নারীর জন্য আরেকটা আইন চালু করুন! ভীষণ জরুরি!

সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭ ৫:৩৯ অপরাহ্ণ

সুচিত্রা সরকার:

স্রোতের বিপরীতে লড়াই করতে করতে অনেক শিখেছি। কী করে সামলে রাখতে হয় সম্পত্তি! কোন উপায়ে আগলে রাখতে হয় স্বজন! কেমন করে ‘সংসার-যুদ্ধে’ জেতা যাবে! এসব যখন জীবনযাপনের মূল সুর, স্বজনরা তখন জেনেই গেছে, আমি ‘আয়রন লেডি’।

‘লোহা মানবী’র কাছে তারা পরামর্শ নিতে আসে। বিপদে আশ্রয় প্রার্থনা করে। সাধ্যমতো চেষ্টা করি।
আবার দুর্দিনে তারাই বলে (ঝগড়ার সময়, যখন যুক্তি উত্থাপন করি), ‘আস্তে কথা বলো। মেয়েদের অতো উত্তেজিত হতে নেই।’ এবং শুধু মেয়ে হবার কারণেই পুরুষের সমান অবদান রেখেও ‘পুরুষসম’ সম্মান পাই না। শুনতে হয় ‘আকথা- কুকথা’। নানারকম অশ্লীল ইঙ্গিত!

এসবে ভীষণ অসম্মানিত হই আমি! অপমানিত আর লজ্জিত! আমার ‘সেনসেশনের পারদ’ ধাই ধাই করে উপরে উঠে যায়। তখন অনুভব করি, একটা আইন দরকার। যেটা থাকলে, এই ‘অদেখা অসম্মান’ এর সুরাহা হতো!

বাজারে, দোকানে, হাসপাতালে- যেখানেই যাতায়াত মেয়েদের, পাশ থেকে নানারকম ‘বলা যায় না এমন কথা’ শুনতেই হয়। কান গরম হয়! অন্তর-মন অনেকক্ষণ জ্বলতে থাকে। হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়!

আর মনে মনে বলি, ইস! এখন যদি ৫৭ ধারার মতো একটা আইন থাকতো! এই ‘আবাল বৎস’টাকে দেখে নিতে পারতাম!

সেদিন আসবাব কিনতে দোকানে গেছি। সঙ্গে ‘অর্ধাঙ্গ’! দোকানদার ‘ছোকরা’ বয়সী। আমার কথা তেমন পাত্তা-টাত্তা দিচ্ছে না। এবং যথারীতি দেখলাম, বার্নিশ ও কাঠ, কথা অনুযায়ী দিল না। আমার রাগের পারদ উঠে গেল! অতঃপর ছোকরা বললো, ‘যান যান, মহিলাগো লগে কথা নাই।’ ‘অর্ধাঙ্গ’কে বললো, হের লগে কথা নাই, আপনের কথা শুনুম!’

তাহাকে বলিলাম, ‘ওহে ছোকরা, আসবাবটি মহিলার রক্তজল করা অর্থে ক্রয় করা হইতেছে। ওই অর্থ হইতে লাভটুকু কি তুমি ফেলিয়া দিবে? যেহেতু উহা মহিলার টাকা?’
ছোকরা ফিরতি জবাবে কহিল, ‘টেকা নিতাছি ব্যবসা কইর‌্যা!’ ‘মহিলাগো বেল নাই’- ইত্যাদি নানারকম টিজিং এর অবিরাম বর্ষণ।

আমার রাগের পারদ কোথায় উঠলো, আপনারা পাঠক, কতটুকু বুঝেছেন, জানি না। তবে সারা রাত অপমানে ঘুম হয়নি!

মনে হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখি। তাকে অনুরোধ করি, দেশের যতো উন্নয়ন করছেন, যতো কাজ করছেন মানুষের উন্নতির জন্য, সব এখনি বন্ধ করুন!

যে দেশে নারীকে মূল্যায়ন করা হয় ‘কীটসম’ আবর্জনার মতো, নারীকে শ্রদ্ধা করতে শেখেনি যে জাতি, তাদের আপাতত কোনো নাগরিক সুবিধার দরকার নেই। আগে নারীদের সঠিক মূল্যায়ন করতে শিখুক- তারপর সব হবে!
নাহলে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম একটা অশিক্ষিত জাতি গড়ে উঠবে, যারা মনেই করবে, নারীদের ‘না গুনলে’ কিছু যায় আসে না।’

চিঠিটা লেখা হয়নি। কারণ গ্রামের বাড়ি যাবার তাড়া ছিল!

অর্চনা মাসি মাকে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না! বরের বাড়িতে ছনের কুঁড়েঘর ছিল। মাসির বরের একার আয়ে সংসার চলছিল না। মাসি সেলাই মেশিন কিনলো একটা। তারপর সেই ‘মেশিনের শব্দ’ দিনরাত যতো বাড়তে লাগলো, মাসির সংসার স্বচ্ছলতায় ভরে উঠলো। ‘সংসার সচ্ছল হলো নারীর কল্যাণে’।

কিন্তু শাশুড়ি আর বর এটা মেনে নিতে পারে না। মানসিক নির্যাতন চলে চব্বিশ ঘণ্টা। সেটা কেউ দেখে না। আর শারীরিকটা সকলে দেখে তখনই, যখন মাসি সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে পালায়। মাসির বরের (পড়ুন বর্বর) সঙ্গে কথা বললে তার একটাই উত্তর, ‘সংসারের উন্নতি করছে তো কী হইছে, মাইয়্যাগো এতো ফাল (লাফ) পাড়লে চলে? সবাই কম-বেশি মাইর খায়, কেউ তো আপনের মাসির মতো কথা শোনায় না!’

আমার মতো মাসিরও হয়তো একটা পারদ যন্ত্র আছে। যেটায় অসম্মান ধরা পড়ে!

ঢাকা ফিরছি সন্ধ্যার গাড়িতে। আমাদের সিটের পাশে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিল। ইচ্ছে করেই তিনি আমাদের সিটের ওপর গড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছেন। মা বললেন, চাচা আপনি ‘ব্যালান্স’ রেখে দাঁড়ান!
হ্যাঁ, ঠিক এই বাক্যটাই মা ব্যবহার করেছে।
বুড়ো ভাম, ধমকে উঠলো মাকে। ‘ওই মহিলা, এমনে কথা কও কেন? তোমার গায়ে লাগছে নাকি! দেখছেন আপনেরা কতো বড় সাহস মহিলার!’ বলে অন্যদের ডাকলেন।
আমি বললাম, না লাগলে তো, আপনাকে বলার কথা নয়! কিন্তু আপনি ধমক দিচ্ছেন কেন?

আর যায় কোথায়। বাসের প্রত্যেকটা পুরুষ চিৎকার শুরু করলো। আমিও প্রতিবাদ শুরু করলাম। আমার কথা ওরা শুনছিল কিনা জানি না, ডানপাশের একজন বলছে শুনলাম, ‘এতো মোমের পুতুল হইলে প্লেনে চড়েন। বাসে উঠলে ডলা খাইতেই হইবো!’

পেছন থেকে আরো দুজন বলল, ‘মহিলা গো দেখতে তো বেয়াদবই লাগতাছে। নাইলে এতো চোপা ক্যান?’
সামনের সিটের একজনের কথা কানে এলো, ‘বিধর্মী দেইখ্যা এখনও তর্ক করতাছে। জাতের মাইয়্যা হইলে, মান- সম্মানের ভয় করতো!’

কোথা থেকে তার ‘তাগড়া যুবক’ পুত্র হাজির হলো। আমাদের সিটের সামনে দাঁড়িয়ে, শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে ফেললো (কল্পনায় ঠাটিয়ে একটা চড় কষালাম এই কারণে)! খুব ভয় পাবো ভেবেছে।
ভয় পেলাম না দেখে সকলে আরো উত্তেজিত হয়ে গেল।

সকলে চিৎকার শুরু করলো, মহিলাগোরে নামাও কন্ডাকটর! নাইলে তোমারে টাকা দিব না। গাড়ি থেমে গেল। জায়গাটা মেঘনার আশপাশে কোথাও হবে, অন্ধকারে জায়গাটা চেনা যাচ্ছিল না। কিন্তু নামার কোনো কারণ নেই, জেদ বজায় রেখে বসে রইলাম! পুত্রটি ঘোষণা করলো, সায়দাবাদ নেমে সে ‘ঘটনা ঘটায়া’ দেবে।

তারপর গাড়ির প্রত্যেকের টকশো (আমরা যাতে শুনতে পারি, এতোটা জোরেই বলছিল) শুনতে বাধ্য হলাম। কেউ বললো না, মেয়েদের ‘যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করাটা অন্যায়! সকল পুরুষ কী তবে, সকল পুরুষের মৌলিক দিকটা জানে?

‘বিপুল তরঙ্গ রে’ গানটা ইউটিউব থেকে যেই বাজানো শুরু করলাম, মা বললেন, থামা! মায়ের অমন অপমানিত মুখ অনেকদিন দেখিনি আমি!

‘তুমি বললে যাস নে খোকা ওরে, আমি বলি দেখো না চুপ করে/ ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে, ঢাল তলোয়ার ঝনঝনিয়ে বাজে।’

মায়ের ‘বীরপুরুষ’ কন্যা তক্ষুণি একজন ক্রাইম রিপোর্টার ও যাত্রাবাড়ি থানার ওসিকে স্ট্যান্ডবাই রাখলো। কিছু লোককে অ্যারেস্ট করা দরকার! তারপর যা হবার, তাই হলো। সেই ‘অধরা সম্মান’ হারাবার ভয়ে, অহেতুক হুজ্জতের আশংকায় আমরা পিছিয়ে এলাম।

কিন্তু এই যে, মায়ের অসম্মান হলো, আমারও, এর দাম কে দেবে? পথে-ঘাটে, হাটে- বাজারে, পরিবারে নারী ‘মূল্যহীন’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একটা ব্যাপার ঘটছে সমাজে। নিভৃতে! নীরবে! দমে যাচ্ছে নারীর এগিয়ে যাবার বাসনা। তাদের লড়াইটাও মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। বেগম রোকেয়ার ‘চার চাকার গাড়িটা’ও তাতে করে থেমেই আছে।

কিন্তু কাঁহাতক সহ্য করা যায়? একটা তো সমাধান দরকার। সকলের দিক থেকেই। আসুন আমরা একটা আইন করার প্রস্তাব দেই। নারীর জন্য এবার আরেকটা আইন চালু করুন! ভীষণ জরুরী!

এমন একটা আইন, যেখানে নারী অসম্মানিত হলেই (সকল ধরনের অসম্মান, তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য), অপমানিত হলেই, আইনটির পারদ উপরে উঠে যাবে!
পুলিশের কাছে খবর পৌঁছে যাবে,- অমুক এলাকার তমুক নারী ‘তুচ্ছ’ বলে গণ্য হয়েছে। তাকে অপমান করা হয়েছে। শুধু নারী বলে তাকে অসম্মান করা হয়েছে!

সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ফোর্স ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য থাকবে!

(পাঠকের কল্পনার সুতোটি একই ছন্দে আকাশে ভাসালে, মন্দ হয় না!)

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1083 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com