জেলখানা থেকে মা’র চিঠি পর্ব : ২

ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৮ ৭:২৮ অপরাহ্ণ

:: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
রোজঃ শুক্রবার
সময়ঃ রাত ৯টা ২০মিঃ
স্থানঃ বকশীবাজার, পরিত্যাক্ত কেন্দ্রীয় কারাগর
ঢাকা, বাংলাদেশ।

আমার আদরের সন্তানেরা
প্রায় দুই শত বছরের পুরাতন জরাজীর্ণ পরিত্যাক্ত জেলখানার ময়লা গুমোট একটি ভবনে আজ ৯ দিন তোমাদের মা বন্দী। তোমাদের বৃদ্ধা এই মা প্রতিদিন আশায় থাকেন আগামীকাল হয়তো আমি আমার সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে পারবো। আমি আমার দুচোখ ভরে ঐ সন্তানদেরকে দেখবো, যারা ম্যাডাম থেকে আমাকে মা’র আসনে বসিয়েছে, মায়ের মত ভালোবাসে, মায়ের জন্য লড়াই করে। আমি দু হাত বাড়িয়ে ঐ সন্তানদের আদর করবো যারা মায়ের জন্য কাঁদছে, কষ্ট পাচ্ছে, অস্থির হয়ে আছে। আমি জানি, মা বিহীন সন্তান ভালো থাকে না, ভালো থাকতে পারে না। আমিও কাঁদছি প্রতি নিয়ত তোমাদের জন্য। তোমাদের কথা মনে হতেই ঝাপসা হয়ে আসে আমার দু চোখ। মনের চোখে তোমাদেরকে দেখতে পাই, তোমাদের সাথে কথা বলি।
আমার সন্তানেরা
প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর অবিচারে নির্জন নিঝুম এক ভৌতিক পরিবেশে বন্দী করে রাখা হয়েছে তোমাদের মা’কে। কোথাও কোন মানুষ নেই, শুন-শান চারিদিক। জনমানব শুন্য এতো বড় কারাগারে একমাত্র বন্দী আমি। আমাকে রাখা হয়েছে নারী সেলের দোতালার ডে কেয়ার কক্ষে। হাসপাতালের ওয়ার্ডের মত বিশাল এই রুমটি অপরিস্কার নোংরা। সব কটি দরজা-জানালা বিশেষ ভাবে বন্ধ করার কারনে উৎকট ভ্যাপসা গুমট কূট গন্ধ পুরা ঘরে। চারদিক বন্ধ থাকার কারনে ঘরের ভেতরে বেশ গরম। নেই কোন ফ্যান। একটি এসি আছে যা নষ্ট। বলেছে, উপরের নির্দেশ না পেলে মেরামত করা যাবে না। ভয়াবহ মশার উপদ্রব, নিয়ন্ত্রনের কোন উপায় নেই। দু চোখে ঘুম নেই বললেই চলে। লাল ইটের পরিত্যক্ত ভবনের দেয়ালের খসে পড়া চুনশুড়কি যেন আমাকে পরিহাস করছে। মনে করিয়ে দিচ্ছে – ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ধানমণ্ডির সুধা সদনের বাসা থেকে যখন শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো তখন তার মুক্তি দাবি করে আমি বিবৃতি দিয়ে বলেছিলাম “শেখ হাসিনাকে মুক্ত রেখে আইন পরিচালনা করা হলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ, সামাজিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক হানাহানির আশঙ্কা কমে আসবে”। আমি আরো বলেছিলাম- “শেখ হাসিনা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতার কন্যা এবং দেশের সম্মানিত নাগরিক। তাকে গ্রেফতার করায় বিবেকবান নাগরিকেরা আহত হয়েছেন। এর ফলে দেশে বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে”।
অথচ আজ শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভাবে আমাকে এবং আমার দলের নেতা-কর্মীকে বিপর্যস্ত করার জন্য, কোণঠাসা করার জন্য এই অন্যায় অবিচার আর ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্র চলছে জিয়া পরিবারকে ধংসের জন্য। ষড়যন্ত্র চলছে বিবেকবান দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তি শুন্য নব্য বাংলাদেশের। এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে বুঝে না বুঝে আবার কেউ কেউ বিবেক বন্ধক রেখে পা দিয়েছেন। একজন বিচারক বিচার করে থাকেন আইন ও বিবেক দিয়ে। একমাত্র মহান রাব্বুল আলামীন বলতে পারবেন আমার বিচারের ক্ষেত্রে আইন,বিবেক,ন্যায়-নিষ্ঠা, সত্য-মিথ্যা, প্রতিহিংসা -জিঘাংসার মধ্যে কোনটার প্রতিফলন ঘটেছে। সেই সাথে বলতে পারবেন স্বয়ং বিচারক নিজে। যিনি নিজেও একদিন মহা পরাক্রমশীল ন্যায় বিচারকের সামনে আসামী হয়ে দাড়াবেন।
আমার প্রিয় সন্তানেরা
মনে পড়ে, রায় ঘোষণার আগের দিন সংবাদ সম্মেলন করে দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্পষ্ট ভাষায় আমি বলেছিলাম, “ আপনাদের খালেদা জিয়া কোন অন্যায় করেনি। কোন দুর্নীতি করেনি”। আজ গোটা বাংলাদেশ এ কথা বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের মানুষ সহ বিশ্ব দেখছে ওদের অন্যায় অবিচার আর প্রতিহিংসার বিষাক্ততা। আর তাই গ্রেফতার জুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে মানুষ পাশে এসে দাড়িয়েছে। জানতে পেরেছি ওরা তোমাদের ওপর জবরদস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্তিপুর্ন কোন কর্মসুচী করতে দিচ্ছে না। মানব বন্ধন থেকে অনশন সব কিছুতে ওরা ভীত হয়ে পড়ছে। গায়ের জোরে যা খুশী তাই করতে চাইছে। কিন্তু ওরা ভুলে গেছে , জবরদস্তি চলে পশুর সাথে মানুষের সাথে নয়। ওরা ভুলেগেছে জোর খাটানে যায় অবুঝ বোবা জানোয়ারের ওপর বিবেকবান মানুষের ওপর নয়। ক্ষমতার দম্ভে ওরা ভুলে গেছে, বাংলাদেশের মানুষ জন্তু জানোয়ার নয়, নয় কোন কীট পতঙ্গ। মহান আল্লাহতালা মানুষকে বানিয়েছেন সৃষ্টির সেরা হিসাবে। সেই বিবেকবান মানুষ যদি একবার রুখে দাঁড়ায় পৃথিবীর কোন স্বৈরশাসকের ক্ষমতা নেই তা রুখবার। মানুষ যদি একবার ক্ষেপে যায় তার পরিনিতি হয় ভয়াবহ। রাজনীতি মানুষের জন্য, রাজনীতি দেশের জন্য, উন্নয়নের জন্য। দোয়াকরি মহান সৃষ্টি কর্তা যেন ওদেরকে শুভ বুদ্ধি দেন।
আমার আদরের সন্তানেরা
অনেক কথা বলতে চাই তোমাদের কিন্তু কেন জানি খুব ক্লান্ত লাগছে। পায়ের ব্যথা বেড়েছে। হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। খাবারে রুচি নেই বললেই চলে। আমার সাথে কাওকে দেখা করতে দিচ্ছে না। আমার ওপর মানসিক চাপ বাড়ানোর জন্য এক অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে। মানা হচ্ছে না নুন্যতম আইন কানুন বা জেল কোড। এমনকি আমার ডাক্তাররা এসেছিলো আমার শারীরিক অবস্থা দেখতে। সারাদিন জেলগেটে বসে থেকে অনুমতি না পেয়ে ফিরে গেছে। আমি জানি তোমাদের এই ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তোমরা খুব চিন্তায় আছো। দেশে-বিদেশে আন্দোলন করছো। রহমানের রাহীমের কাছে মা’য়ের জন্য যে ভাবে পারছো দোয়া করছো, কাঁদছ, রোজা রাখছো। আল্লহর কাছে দোয়া করো, তিনি যেন তোমাদের এই মাকে সুস্থ রাখেন, মানসিক শক্তি আরো দৃঢ় করে দেন, দ্রুতই তোমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনেন। রাব্বুল আলামীন যেন আমাকে অতীতের মত ন্যায় নিষ্ঠা এবং সততার সাথে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকবার শক্তি দেন।
আমি তোমাদের মাঝে ফিরে আসতে চাই। আমি জানি আমার সন্তানেরা আমারই মত মাঠের লড়াকু সৈনিক। তারা আমারই মত আপোষহীন, তাদের শীর উন্নত। তারা তাদের মা’কে মুক্ত করে আনবে ইনশাআল্লাহ্। কিন্তু তার জন্য দরকার কঠিন ঐক্য। একমাত্র তোমাদের ঐক্যই পারে আমাকে তোমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনতে। আমাদের সকলের ঐক্যই পারে বাংলাদেশ নামক বর্তমানের এই বৃহৎ বন্দী দশা থেকে সকলকে মুক্ত করতে। তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে দোষারোপ করো না। একে অপরের দোষ খুজতে যেও না। মনে রেখ সবার শক্তি সামর্থ সমান হয় না। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর সহ মর্মিতার হাত বাড়িয়ে দাও। যে দুর্বল তাকে অবহেলা না করে, কটুক্তি না করে শক্তি যোগাও। পরিবারের সবার শক্তি, সামর্থ, বুদ্ধি, যোগ্যতা সমান থাকে না। কিন্তু তাই বলে এক ভাই আপর দুর্বল ভাই বা বোনের হাত ছেড়ে দিও না। মনে রেখো, মায়ের চোখে তার সব সন্তান সমান। আমি আমার সব সন্তানকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি, ভালোবাসি আমার দেশবাসীকে। দোয়াকরি দুখী এই বাংলাদেশে আমার সন্তানেরা সহ সকলের সন্তান শুখে থাকুক। ভালো থাকুক।

ইতি
তোমাদের বন্দী মা।

(চার পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার আলোকে কল্পনা প্রসূত লেখা। এর দায় দায়িত্ব সম্পুর্ন লেখকের। এ লেখা তাদের জন্য যাদের হৃদয়ে রয়েছে বন্দিনী মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। এ লেখা তাদের জন্য নয় যারা মতলব বাজ ও এক চোখা – আশিক ইসলাম)
————————-

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1205 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com