জালিয়াতি করে ২৬৭ কোটি টাকা পাচার

ডিসেম্বর ৪, ২০১৭ ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বগ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলম দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ। ১৯৮৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ডেমরার একটি জুটমিলে কাজ করতেন। এরপর ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাবার সঙ্গে কাঁচামালের ব্যবসা করেছেন। পরে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আবাসন প্রতিষ্ঠান মিরর ডেভেলপমেন্টে তত্ত্বাবধায়কের কাজ করেছেন। জীবনে কোনো দিন আমদানি-রপ্তানির কাজ করেননি।

অথচ খোরশেদ আলম কাগজে-কলমে রাজধানীর খিলক্ষেতের হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এলসি এবং কেরানীগঞ্জের অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। গত তিন বছরে তিনি ২৬৮ কোটি টাকার মদ, সিগারেট, টেলিভিশন আমদানি করেছেন। এসব চালানের বিপরীতে তিনি পৌনে চার কোটি টাকার পোলট্রিশিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঘোষণা দিয়েছিলেন।

আসল ঘটনা হলো, খোরশেদ আলম মিরর ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে কাজ করার সময় তাঁর ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি নিয়ে ওই কোম্পানির মালিকের বন্ধু খিলক্ষেতের ডুমনি ইউনিয়নের পাতিরা গ্রামের আবদুল মোতালেব দুটি কোম্পানি খোলেন। এরপর গত তিন বছরে ওই দুটি কাগুজে কোম্পানির নামে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ৯০ কনটেইনার মদ, সিগারেট আমদানি করা হয় আইএফআইসি ব্যাংকের নয়াপল্টন শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অস্তিত্বহীন কোম্পানি দুটির নামে দিনের পর দিন এলসি খুলে অবৈধভাবে এসব পণ্য আনেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানে এই ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় ২৬৭ কোটি টাকা অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠান যত ধরনের অনিয়ম করতে পারে, এখানে এর প্রায় সবই ঘটেছে।

গত ৭ মার্চ গোপন সূত্রের ভিত্তিতে খবর পেয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ১২ কনটেইনার পণ্য আটক করেন শুল্ক কর্মকর্তারা। এসব কনটেইনারে ১ শতাংশ আমদানি শুল্কে পোলট্রিশিল্পে মূলধনি যন্ত্রপাতির পরিবর্তে এসেছে ৪ হাজার ১৬টি টেলিভিশন, ৪ কোটি ১৪ লাখ ২৯ হাজার ২০০ পিস সিগারেট, ১৬ হাজার ১৬৮ লিটার মদ। এসব পণ্য সিঙ্গাপুর থেকে চট্টগ্রামে আসে। এ ঘটনার সূত্র ধরে বৃহৎ পরিসরে তদন্ত শুরু করলে বেরিয়ে আসে শুল্ক ফাঁকির কৌশলের অভিনব সব ঘটনা। বন্দরে মালামাল আটকের পর থেকে আমদানিকারক আবদুল মোতালেব পলাতক আছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান প্রথম আলোকে বলেন, আমদানি পর্যায়ে যত ধরনের অনিয়ম হতে পারে, সবই এখানে হয়েছে। শুল্কায়ন-প্রক্রিয়ায় অধিকতর সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই বিষয়ের বিস্তারিত তদন্ত করা হয়েছে। এই ঘটনার পেছনে কারা আছেন, তা-ও জানতে আরও গভীর অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে আবদুল মোতালেবসহ সংশ্লিষ্ট সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

কোম্পানি, ঠিকানা সবই ভুয়া
হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এলসি খিলক্ষেতের ডুমনি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয় থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে বলে আইএফআইসি ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে তদন্ত প্রতিবেদন দলের সদস্যরা সরেজমিনে দেখেন, ওই এলাকায় এই নামের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এমনকি ট্রেড লাইসেন্সটিও ভুয়া।

অন্যদিকে অ্যাগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি নামের প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুরের চরগলগলিয়ায় অবস্থিত। কিন্তু বাস্তবে সেখানে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।
অধুনালুপ্ত বিনিয়োগ বোর্ডের কাছে এই দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চেয়েও নিবন্ধন হওয়ার কোনো তথ্য পায়নি এনবিআর।

কারখানা পরিদর্শন না করেই এলসি
নিয়ম হচ্ছে, ঋণপত্র খুলতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা ওই প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। ঢাকার নয়াপল্টন শাখার একজন সিনিয়র অফিসার প্রথম দফায় তদন্ত প্রতিবেদন দলকে সরেজমিনে পরিদর্শন প্রতিবেদন দিয়ে জানান, তিনি সরেজমিনে দুটি কারখানা পরিদর্শন করেছেন, কারখানা দুটি চালু আছে, কারখানার মালিককে দেখতে পেয়েছেন এবং কারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ সব সুবিধা আছে।

কিন্তু কয়েক দিন পরে ওই সিনিয়র অফিসার নিজেই শুল্ক গোয়েন্দা কার্যালয়ে এসে জানান, আগে যা বলেছেন, সবই মিথ্যা। গত ৮ মার্চ নয়াপল্টন শাখার ব্যবস্থাপক তাঁকে বুঝিয়েছেন যে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের এলসি-সংক্রান্ত নথি প্রধান কার্যালয়ে মানি লন্ডারিং বিভাগে পাঠাতে হবে। তাই ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের নথি অফিসে বসেই হালনাগাদ করা হয়। ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে ব্যবস্থাপকের কক্ষে ডেকে নিয়ে সই করতে বলা হয়। আগে কখনোই ওই দুটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করার নির্দেশ দেননি শাখা ব্যবস্থাপক।

এমনকি ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক খোরশেদ আলমের (প্রকৃত অর্থে আবদুল মোতালেব) দেওয়া ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়নি।

আবার যে প্রতিষ্ঠানের সাতটি ট্রাক দিয়ে ৭৮টি কনটেইনার পণ্য বন্দর থেকে গন্তব্যে নেওয়া হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানও ভুয়া। এসএম ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামের এই প্রতিষ্ঠানের মালিক সিরাজুল ইসলাম। ঠিকানা ১১৩ শেখ মুজিব রোড, আলম মার্কেট, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম। এই ঠিকানায় গিয়ে ওই মালিকের কোনো অস্তিত্ব পায়নি এনবিআরের তদন্ত দল।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বলছে, ২০১৫ সাল থেকে গত মার্চ মাস পর্যন্ত ওই দুটি প্রতিষ্ঠান ৯০টি কনটেইনারে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকার পোলট্রিশিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আনার কথা ছিল। কিন্তু আনা হয় প্রায় ২৬৮ কোটি টাকার মদ, সিগারেট, টেলিভিশন। এর মধ্যে ১ কোটি টাকার মতো অর্থ বৈধ চ্যানেলে বিদেশে পাঠিয়ে বাকি টাকা অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৬৭ কোটি টাকা হুন্ডি করে পাঠানো হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ: সব পক্ষ জড়িত
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে অপরাধ শুরু হয়েছে ব্যাংকের জালিয়াতির কারণে। পরে আমদানি করা পণ্য চালান খালাসের সময় বন্দরে ধাপে ধাপে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মালামাল সংরক্ষণ ও সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের এবং পণ্য ছাড় ও রাজস্ব সুরক্ষার দায়িত্ব চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস কর্তৃপক্ষের। এমনকি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ঠিকানাও ভুয়া। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে বন্দর ও কাস্টমস হাউসের বিভিন্ন পর্যায়ের কোনো না কোনো কর্মকর্তার যোগসাজশ আছে। এ ছাড়া, এর পেছনে এক বা একাধিক অর্থ জোগানদাতা বা গডফাদার আছে বলে মনে করা যায়।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1049 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com