নির্দেশ অমান্য করলেও নিশ্চুপ ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৮ ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ

হল-মার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির পর জনতা ব্যাংকে বড় কেলেঙ্কারির ঘটনায় তোলপাড় চলছে ব্যাংকিং সেক্টরে। এই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কল্যাণে মাত্র ছয় বছরে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর একক গ্রুপকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। অ্যানন টেক্স নামের ব্যবসায়ী গ্রুপটির উত্থানও অনেকটা বিস্ময়কর। এক সময়ে বাসের কন্ডাক্টরের কাজ করা ইউনূস বাদল এই গ্রুপটির কর্ণধার। ২০০৪ সালে ব্যবসায় নেমে ২০১০ সালে তিনি হাতে আলাদীনের প্রদীপ পেয়ে বসেন। জনতা ব্যাংকের মতিঝিল করপোরেট শাখা থেকে ৮০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শুরু।

২০১৫ সালে এই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ‘একক গ্রাহকের ঋণসীমা’ অমান্য করে বিপুল অঙ্কের এ অর্থ দেয়া হয়েছে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল সময়ে। অ্যানন টেক্সের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক দফায় বিভিন্ন নির্দেশনা দিলেও তা অমান্য করেছে জনতা ব্যাংক। বারবার নির্দেশ অমান্য করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সর্বশেষ সার্বিক বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে গত ৪ঠা জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি চিঠি দিলেও তার কোনো জবাব দেয়নি জনতা ব্যাংক। এদিকে অনিয়মের মাধ্যমে অ্যানন টেক্সকে বিপুল অঙ্কের এ ঋণ দেয়ার সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অন্যদিকে এই টাকা আদায়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবদুস ছালাম আজাদ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন প্রভাব খাঁটিয়ে ব্যাংক থেকে বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেন একশ্রেণির মানুষ। যাদের উদ্দেশ্যই থাকে ঋণ পরিশোধ না করার। আর কী কী উপায় অবলম্বন করলে ঋণ পরিশোধ করা লাগবে না সে উপায়ও বাতলে দেন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকাররা। এ উপায় বাতলে দেয়ার পুরস্কার স্বরূপ তারাও ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে সুবিধা নেন। এভাবে ঋণ নিয়ে ব্যক্তি বিশেষ রাতারাতি ধনী হয়ে সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরই আরেক উদাহরণ হলো জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটি ঋণ বিতরণে এক গ্রাহককে দিয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ ও ঋণ-সুবিধা।
জানা গেছে, ইউনুস বাদলের পথচলা শুরু হয় বাসের কনডাক্টরি দিয়ে। বাসের চাকার সঙ্গে ঘোরে তার ভাগ্যের চাকাও। পুঁথিগত ধারণার বাইরে গিয়ে গড়েছেন একের পর এক নজির। ২০০৪ সালে টঙ্গীর ভাদাম এলাকায় মাত্র দুই একর জায়গায় গড়ে তোলেন অ্যানন টেক্স গ্রুপ। তবে ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠতে শুরু করে ২০১০ সাল থেকে। এই গ্রুপের জমির পরিমাণ এখন ছাড়িয়েছে ১৫০ একর। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। জনতা ব্যাংকের সিবিএ সভাপতির টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করে দিচ্ছেন ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১ গম্বুজের মসজিদ। ২০০৪ সাল থেকে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় প্রথম ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করে অ্যানন টেক্স গ্রুপের জুভেনিল সোয়েটার। ওই শাখার বেশি ঋণ দেয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। ২০১০ সাল থেকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণসুবিধা নেয়া শুরু হয়।

২০১০ সালের ২৫শে আগস্ট জনতা ব্যাংকের ১৫৪তম বোর্ডসভায় গ্যালাক্সি সুয়েটারের নামে ৮০ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প ঋণ দিয়ে শুরু। এরপর কেবলই ছুটে চলা। মাত্র ৫ থেকে ৬ বছরের ব্যবধানে গড়ে তোলা অ্যানন গ্রুপের ২১টি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়, সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল অঙ্কের ঋণ পাস হয় ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের ব্যাংকের ২৪টি বোর্ডসভায়।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, এই গ্রুপকে ঋণ দিতে গিয়ে ব্যাংকটির শুধু একক গ্রহীতার ঋণ-সীমাই অতিক্রম করেনি, ছাড়িয়েছে অতীতের সব রেকর্ডও। নিয়ম অনুযায়ী, একক গ্রাহকের ঋণ-সীমা অতিক্রম করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হয়। তা না নিয়ে বরং নতুন করে আরো ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। এরপর ২০১৪ সালে অ্যানন টেক্সের মালিকানাধীন মেসার্স গ্যালাক্সি সোয়েটার ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিশেষ বিবেচনায় নবায়নে অনাপত্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসে। তখন মোট দায় একক গ্রাহকের ঋণ-সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার শর্তে অনাপত্তি দেয়া হয়। তবে শর্ত না মেনে উল্টো ১৮০ কোটি টাকার সিসি এবং ১২০ কোটি টাকার এলসি সীমা অনুমোদন করে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ২০০৯ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে দুই মেয়াদে ৫ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার সময়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পান ইউনুস বাদল। তার মূল ব্যবসা বস্ত্র উৎপাদন ও পোশাক রপ্তানি। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকেরও বড় অংকের বিনিয়োগ আছে বাদলের গ্রুপে। যোগাযোগ করা হলে ড. আবুল বারকাত এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। সূত্র জানায়, অ্যানন টেক্সের বিষয়ে কয়েকটি নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ দিয়ে সর্বশেষ গত মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুস ছালাম আজাদকে একটি চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সে চিঠির জবাব পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এমডি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা আদায়কে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে নেয়া হয়েছে। বিপুল অঙ্কের এই টাকা আদায়ে গঠন করা হয়েছে একটি কোর কমিটি। নিয়ম অনুযায়ী, একক গ্রাহককে ফান্ডেড, নন-ফান্ডেড মিলে একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ছিল ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। আর অ্যানন টেক্স গ্রুপের মালিকানাধীন মেসার্স গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্নসহ ২২টি প্রতিষ্ঠান ৩ বছরে ৮১৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ফেরত দেয়ার পর বর্তমানে তার কাছে ব্যাংক পাবে ৫ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদ্যমান মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। বিপুল অঙ্কের এ ঋণের বিপরীতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা এখন খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, গ্রাহকের ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ হাজার ৫২৮ কোটি টাকার ফান্ডেড ও এক হাজার ১২০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড ঋণ দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ১১টির অনুকূলে এখনও ‘প্রকল্প পরিপূরক প্রতিবেদন’ ইস্যু করা হয়নি। ফলে আদৌ এসব ঋণের সদ্ব্যবহার হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত নয়। একজন গ্রাহকের কাছে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিল তা জানাতে বলা হয়েছে। আর এ ঋণ কেন্দ্রীভূত করার ফলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় ব্যাংকের ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন ব্যবস্থা কার্যকর নয়। এ অবস্থায় চিঠি পাওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়। তবে চিঠির জবাব দিতে পারেনি ব্যাংক।

এদিকে সোমবার জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, অ্যানন টেক্সের বিষয়টি তিনিও জেনেছেন। এসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, আবুল বারকাত ঋণ গ্রহীতার বিষয়ে স্টেটমেন্ট দিয়ে বলেছেন যে, পার্টি ভালো। দেখা যাক কী হয়।
আবুল বারকাতের পর ৩ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। অ্যানন গ্রুপের পরিস্থিতি সন্তোষজনক না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে পর্ষদ। এর মধ্যে গত ৪ঠা জানুয়ারি চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা নিয়ম আছে, একজন ব্যক্তি কতটুকু ঋণ পাবে। একজন ব্যক্তির নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি ঋণ দেয়া মানে হলো- শৃঙ্খলার বাইরে কাজ করা হয়েছে।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1105 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com