নারীবাদের কোনও বিকল্প নেই

জুলাই ১৯, ২০১৭ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ

একটা প্রশ্ন প্রায়ই করা হয়, ‘নারীবাদ কী?’ অনেকে বলেন, এ নিয়ে অনেক পড়াশোনা না করলে নারীবাদ বোঝা যাবে না। তসলিমা নাসরিনের একটা লেখায় তিনি বলেছেন, তিনি কোনও বই পড়ে নারী অধিকারের বিষয়টা বোঝেননি বরং নিজের চারপাশের বৈষম্য দেখেই প্রথম বুঝেছিলেন সমাজে নারীর সমঅধিকার নেই এবং এটা আদায় করে নিতে হবে।
নারীবাদের সহজ অর্থ হচ্ছে ‘জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি’ বা উভয় লিঙ্গের সম-অধিকারের বিশ্বাস যা বিন্দুমাত্র যুক্তি-বোধ থাকলে মেনে না নিয়ে উপায় নেই। ধর্মীয় বিশ্বাস বা প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির প্রতি অবিচলিত এবং অন্ধ আস্থা অনেক মানুষকে এই ধারণার বিপরীতে চালিত করে, তারা কোনও কথাই শুনতে বা মানতে রাজী নন। ‘নারীবাদ কী?’ প্রশ্নটা তারাই বেশি করেন কিন্তু উত্তরটা কান পেতে শোনার বা বোঝার ধৈর্য্য বা ইচ্ছা কোনোটাই তাদের নেই। এরাই নারীবাদের ধারণাকে নেতিবাচক আলোকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন নানান রকম অযৌক্তিক বিষয় এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কথা টেনে এনে। যেমন, ‘তাহলে কি পুরুষদেরকেও গর্ভে সন্তান ধারণ করে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে?’ এগুলো নিতান্তই অজ্ঞতা, যদিও শিক্ষিত লোকজনকেও এসব কথা বলতে শোনা যায়। আমরা যখন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কথা বলি তখন নিশ্চয়ই দাবি করি না যে কালো লোকদেরকে ব্লিচ করে ‘সাদা’ বানিয়ে ফেলতে হবে?
নারী-পুরুষের প্রাকৃতিক ভিন্নতা নারীবাদের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, বরং সামাজিক ও ধর্মীয় ভাবে আরোপিত বৈষম্যগুলো দূর করাই নারীবাদের লক্ষ্য। আর এই বৈষম্য দূর করার অর্থও এই নয় যে নারীদেরকে উশৃঙ্খল হতে হবে, সমাজ অথবা পরিবার বিমুখ হতে হবে, কিংবা পুরুষ বিদ্বেষী হতে হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবে পুরুষের কথা চলে আসে কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর নির্যাতক পুরুষই কিন্তু তাই বলে নারীবাদ মানেই পুরুষ বিদ্বেষ নয়, বরং নারী-পুরুষের সহাবস্থানের দাবি।

নারীবাদ একটি জীবন দর্শন, একটি ভাবনা, একটি বিশ্বাস যার একটা সুনির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। যারা নিজেদের নারীবাদী বলে দাবি করেন তারা সকলেই যে এই বিশ্বাস ও দর্শনকে একই ভাবে দেখেন, বোঝেন বা ধারণ করেন তা কিন্তু নয়। কিছু নারীবাদী হয়ত পুরুষকে ঘৃণা করতে পারেন, কেউ আবার নারী নির্যাতনের বিপরীতে পুরুষ নির্যাতনেও বিশ্বাস করতে পারেন। তারাই নারীবাদ বা নারীবাদীর আদর্শ নন।

নিজের চারপাশের স্বঘোষিত নারীবাদীদের দেখে নারীবাদ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা উচিৎ নয়। আমি অসংখ্য নারী দেখেছি যারা নারীর সম অধিকারের বিষয়টাই বোঝেন না যার ফলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন। মজার ব্যাপার হলো আমার বন্ধুদের মধ্যে নারীবাদী নারীর চেয়ে নারীবাদী পুরুষের সংখ্যাই বেশি যাদের এ সম্পর্কের স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। তাদের চিন্তাভাবনায় যুক্তি কাজ করে বলেই নারী-পুরুষের মধ্যেকার আরোপিত বৈষম্যগুলোকে তাদের কাছে অবশ্য পরিত্যাজ্য বলে মনে হয়।

আমি নিঃসন্দেহে একজন নারীবাদী কারণ আমার দৃষ্টিতে নারীবাদ মানবতাবাদেরই একটি অংশ। আমি বিশ্বাস করি সব বিষয়ে সব মানুষের সমান অধিকার থাকা উচিৎ। সেই হিসেবে সাদা/কালো, ধনী/গরিব, সমকামী/হেটারোসেক্সচুয়াল, নারী/পুরুষ সকল মানুষের মধ্যকার প্রাকৃতিক ভিন্নতাগুলোকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে এবং এইসব ভিন্নতার ভিত্তিতে নতুন কোনও ভিন্নতা আরোপ করা যাবে না।
শুধু নারীবাদে বিশ্বাস করি বলেই আমার স্বামীকেও হিসেব করে আমার মতো রান্নাবাড়া করতেই হবে তা মনে করি না। আমার রান্নার হাত তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো তাই রান্নাটা আমিই করি যদিও এ নিয়ে তার যথেষ্ট মনোকষ্ট আছে। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘তুমি তো আমার রান্না খেতে পারো না।’ কাপড় ইস্ত্রি করা আমার ভীষণ অপছন্দের একটা কাজ, আমার কাপড়গুলো আমার স্বামীই নিয়মিত ইস্ত্রি করে দেন। এতে করে আমরা কেউ কারো কাছে ছোট হয়ে যাই না।

আমি প্রচণ্ড সংসারী একজন মানুষ, পরিবারের সদস্যদের ভালোমন্দটা আমি সবকিছুর আগে দেখি। কিন্তু তাই বলে আমার বাইরে যাওয়ার অধিকার, কাজ করার অধিকার, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারে কেউ হস্তক্ষেপ করবে, সে যেই হোক না কেন, তাও কখনোই মেনে নেই না। আমাদের পরিবারে অধিকারের বিষয়টি লিঙ্গ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। দু’জনে মিলে সংসার করি। সংসারের সব কাজকর্ম ভাগাভাগি করে নেই, যে কাজে যার যোগ্যতা বেশি সে সেই দায়িত্বটাই নেই। কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি না, কেউ কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করি না। আমার দৃষ্টিতে এটাই নারীবাদ। পরিবারে বা সমাজে নারীপুরুষের এই সমতা খুবই প্রশান্তির বিষয়, সুখী জীবনের জন্য এর কোনও বিকল্প নেই।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1138 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com