চালের দাম এখনো চড়া

নভেম্বর ১৭, ২০১৭ ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ

সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই গত এক মাসে চালের আমদানি বেড়েছে। অনেক জায়গাতেই আমন ধান কাটা চলছে। এতে দেশে চালের দামও কিছুটা কমেছে। তারপরও চালের দাম সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসেনি। আর এ কারণে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশকে এখনো ‘অ্যালার্ট’ বা সতর্কবার্তার তালিকায় রেখেছে।

অর্থাৎ খাদ্যের দাম, সহজলভ্যতা ও মান—এই তিন ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে এখনো খারাপ বলে মনে করছে এফএও। চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গত মে মাসে প্রথম এই সতর্কবার্তা দিয়েছিল এফএও। চলতি মাসেও তা বহাল রাখা হয়েছে। ১০ নভেম্বর এফএও ফুড প্রাইস অ্যান্ড মনিটরিং (এফপিএমএ) শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য দেওয়া হয়।

তবে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম চালের দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে দেশে কোনো সংকট আছে বলে মনে করেন না। তাঁর মতে, চালের দাম যথেষ্ট পরিমাণে কমেছে। সামনের আমন মৌসুমে কৃষককে ভালো দাম দিতে হলে চালের দাম বেশি থাকতে হবে। এতে কৃষক ধান চাষে উৎসাহিত হবেন। আর গরিব মানুষের জন্য সরকারের খোলাবাজারে চাল বিক্রি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্য পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে এখন মোটা চালের দর প্রতি কেজি ৪২ থেকে ৪৪ টাকা। আর সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে মোটা চালের দাম এখন ৪২ থেকে ৪৬ টাকা। গত পাঁচ মাসে মোটা চালের দাম কেজিতে ৪ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত কমেছে। আর এই দর গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা ১৭ লাখ টন হলেও বর্তমানে সেখানে চাল আছে ৪ লাখ ১৩ হাজার টন ও গম ১ লাখ ৫৯ হাজার টন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চাল ও গম মিলিয়ে এই সময়ে মজুত কমপক্ষে ৮ লাখ টন থাকা উচিত।

বাংলাদেশসহ আটটি দেশকে খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিল এফএও। এর মধ্যে চালের দাম নিয়ে সতর্কবার্তা পেয়েছে কেবল 
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। বাকি দেশগুলো আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত ছয়টি দেশ। যেমন বুরুন্ডি, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, মালি, সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদান। আর প্রধান খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসায় তালিকা থেকে বের হয়ে যেতে পেরেছে পেরু, নাইজার, উগান্ডা, তানজানিয়া ও কেনিয়া।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের পাইকারি মূল্য ৩৯ থেকে ৪০ টাকা। আর খুচরা বাজারে তা ৪২ থেকে ৪৪ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। হিসাব অনুযায়ী, এক কেজি চাল দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে রাজধানীতে আসতে এক টাকারও কম খরচ হয়। ফলে মুনাফা ও পরিবহন খরচ যোগ ধরলে পাইকারি ও খুচরার পার্থক্য কোনোভাবেই দুই টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম লায়েক আলী এ নিয়ে বলেন, ‘পাইকারিতে সব ধরনের চালের দাম চার-পাঁচ টাকা কমিয়েছি। আমরা যতটা দাম কমাচ্ছি, খুচরায় ততটা কমছে না। কেন কমেনি, তা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদারক করা উচিত।’

ধানের ক্ষতি আসলে কত?

এদিকে, দেশে এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ লাখ ২৮ হাজার টন চালের উৎপাদন কম হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ। চলতি বছরের বোরো, আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন হিসাব করে তারা এ তথ্য চূড়ান্ত করেছে। গত ৩০ অক্টোবর সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। মূলত, দুই দফা বন্যায় ফসলের ক্ষতির কারণেই এই দাম বেড়েছে।

তবে গতকাল বৃহস্পতিবার পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আগাম বন্যার কারণে গত অর্থবছর দেশে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ৯ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন কমেছে।

৯ লাখ ৪৩ হাজার টন চাল উৎপাদন কম হয়েছে, তাহলে কেন শুধু সরকারি খাতে ১৫ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলো—সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এই প্রশ্ন তোলা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বেশি করে আমদানি করতে হচ্ছে।

তবে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম গত জুন মাসে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, বন্যার কারণে শুধু বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন ২০ লাখ টন কম হবে। আর ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ১২ লাখ টন ও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সাড়ে ৯ লাখ টন উৎপাদন কম হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে দেশের চালকলমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, চালের উৎপাদন এবার ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন কম হয়েছে। এ কারণে বাজারে চালের সংকট তৈরি হয়েছে।

চালের দাম সাধারণ ভোক্তাদের হাতের নাগালে নিয়ে আসতে সরকারি-বেসরকারি আমদানি বাড়ানো এবং   আমন মৌসুমকে ভরসা হিসেবে দেখছে সরকার। ইতিমধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধিদল আমন ধানের ফলন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেশের উত্তরাঞ্চল পরিদর্শনে গেছে। শুল্ক উঠিয়ে দেওয়ার পর বেসরকারি খাতে গত ৪ মাসে ১২ লাখ ৮২ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। আরও ২৫ লাখ ৮২ হাজার টন চাল আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র (এলসি) খুলেছেন। এর মধ্যে ১৩ লাখ ১৩ হাজার টন চাল আমদানির ঋণপত্র চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

তবে সরকারি খাতে চালের আমদানি পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। ১৫ লাখ টন চাল আমদানির জন্য ৫টি দেশের সঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয় চুক্তি করলেও চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত এসেছে ৪ লাখ টন। এর মধ্যে কম্বোডিয়ার সঙ্গে গত আগস্টে করা আড়াই লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি গত সপ্তাহে বাতিল করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। কারণ, দেশটির রাষ্ট্রীয় সংস্থা গ্রিন ট্রেড কোম্পানি সময়মতো চাল দিতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ভারতের কাছ থেকে আরও এক লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। এর আগে ভারতের কাছ থেকে এক লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি করা হয়।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কম্বোডিয়ার চাল সরবরাহের দায়িত্বে থাকা গ্রিন ট্রেড কোম্পানি সময়মতো চাল সরবরাহের চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে। ফলে আমরা ওই চুক্তি বাতিল করেছি। বিকল্প হিসেবে আমরা ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছি।’

বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ সামগ্রিক বিষয়ে  বলেন, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ শুরুতে কিছুটা কম ছিল। কিন্তু শুল্ক কমানোসহ নানা উদ্যোগের পরও এখন যেহেতু দাম কমছে না, তার মানে এখানে অন্য কোনো সমস্যা আছে। কেননা যে পরিমাণে চাল আমদানি হয়েছে, তাতে দাম অবশ্যই ৪০ টাকার মধ্যে চলে আসা উচিত ছিল। কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ আরও বলেন, ‘চালের দাম নিয়ে গণমাধ্যম ও নাগরিকেরা আওয়াজ তুললে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে দেখি। কিন্তু তারা যদি নিয়মিতভাবে বাজার তদারক না করে, তাহলে যতই উদ্যোগ নিক, দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে না।’

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1204 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com