জীবনের সৌরভ

জুলাই ২৫, ২০১৭ ৫:৩৯ অপরাহ্ণ

:: রহমান সাহেবের মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। খুব ভালো ছাত্রী। বরাবর ক্লাসে এক থেকে তিনের মধ্যে থাকে। মেয়েটা খুব লক্ষী, ঘরের সব কাজে মা কে সাহায্য করে। সমস্যা শুধু একটাই, প্রচন্ড রাগ মেয়ে টার। রহমান সাহেব বা তার স্ত্রী র কেউ ই রাগী মানুষ না। দুই জন ই দীঘির জলের মতো, শীতল। রহমান সাহেব কখনোই তেমন রাগ করেন না। কেনো ই বা রাগ করবেন! সে জীবন যুদ্ধে পরাজিত একজন সৈনিক। এ ধরনের লোকের রাগ করা অন্যায়। কি আছে তার? কিছুই নেই, মজার ব্যাপার হলো, এই যুগে সবার বাসায় একটা বাহারি এল.ই.ডি টিভি থাকে। তার বাসায় আছে একটা ১৭ ইঞ্চি কনকা টিভি। মাঝে মাঝে বেহায়ার মতো টিভি টা আউট অফ অর্ডার হয়ে যায়। বেহায়া বলার কারন হলো টিভি টা মেহমান দের সামনেই এই ব্যাপারটা ঘটায়। বাড়ির বাকি দুই সদস্য লজ্জায় অন্য রুমে পালিয়ে বাঁচে। রহমান সাহেব মেহমান দের সামনেই বিড়বিড় করে বলেন ‘কি যে হলো! সকালেও ঠিক ছিলো! মনে হয় ডিশ লাইনে প্রবলেম!’ তিনি অদৃশ্য সমস্যা টা খুঁজে পাওয়ার জন্য সম্ভবত কায়মনে প্রার্থনা করেন। মাঝে মাঝে কিছু দয়াবান মেহমান উনাকে বাচিয়ে দেন, “থাক থাক, ব্যাস্ত হবেন না”-এই বলে, কিন্তু কিছুকিছু নির্মম মানুষ ও যে নেই পৃথিবীতে, কিভাবে বলা যায়! কেউকেউ ক্রুর হাসি দিয়ে রহমান সাহেবের কর্মকান্ড দেখেন, কেউকেউ বলেন “এটা ডিশ রিলেটেড সমস্যা না”। নিজের অসামর্থ ঢাকার সব প্রয়াস যখন ব্যার্থ হয়, রহমান সাহেবের বউ বিধাতার পাঠানো দূতের মতো মেহমান দের ডাক দেয়, “খাবার দিয়েছি, খেতে আসেন”।
একটা বেড রুম। একটা বসার রুম, পাশে ছোট্ট খাবার রুম, রান্নাঘর, বাথরুম, একচিলতে বারান্দা। এটা একটা ৬৫০ স্কোয়্যার ফিটের বাসা। রহমান সাহেবের সংসার। ওরা তিন জন। মেয়ে রাবেয়া, বউ আর উনি। আরো একজন সদস্য ছিলো। যে বিড়াল নিয়ে খেলতে খুব বেশি ভালোবাসতো, সারা বাড়ি হৈ হৈ করে বেড়াতো। সারাটা দিন মেয়ে টা কে চোখে চোখে রাখতে হতো। প্রচন্ড দুষ্ট একটা মেয়ে। বাড়ি এসে রহমান সাহেবের প্রথম কাজ ছিলো মেয়েটা কে বলা “আমার পাটালি গুড়, আমার সন্দেশ, আমার মিঠাই বরফি – কইরে?” মেয়ে টা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরতো। “বাবা, আমার জন্য কি এনেছো, তিন টাই এনেছো?” উনি লজ্জা পেতেন, হাতে থাকা সদাই এর চিনি টা মেয়ের হাতে দিয়ে বলতো,”এই যে, নাও, এটা আর পাটালি গুড় একই জিনিস” মেয়ের তাতেই কী খুশি! সারা টা দিন পাঁচ বছুরে মেয়ে টা বাসা টা মাতিয়ে রাখতো। বড়ো মেয়ে টা ছোট থেকেই চুপচাপ, আর খুব আল্লাদী, যা চাই দিয়েই হবে। ঈদে ছোট মেয়ে কে দুই টা গোলাপী ক্লিপ কিনে দিলো, কি খুশি! আর বড়ো টার মুখ ভার! “আমি এবার ঈদ করবো না! পুরানো জামা পড়ে কেউ ঈদ করে!” – রহমান সাহেব বউ কে বল্লো “মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে রাবুর মা! মেয়ে একটা জামা চায়, আমি দিতে পারি না, কি লজ্জা, কি লজ্জা!” রহমান সাহেব কেঁদে ফেলে। পাঁচ বছুরে ছোট্ট মিনি রহমান সাহেবের কাছে এসে বলে, বাবার চোখে পানি কেনো, কে মেরেছে বাবা কে?” রাবেয়ার মা হেসে বলে “বাবার চোখে ব্যাথা রে মা” মিনি বাবার কোলে উঠে বাবার চোখে ফু দিচ্ছে। “বাবা! বাবা! ব্যাথা কমে যাবে, ফু দিয়েছি”। রহমান সাহেব মেয়ে কে জড়িয়ে ধরলেন, এতো নরম কেনো তার পাটালি গুড় টা!

তিন বছর আগে পাটালি গুড়টা সবাই কে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। পাকস্থলী তে ইনফেকশন। এই ছোট্ট মেয়ের তীব্র যন্ত্রণা রহমান সাহেবের সহ্য হতো না। চিকিৎসা হয়েছিলো, লাভ হয়নি। মেয়ে টা ব্যাথায় গোঙ্গাতো আর বলতো “বাবা! আমাকে ভালো করে দাও, আমার ব্যাথা ভালো করে দাও”। রহমান সাহেবের বউ মেয়ে কে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলতেন “আমার মেয়ে কে ভালো করে দাও, তুমি কেমন বাবা! আমার মেয়ে টা কষ্ট পাচ্ছে, দেখছো না!”
রহমান সাহেব চেষ্টা করেছে অনেক, জীবনের শেষ সম্বল একটা আড়াই কাঠা জমি বন্ধক রেখে পানির মতো টাকা খরচ করেছে, আল্লাহর কাছে সারা দিন রাত বলতো, আমার মেয়ে টা কে নিও না, আমাকে নাও, আমার তো আর প্রয়োজন নাই, আমার মেয়ে পৃথিবী টা দেখে নাই, ওকে দেখতে দাও” – নাহ! মাঝে মাঝে বিধাতা নিষ্ঠুর আচরন করে, ভালো মানুষ কে কষ্ট দেয়। অনেক বেশী কষ্ট দেয়। কেন দেয়, মাঝে মাঝে খুব জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করে পাড়ার ইমাম সাহেব কে। উনি নিশ্চই বলবেন, আপনি সাচ্চা ইনসান, আল্লাহ সাচ্চা দিলের লোক দের পরীক্ষা করে। তার মেয়ে তিলে তিলে মারা যাচ্ছে, এ কেমন পরীক্ষা! তবুও রহমান সাহেব মসজিদে কান্নাকাটি করছে। কি ই বা করবে, তার তো আর আল্লাহ ছাড়া কেউ নাই। মিনি মারা যাবার আগে শক্ত করে বাবা মা কে জড়িয়ে রেখেছিলো। আর বাবা কে বড় বড় চোখ করে বলেছিলো “বাবা! আমার না ব্যাথা হচ্ছে না, তুমি কেদোনা, আমার একটুও ভয় লাগছে না, আমার কিচ্ছু হবে না, তাই না বাবা?” এর পর মিনি মারা যায়।

রহমান সাহেবের বাড়ি থেকে হাসি ব্যাপার টা উঠে গেলো। তার বউ টা কেমন অপ্রকৃতস্থের মতো হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে জীবন যুদ্ধের দাবানলে সয়ে গেলো সেই অসহ্য কষ্ট। রহমান সাহেব অফিস যাচ্ছেন, আসছেন, পেপার পড়ছেন, রাবেয়ার পড়াটা দেখিয়ে একটু রেডিও শুনেছেন, ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পরছেন। অসহ্য নিরানন্দময় এক রুটিন। রাবেয়া একে একে নাইনে উঠে গেলো। এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। স্কুলের প্রধানশিক্ষক রহমান সাহেব কে বলেছে, “ভাই রে, একটা রত্ন জন্ম দিয়েছেন, আমার এমন একটা মেয়ে থাকলে জীবন ধন্য হয়ে যেতো” রহমান সাহেবের খুশী হবার কথা, কিন্তু মনের ভেতর কাজ করছে দুশ্চিন্তা – মাসের শেষ, মেয়ে টা কে তো সুন্দর কিছু দেয়া দরকার, পকেট পুরা খালি। রহমান সাহেব তার পরের মাসের টিফিনের টাকাটা অফিসে জমা না দিয়ে মেয়ের জন্য চমৎকার একটা হাত ঘড়ি কিনলো। দুপুরে এক মাস টিফিন না খেলে কিছুই হবে না তার। দুপুরে একটা টোষ্ট আর চা ই তার জন্য অনেক ভারী খাবার।

ঘড়ি পেয়ে মেয়ের সেই কি খুশি! আনন্দে ঝলমল করছে। ওর চেহারা টা ওর মায়ের মতো হয়েছে, ভারী মিষ্টি, শ্যামলা, কাজল টানা চোখ। তার ছোট মেয়ে টা ছিলো তার মতো। বাবার মতো দেখতে হওয়া মেয়ে রা ভাগ্যবতী হয়- মাঝে মাঝে মনে হয়, এ কেমন ভাগ্য পেলো তার মেয়ে, যার ভাগ্যের খাতায় কিছু লিখাই হলো না!

রাবেয়া ঘড়ি পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন রকম করে হাত টা দেখছে। কি আনন্দ! রহমান সাহেব রাবেয়া কে ডাক দিলেন, “রাবু মা খুব খুশি আজ?” রাবেয়া বাবা কে অভিমান করে বল্লো “আচ্ছা বাবা! আমার নাম রাবেয়া কেনো রেখেছো? কেমন সেকেলে নাম! আমার বান্ধবী দের নাম কতো সুন্দর সুন্দর – ইন্দ্রানী, সেঁজুতি, লোপা – আমার নাম নিয়ে ওরা অনেক মজা করে” রাবেয়ার মুখ টা ভার হয়ে গেলো। রহমান সাহেব রাবেয়া কে আদর করে বললেন “মা রে, এটা তো অনেক সুন্দর নাম। আর নামে কি আসে যায়! আমার মেয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে, ওই মেয়েদের কেউ তো পায় নাই। তুই তো আমার সোনা লক্ষী রাবু মা!’ রহমান সাহেব হো হো করে হাসলেন। রাবেয়ার মা আচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলেন, কি হলো, হাসো কেনো?” রহমান সাহেব হাসতে হাসতে বললেন “পাগল হয়ে গেছি রাবুর মা! তুমি ও হাসো” রাবেয়ার মা হঠাৎ হেসে ফেল্লো। রাবেয়া কে জড়িয়ে ধরে হাসছে। সে হাসি সংক্রমিত হলো রাবেয়ার মধ্যে। রহমান সাহেব মিনির ছবি র দিকে তাকালেন, এই পরিবার থেকে কষ্টের মেঘ টা কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

আগামী মাসে কোরবানীর ঈদ। রহমান সাহেব দীর্ঘ দিন যাবৎ দুই ভাগা কোরবানী দিয়ে আসছেন। তার অল্প কিছু বোনাসের টাকা দিয়ে দুই ভাগার বেশী হয় না। সমস্যা হলো, বেশ কিছু বছর হলো আশেপাশের সবাই টাকা-পয়সা ওয়ালা হয়ে যাচ্ছে। সবাই আলাদা আলাদা গরু কুরবানী দিচ্ছে। ভাগার জন্য কাউ কে পাওয়া যাচ্ছে না। সে জন্য গত দুই বছর ধরে রহমান সাহেবের কুরবানী দেয়া বন্ধ। সবার হাতে এতো টাকা পয়সা! রহমান সাহেবের হয় না। উনি পারেন না। ওই ভাবে কামাই করার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো রহমান সাহেবের কাছে। নীতি বিক্রি করে পয়সা রোজগার করে ওই টাকা দিয়ে লোক জন কিভাবে গর্ব করতে পারে? কিভাবে ফুর্তি করে? কিভাবে কুরবানীর মতো পবিত্র দায়িত্ব পালন করে? উনার মাথায় ঢুকে না। যারা দেহ বিক্রি করে সংসার চালায়, তাদের আমরা ঘৃণা করি আর এই সব লোক দের পায়ের নিচে পড়তেও আমাদের লজ্জা করে না। কিভাবে সম্ভব!

রাবেয়া এবার গোঁ ধরেছে- একটা গরু কুরবানী দিতে হবে। আশে পাশের সবাই অন্তত একটা করে গরু কুরবানী দিচ্ছে। রাস্তার ওই পাশের সোলায়মন সাহেব দিচ্ছে তিন টা গরু। রাবেয়া বাবা কে বল্লো, – “আমি কিছু টাকা জমিয়েছি, পাঁচ হাজারের মতো, পনেরো/বিশ হাজারের মতো দাম দিয়ে হলেও একটা গরু কেনো। আমার খুব ইচ্ছা, আমাদের গরু কে আমরা নিজেরা কুরবানী দিবো। আমার খুব কষ্ট হয়। লজ্জা লাগে। সবাই কতো হই চই করে, আমার বান্ধবী রা বলে, এই-সেই কতো কিছু, আমি চুপ করে থাকি। ওরা হাসে, আমার এক বান্ধবী আমাকে মুরগী কুরবানী দিতে বলেছে।” অভিমানে রাবুর চোখে পানি চলে এলো। রহমান সাহেব বার বার শুধু লজ্জায় পড়ছেন। কোনো ভাবেই কেনো তার অবস্থা ঠিক হয় না? উনি স্থির বসে রইলেন বারান্দা তে। রাবুর মা এলেন, “তুমি আমার একটা সোনার চুড়ি ভেঙ্গে একটা গরু কিনো, মেয়ে টার শখ। আমি চুড়ি পড়ে কি করবো! আছে তো আরো তিন টা”। শূন্য দৃষ্টি তে তাকিয়ে রইলেন রহমান সাহেব। বহু দিন ধরে পয়সা জমিয়ে বউ কে চারটা চুড়ি কিনে দিয়েছিলেন, বিয়ের পর বউ কে তো কিছুই দেন নাই এই ক’গাছা চুড়ি ছাড়া। আজ সেটা তে ও হাত দিতে হবে!

সকালে অফিস এসে দেখে সবার মধ্যে কানাঘুসা চলছে। এম,ডি সাহেব একজন বেষ্ট এমপ্লয়ী কে স্পেশাল বোনাস দেবেন এই ঈদের আগে। রহমান সাহেবের নাম প্রথমেই আছে। কুড়ি হাজার টাকা! সবাই রহমান সাহেবকে অগ্রিম অভিবাদন জানাচ্ছেন। উনি শুধু কোরবানীর গরুর কথাই ভাবছেন। সাত দিন পর ঈদ, এখনো কূল করতে পারেন নাই টাকার। আজ বিধাতার কৃপায় মনে হচ্ছে হয়েই গেলো। বিকালে রহমান সাহেবের লাইন ম্যানেজার তলব করলেন। উনি নিরানন্দময় গলায় বললেন “রহমান সাহেব, সরি! রফিক সাহেব এম,ডির খুব কাছের লোক। উনি আপনার পেছনে থেকেও টাকা টা পেয়ে যাচ্ছেন। এর পরের বার আমি আপনাকে স্পেশালি রেকমেন্ড করবো, নো ওরিজ!” রহমান সাহেব একটু হেসে চলে এলেন নিজের টেবিলে। এমন একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কেনো পরলেন তিনি! দরকার ছিলো না তো!

অফিস বন্ধ। পরশু ঈদ। চারদিকে খুশির আমেজ। খুব আনন্দময় পরিবেশ। রহমান সাহেব বারান্দা তে বসে আছেন। বাড়ির আঙ্গিনা গুলো গরু ছাগলে ভরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তার একতলা বাড়ির আঙ্গিনার সামনে দুটো কুকুর গোল হয়ে শুয়ে আছে। এবার সোলায়মন সাহেব দুই টা হাতি সাইজের গরু কিনেছেন। এক এক টা আশি হাজার করে। নামাজ পরার সময় দেখা হলো। জোড় করে সবাই কে গরু দেখাতে নিয়ে গেলেন। রহমান সাহেব বললেন “মাশাল্লাহ সুন্দর গরু হয়েছে, ভালো মাংশ পাবেন”। জজ কোর্টের মুহুরী সোলায়মান সাহেব তৃপ্তির হাসি দিলেন।

রহমান সাহেব আর পারছেন না! কেনো উনি ই শুধু ঠকবেন। না! এবার যে করেই হোক মেয়ের কথা তাকে রাখতে হবে। তার মেয়ে টা প্রতি টা সময় তার মুখ উজ্জ্বল করেছে। পাড়ায় সবাই তাকে চেনে রাবেয়ার বাবা বলে। কি গর্ব! আর সেই মেয়ের ছোট্ট একটা আবদার সে পূরন করতে পারবে না? উনি তার আলমিরা খুলে একটা বাক্স বের করলেন। একটা ঝকঝকে সোনালী পার্কার পেন। লিমিটেড এডিশন। কলমের খাপ টা খাটি সোনার। নিব টা ও। চমৎকার একটা জিনিস। রহমান সাহেব বহু বছর আগে এটা উপহার পেয়েছিলেন। “শ্রেষ্ঠ নবীন কবি” পুরষ্কার। উনি একজন বড়ো মাপের কবি। অন্তত কবি শামসুর রাহমান তা-ই মনে করতেন। উনি কলম টা দিতে দিতে বলেছিলেন “তুমি ভালো লিখো, একদিন তুমিও এভাবে আরেক জনকে উপহার দেবে, তুমি ও বিশেষ অতিথি হবে কবি সম্মেলনের।” রহমান সাহেবের গর্বে শরীর টা হাল্কা হয়ে যাচ্ছিলো। উড়ে যাচ্ছেন না তো আবার! এর পর সব শেষ! এখন দুটো লাইন ও আসে না মাথা দিয়ে। তাহলে বেশীর ভাগ কবি ই তো দারিদ্র্যের নির্মম বাহুডোরে থেকে কবিতা লিখে গেছেন, উনি পারছেন না কেনো? হয় তো দারিদ্র্য নয়, তার ছোট মেয়ে। রহমান সাহেব যখন কবিতা লিখতেন, তার ছোট মেয়ে টা লক্ষীর মতো চুপটি করে বসে থাকতো। বড়ো মনে পড়ে মেয়ে টার কথা।

রহমান সাহেব যত্ন করে কলম টা মুছলেন। ছোটো মেয়ের চিকিৎসার সময় একবার বিক্রি করতে চেয়েছিলো। মেইন রোডের একটা দোকান বলেছিলো পনের হাজার টাকা। তখন জমি বন্ধকের টাকাটা চলে এসেছিলো বলে আর বিক্রি করা হয় নাই। উনি ঠিক করলেন আজ ই বিক্রি করবেন। পরিচিত দোকান। এটাই সমস্যা। জানাজানি হবে। কিছু করার নাই। উনি হাটতে বের হলেন, এই বলে দোকানে গেলেন। মালিক ছিলেন। অতি ভদ্রলোক। নিজের জন্য ই কলম টা কিনতে চাচ্ছেন। সৌখিন লোক। উনি কলম টা দেখে বিন্দু মাত্র দ্বিরুক্তি না করে বললেন “আমি কুড়ি দেবো। যদি বলেন, এখুনি টাকা টা দিয়ে দিচ্ছি”। উনি ব্যবসায়ী লোক। রহমান সাহেব রাজী হলেন। উনি আজ উনার কবিত্ব বিক্রি করে দিচ্ছেন। পকেটে কবিত্বের সন্মানী টুকু নিয়ে উনি বাড়ি ফিরলেন। মেয়ে টা বারান্দাতে দাঁড়িয়ে। নাইনে পড়া একটা মেয়ে, বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে রেখেছে। দেখলেই মায়া হয়। মাথা হাত রেখে রহমান সাহেব বললেন “মা, মন খারাপ কেনো, সবাই কোরবানী দেবে আর আমরা দেবো না -তাই কি হয়? কি রং এর গরু চাই তোর?” রাবেয়ার চোখ ঝলমল করে উঠলো। ও দৌড়ে চলে গেলো ভেতরে, তার মা কে ডাকতে। এখনো সে তার সব আনন্দের কথা তার মাকে আগে গিয়ে বলে। রাবেয়ার মা বারান্দা তে এলো, চিন্তিত মুখে বল্লো “টাকা কিভাবে যোগার হলো?” রহমান সাহেব হাসিমুখে বললেন “একটা স্পেশাল বোনাস পেলাম আজ, রাবেয়ার মা! চিন্তা করবা না, আল্লাহ সব কিছু যোগার করে দেন।”

রহমান সাহেব যাচ্ছেন পাড়ার পাশের গরুর হাটে। আজ উনি তার মা এর জন্য একটা কালো গরু কিনবেন। রাবেয়ার পছন্দ কালো গরু। ও নাম ও ঠিক করে রেখেছে, কাজলা। যেই প্রাণী টার আয়ু আর একটা দিন, তার জন্য কতো ভালোবাসা! হাটে গিয়ে উনি চমকে গেলেন, গরুর দাম পয়ত্রিশের নিচে নাই। এক ব্যাপারী তাকে রীতিমত অপমান করে দিলো “কুড়ি হাজার দিয়া খাসি লন, গরু পাইবেন না”। উনি দেখছেন, কতো লোক, স্বল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত- পঞ্চাশ, ষাট হাজার দিয়ে গরু কিনে নিচ্ছে। উনি ঘুরতে ঘুরতে একটা পকেট সাইজের গরু পেলেন। খারাপ না, গেরস্থের গরু। একটু রোগা, বিসন্ন চেহারা- রহমান সাহেবের পছন্দ হলো। দামাদামি করে বাইশ হাজারে ঠেকলো। ব্যাপারী লোক দিয়ে বাসায় পৌছে দেবে। রহমান সাহেবের আনন্দ আর ধরে না। নিজে কে কেমন যেনো বিজয়ী যোদ্ধার মতো লাগছে। উনি পথের মধ্যে গরুর খাবার কিনলেন, মালা কিনলেন। আর ঘটনা ঠিক তখন ই ঘটলো। দুই জন লোক ধাক্কা মেরে রাখাল কে ফেলে গরু নিয়ে দিলো টান। রহমান সাহেবের ঘটনা বুঝতে মিনিট খানেক লাগলো। এর মাঝে ভিড়ের মধ্যে কই চলে গেলো! উনি বসে পড়লেন। মানুষ জন ছুটে এলো ঠিক ই। কোনো সাহায্য করতে পারলো না। যে যার মতো চলে গেলো। রহমান সাহেব উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হঠাৎ মেঘ টা কালো করে বৃষ্টি শুরু হলো। উনি বৃষ্টির মধ্যে হেটে যাচ্ছেন। কই যাবেন? মেয়ে টা হয়ত বারান্দা তে দাঁড়িয়ে আছে, বাবা তার কাজলা কে নিয়ে আসছে। বুক টায় চিনচিনে ব্যাথা। উনি একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়লেন। পাড়ার একটু মাস্তান টাইপের একটা ছেলে রহমান সাহেবের পাশে এসে বসলো। “রহমান ভাই! কি হইসে? ঘটনা কি?” ছেলে টা কে উনি ঠিক চিনতে পারছেন না। তবুও উনি ঘটনা বললেন। উনার তীব্র সন্দেহ এই ছোকড়া গরু টা চুরির সাথে জড়িত আছে। ছোকড়ার নাম মনির। সে নাকি রহমান সাহেবকে খুব ভালো পায়। সে চেষ্টা করে দেখবে গরু টা কই গেসে। রহমান সাহেব একটা হাসি দিলেন। যার অর্থ – “আমাকেই কেনো? জালাল সাহেব কে কেনো না, সোলায়মান সাহেব কে কেনো না? আমি খুব কষ্টে আছি, আমাকে কেনো বাঁচতে দিতে চাও না তোমরা?”

রাবেয়া দাঁড়িয়ে আছে, সাথে তার মা। উদ্মিগ্ন চোখ-মুখ। অনেক রাত হয়েছে। মানুষ টা বিকেলে গেছে। এর উপর ঝুম বৃষ্টি। এখনো আসছে না কেনো! মা-মেয়ে দুই জন ই চিন্তিত। রহমান সাহেব রিকশা করে ফিরলেন। মাথা নিছু করে ফিরছেন। রাবেয়া বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাবার কাছে ছুটে গেলো। বাবা কে ঘরে নিয়ে এলো। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তার বাবা জ্বর বাধিয়ে ফেলেছে। ফ্যালফ্যাল করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে রহমান সাহেব। রাবেয়ার মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন “কি হয়েছে তোমার”। রহমান সাহেব রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন “মা রে, তোর কাজলা চলে গেছে, অনেক খুঁজলাম, পেলাম না রে মা! আমাকে মাফ করে দে”। তার বাবা কাঁদছে, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। রাবেয়া বাবার জ্বর তপ্ত গা টা জড়িয়ে ধরে বল্লো “আমার কাজলা লাগবে না, আমি আমার বাবা কে আর কষ্ট দেবো না। আমার বাবা মা কে নিয়ে আমি অনেক আনন্দ করে ঈদ করবো। আমার গরু লাগবে না।”

রাত বাড়ছে, বৃষ্টি ধরে এসেছে। বাইরে ঠান্ডা বাতাস। চারদিক থেকে গরু ছাগলের ডাক ভেসে আসছে। অসহ্য লাগছে রাবেয়ার। সে বাবার মাথার পাশে বসে আছে। রাবেয়ার মা জল পট্টি দিয়ে যাচ্ছে। আগামী কাল ঈদ। রাবেয়ার কান্না পাচ্ছে। সবাই এতো আনন্দ করে, তাদের প্রতি পদে পদে এতো কষ্ট কেনো। তার বাবা সারা জীবন মানুষ কে সাহায্য করে গেছে, কোনো দিন খারাপ ব্যবহার করে নি কারো সাথে, কেনো তার বাবার এতো কষ্ট! বাবা কেনো আর আগের মতো কবিতা লেখে না? কেনো সবাইকে কবিতা আবৃতি করে শোনায় না? রাবেয়া বাবার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নিচু গলায় বলে যাচ্ছে “বাবা, তুমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।“ তার কথা বাবা শুনতে পারছে না। আচ্ছন্নের মতো তার বাবা চোখ বুজে শুয়ে আছে।

হঠাৎ বারান্দা থেকে ভরাট একটা কন্ঠ ভেসে এলো। “রহমান ভাই! রহমান ভাই”
রাবেয়ার মা দড়জার কাছে গেলো। পাড়ার মাস্তান মনির। মনির খুব নাটকীয় ভাবে বল্লো “ভাবী, আপনাগো গরু তো বাইর কইরা ফালাইসি!” এমন ভাবে বলছে যেনো গরু টা ফ্যাক্টরী তে তৈরী হইসে। “আরে ভাবী দড়জা খুলেন! রহমান ভাই রে ডাকেন, আর চা বানান, চা খাই।“ মূহুর্তের মধ্যে বাড়ি টাতে কেমন হুলুস্থুল পড়ে গেলো। ঘোর বর্ষার রাতে মেঘ কেটে পূর্ণিমা এলো যেনো। রাবেয়া বাবা কে উঠিয়ে নিয়ে এলো। মনির বল্লো “রহমান ভাই! আপ্নে কইলেন গরু চুরি, আমি নগদায় লোক লাগায়া দিলাম। আমি তো মনে করেন ব্যাগডি সোর্স জানি। বুঝলেন ভাই! তিন ঘন্টার মামলা! গরু বাইর কইরা ফালাইসি। আপনে তো আমারে বিশ্বাস করেন নাই! আমি কিরা কাইটা কই, আমি ভাই খারাপ মানুষ, কিন্তু আপনেরে খুব ভালো পাই। আপ্নে সাচ্চা মানুষ। আপনের ছোট মেয়ে টা একদিন আমারে কইসিলো, আংকেল এই লজেন্স টা তোমাকে দিলাম…” মনির শেষ করতে পরলো না। একটা রাস্তার মাস্তানের চোখ বেয়ে পানির ধারা। এরা যাকে ভালোবাসে, অন্ধের মতো ই ভালোবাসে।

রহমান সাহেব স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে, ভালো মানুষের গুলোও ইদানিং তাহলে মুখোশ পড়ে ঘুরে বেড়ায়, মুখোশ পড়া খারাপ মানুষ গুলার ভয়ে। “মনির, তুমি আমার এতো বড়ো উপকার টা করলা! এতো কষ্ট করলা!” রহমান সাহেবের গলা ধরে আসছে। মনির রহমান সাহেবের হাত ধরে বল্লো “ভাই, আপনের শরীর খারাপ, রেষ্ট নেন। আর কাইল কোনো চিন্তা নিবেন না, আমি আছি, নামাজ পইড়া জবাই দিমু ইনশাল্লাহ, গরু বানানির দায়িত্ব আমার। আপ্নে চেয়ারে বইয়া খালি দেখবেন, ১ ঘন্টায় বানায়া দিমু!” মনির বিকট স্বরে হেসে উঠলো। আস্তে আস্তে ঘরের সবাই হাসতে থাকলো। এর মধ্যে মনিরের এক চ্যালা গরু নিয়ে উপস্থিত। “উস্তাদ! গরু রাখুম কো?” মনির কঠিন ঝাড়ি দিলো “ওই ব্যাটা, ঘরে আইনা বানবি নাকি! বাইরে বাইন্দা রাখ। আর রাইতে তুই গরু পাহারা দিবি।“
রাবেয়া ছুটে গেলো গরু দেখতে, গরু টা কি মায়া মায়া, কাজল পরা চোখ। আহারে বেচারা কতক্ষন খায় নাই!” রাবেয়া মনির কে বল্লো “চাচা! গরু তো কিছু খায় নাই, কি খেতে দিবো?” মনির হাসি মুখে বল্লো “তোমার কিছু করতে হইবো না মা, আমার ওই ঠশা টা গরুরে খাওন দিবো, কাইল পর্যন্ত দেখ-ভাল করবো।“
রহমান সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মনির মাস্তান হন হন করে চলে গেলো।
রাবেয়া গরু টা কে একটু করে আদর করছে আর ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। মনিরের অ্যাসিস্টেন্ট কোথা থেকে খড়, ভূসি এনে গরু কে খেতে দিয়েছে। কাল জবাই করে গরু বানানোর জন্য কাঠ, চাপাতি ও যোগাড় করে ফেলেছে। রহমান সাহেবের জ্বর এখন অনেক কম। রাবেয়ার মা ও স্বস্নেহে মেয়ে কে দেখছে।

আরো রাত বাড়লো। রহমান সাহেব বিছেনা তে শুয়ে জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে। মেঘ কেটে গেছে, তারা ঝিকমিক করা আকাশে রহমান সাহেব তার ছোট মেয়ে কে খুজছে। চোখ বেয়ে বেয়ারার মতো পানি পড়ছে। মনির আজ যেমন করে গরু টা খুঁজে এনে দিলো, ও কি পারবে তার মেয়ে টা কে আকাশের মাঝ থেকে খুঁজে বের করে দিতে? হয়তো পারবে না। মানুষ অনেক কঠিন জিনিস খুঁজে পায়, কিন্তু চোখের সামনে থাকা ভালোবাসা খুঁজে পায় না।

(c) সাব্বির ইমন

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1214 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com