জাসদের ভ্রান্ত রাজনীতি, ক্ষমতা লিপ্সু তাহের এবং বলির পাঁঠা হাজারো তরুন

অক্টোবর ৩১, ২০১৭ ৪:০৬ অপরাহ্ণ

:: স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে শাসক দলের স্বজনপ্রীতি, লুণ্ঠন আর অনিয়মের বিরুদ্ধে যখন কেউ কথা বলতে সাহস পাচ্ছিল না, তখন এগিয়ে আসেন দাদা ভাই খ্যাত রাজনীতির রহস্যমানব সিরাজুল আলম খান। যদিও শেখ মনির সাথে নেতৃত্ব দ্বন্দ্বের কারণে তিনি আলাদা হয়ে যান, তথাপি যুব সমাজের অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত এবং গ্রহণযোগ্য গ্রুপটি তাঁকে সমর্থন জানায়। অন্যদিকে ছাত্রলীগের মধ্যেও নেতৃত্ব দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারন করে এবং আসম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজরা আলাদা প্লাটফর্ম গঠন করেন।
ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের পেছনে সিরাজুল আলম খানের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনী গঠন তার পরিকল্পনাতেই হয়। শেখ মনি পরিশ্রমী এবং নেতৃত্বগুণ থাকলেও সার্বিক যোগ্যতায় সিরাজুল আলমের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিলেন। কেবলমাত্র শেখ মুজিবের ভাগিনা হিসেবে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে যান।
শেখ মুজিব নিজেও যোগ্যতা মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হন। এর ফলে ছাত্রলীগ যুবলীগের আসন্ন ভাঙ্গন ঠেকাতে কোন উদ্যোগ নিতে সক্ষম হননি।
তাই মনি – তোফায়েলদের বিরুদ্ধে সিরাজুল – রব গ্রুপ যখন পাল্টা সমাবেশ ডাকেন, তখন তিনি নিরপেক্ষ না থেকে ভাগিনার পক্ষাবলম্বন করেন। অথচ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মনিদের চাইতে পল্টনে সিরাজুল – রব গ্রুপের জনসভায় অনেক বেশি ছাত্র- যুবক সমাবেত হন।
যে আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, স্বাধীন দেশে তা বাস্তবায়িত না হয়ে অনেক দূরে সরে যাওয়ায় দেশবাসী হতাশ হন। তবে সবচাইতে বেশী হতাশ হয় ছাত্র- যুব সমাজ। আবার যোগ্য কোন প্লাটফর্ম না পাওয়ায় তারা প্রতিবাদ জানাতেও পারছিল না। সিরাজুল আলম খান – মেজর জলিল – আসম আব্দুর রবের মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব যখন এই প্লাটফর্মের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্বদান করেন, দলে দলে ছাত্র – যুবক এগিয়ে আসেন প্রতিবাদ মিছিলে।

একপর্যায়ে জাসদে যোগদান করেন লে:কর্নেল(অব:) আবু তাহের বীর উতম। যুদ্ধে পঙ্গুত্ববরণ করায় আর্মির চাকরী হতে অবসর দিয়ে তাঁকে আভ্যন্তরীণ নৌ- পরিবহণ সংস্থায় নিয়োগ দেয়া হয়। সরকারী চাকুরীজীবীদের রাজনীতি করা নিষিদ্ধ হলেও তাহের এসব নিয়মনীতিরর তোয়াক্কা না করে জাসদের রাজনীতি শুরু করেন।
তাহেরের যোগদানের সাথে সাথে জাসদের রজনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে! নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবর্তে শুরু হয় শ্রেণী শত্রু খতম নামের সশস্র রাজনীতি। একদিকে বেসামরিক সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় গণবাহিনী , অন্যদিকে সামরিক বাহিনীতে গঠিত হয় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা । গণবাহিনী সমাজের বিত্তশালী এবং পুঁজিবাদী নির্মূলের জন্য আর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা আর্মিতে অফিসার নির্মূলের লক্ষ্যে গঠিত হয়।
যখন সরকারী দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জাসদ শ্রেণী খতম অভিযান শুরু করে, সরকারও বসে থাকেনি। রক্ষীবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে পাল্টা অভিযান শুরু করে। এভাবে খতম – পাল্টা খতমে উভয় পক্ষে হাজার হাজার নিহত হয়।
জাসদের দাবী মতে তাদের ৩০ হাজার নেতাকর্মী নিহত হয়, আর আওয়ামী লীগের অভিযোগ তাদের ২০ হাজার নেতাকর্মীকে জাসদ হত্যা করে।
সেসময় ছাত্র -যুবকদের স্বার্থান্বেষী এবং পেশীশক্তি গ্রুপটি সরকারী ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে নানা অনিয়ম – দুর্নীতির আশ্রয় নেয়।
অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত এবং মেধাবী ছাত্র-যুবকেরা জাসদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। পতঙ্গ যেমনের আগুন দেখে ছুটে আসে এবং পরিশেষে পুড়ে মরে ; এসব মেধাবী তরুণ সমাজ সমাজ পরিবর্তনের আশায় জাসদের যোগ দিয়ে বলির পাঁঠা হিসেবে জীবন বিলিয়ে দিতে থাকে!
যখন সদ্য স্বাধীন দেশ গড়ার জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন, তখন বিভেদের দেয়ালে পারস্পরিক হত্যার রাজনীতির মাধ্যমে সবাই ধ্বংস হয়ে যায়!
এসবের জন্য দায়ী জাসদের লক্ষ্যবিহীন রাজনীতি , তাহেরের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং সরকারী দলের হিংসাত্মক প্রতিশোধগ্রহণ।
আওয়ামী লীগকে উৎখাত করতে গিয়ে নিজেরা যেমন একদিকে দলে দলে মরেছে, অন্যদিকে নিজেদের কর্মীদের বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ায় ক্রমশ কর্মীশূণ্য হয়েছে!
১৫ অগাস্টের ঘটনা না ঘটলে জাসদ হয়তো কোন চুড়ান্ত পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যেত। তাই ১৫ অগাস্টের ঘটনাকে তারা নিজেদের বিজয় বলে দাবী করে এবং কোন কোন নেতা মিষ্টি বিতরণ করে। একনেতা ফারুকের ট্যাঙ্কের উপর চড়ে নৃত্যগীত করার ঘটনাও দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন।
পরবর্তীকালে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ক্যু করার প্রেক্ষিতে জাসদ ক্ষমতা দখলের ছক সাজায়! ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে এবং জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, লে: কর্নেল হায়দারের মতো বীব মুক্তিযোদ্ধা। সে সময় বিপ্লবী সিপাহীরা চেইন অব কমাণ্ড ভেঙ্গে ফেলে এবং শ্লোগান দেয় ” সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই “!
তাদের হাতে লেডি ডাক্তার, হকি খেলোয়াড় সহ ১৮ জন নিরীহ অফিসার নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হন যার দায়ভার জাসদ তথা তাহের কোনভাবেই এড়াতে পারবেন না।
তাদের এসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে অকালে ঝরে গিয়েছে হাজার হাজার তরুণ প্রাণ, ঝরে গিয়েছে অসংখ্য অফিসার- সৈনিক।
যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল প্রবল সম্ভাবনাময় এবং অধুনিক গতিশীলতার লক্ষ্যে, তা অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়ে লক্ষ্যবিহীন পদচারণা, হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং হত্যার রাজনীতির মাধ্যমে।

লেখক : মুসাফির খান ।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1088 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com