ও লক্ষ্য করলো, আগের চেয়েও এক অদ্ভুত কোমল আলো ওকে ঘিরে আছে। ও শুয়ে আছে খোলা আকাশের নিচে মিহি ঘাসের উপর। কী অদ্ভুত সবুজ সে ঘাসের রঙ! ও যেখানে শুয়ে ছিলো তার অদূরেই ছিল ছোট অথচ সুন্দর একটি ঝর্ণা। হীরার মতো জ্বলজ্বল করছিলো সেটার জল। পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে ঐ ঝর্ণার জল এমনভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো যেন রূপালী আতশবাজি। ঝর্ণার চারপাশের সবগুলো পাথর গাঢ় নীল। পাথরের গায়ের সাদা রেখাগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো, কেউ হয়তো রহস্যময় অক্ষরে কিছু লিখে রেখেছে। গাঢ় নীল ছিল আকাশটাও; ছিল মেঘহীন।
ছেলেটির মনে এতোক্ষণ যে ক্ষোভ দানা বেধে ছিলো এখন তা নেই। এখানকার প্রতিটি শব্দ ওর কাছে সংগীত; প্রতিটা নিঃশ্বাস নির্মল; আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটি পাথর যেন অতন্ত্র প্রহরী; প্রশান্ত আলো ভরা আকাশ সৌভাগ্যের আধার।

তবে একটা লম্বা স্বচ্ছ নীল ফুলের সামনে এসবকিছুই ছিলো তুচ্ছ। ঝর্ণার পাশে ফুটে থাকা ফুলটি ওকে সম্মোহিত করে ফেললো। এত অদ্ভুত সুন্দর ফুল ও কোথাও দেখেনি। ফুলটির লম্বা চকচকে পাতাগুলো ওকে যেন ছুঁতে চাইছিলো। চারপাশে আরো অনেক ফুল ছিলো। কোনটার নাম ওর জানা, কোনটা একেবারেই অজানা। ঐ ফুলগুলো এতোটাই বর্ণিল ছিলো যে, ওর মনে হলো পৃথিবীর সব রঙের ফুলই বুঝি এখানে আছে। তাছাড়া ওগুলো থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিলো মন মাতানো সৌরভ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। এক অদম্য আকর্ষণে সে শুধু ঐ নীল ফুলটিকেই দেখতে থাকলো।
ছেলেটা ফুলটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে ছিল অনেক্ষণ। এক সময় ওর ইচ্ছা হলো আরো কাছে গিয়ে ফুলটাকে দেখতে; একটু ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু কাছে যেতেই ফুলটা নড়ে উঠলো, কেমন জানি বদলে যেতে শুরু করলো। পাতাগুলো আগের চেয়ে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আর বোটা দ্রুত লম্বা হতে শুরু করলো। ফুলটির পাপরি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়লো যেন বিশাল এক নীলকান্ত মণি। কিন্তু এর চেয়েও অদ্ভুত ঘটনা তখনো ঘটতে বাকি। ছেলেটি অবাক হয়ে দেখলো, ফুলের মাঝখানে অপূর্ব সুন্দরী এক পরীর মুখ ভেসে উঠেছে। পরী হাসছে। হ্যাঁ, ওর দিকেই তাকিয়ে হাসছে!
আর ঠিক তখনই মা’র কন্ঠ তার কানে এলো। ও চোখ খুললো; দেখলো, সুর্যের সোনালী কিরণে ঘর ঝিলমিল করছে।

হেনরি ভ্যান ডাইক: আমেরিকান লেখক। জন্ম ১৮৫২ সালে। কর্ম জীবনে অধ্যাপনা করেছেন প্রিন্সটন ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের আমলে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নেদারল্যান্ডস্ ও লুক্সেমবার্গে। দ্য আদার ওয়াইজ ম্যান (১৮৯৬) এবং দ্য ফার্স্ট ক্রিস্টমাস ট্রি (১৮৯৭) তার সর্বাধিক জনপ্রিয় দুটি শিশুতোষ গল্প। হেনরি ভ্যান ডাইকের মৃত্যু ১৯৩৩ সালে।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1364 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com