চলছে তুমুল ধরপাকড়

জানুয়ারি ৩১, ২০১৮ ৮:১৮ অপরাহ্ণ

:: প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে আটক কর্মী ছিনতাই এবং পুলিশের ওপর হামলার পর বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরপাকড় শুরু করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর হাইকোর্টের সামনে ওই ঘটনার পর পুলিশ রাজধানীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি অভিযান চালায়। ওইদিন রাতেই পুলিশ দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে গ্রেফতার করে। এর আগের দিন অন্তত ৭০ জনকে আটক করে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলালকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত ১০ নেতার বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির ভেতর গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে গেছেন। অনেকে মোবাইল ফোন বন্ধ করে বিকল্প মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বুধবার আজিজুল বারী হেলাল ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবারের ঘটনায় একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাসহ তিন শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়েরের পর বেশিরভাগ নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন। গতকাল বুধবারও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার বকশীবাজারের আদালতে হাজিরা দিতে যান। অন্যান্য সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতে হাজিরা দিতে যাতায়াতের সময় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও গতকাল তেমনটা ছিল না।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলা আতঙ্ক ও পুলিশের কড়াকড়ির কারণে অনেক কর্মীই গতকাল বহরে যোগ দিতে পারেননি। নেতাকর্মীরা আগে থেকেই হাইকোর্ট এলাকায় অবস্থান নিলেও পুলিশ হাইকোর্টের পুরো গেট বন্ধ রাখায় কেউ বের হতে পারেননি।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নাশকতায় যারাই জড়িত থাক, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। মঙ্গলবারের নাশকতায় জড়িত আসামিদের ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র বিশ্নেষণ করে চিহ্নিত করা হবে। চিহ্নিত অনেককে গ্রেফতারে অভিযানও চলছে। গতকাল রাতেও বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে।
গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই ২০১৪-১৫ সালের মতো নৈরাজ্য বরদাশত করা হবে না। দেশের কোনো নাগরিক আইনের ঊর্ধ্বে নন। কেউ আইন ভাঙার চেষ্টা করলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।
পুলিশ জানায়, প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে ‘আসামি’ ছিনতাই, পুলিশের ওপর হামলা, ভাংচুর ও অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ও পুলিশ সদস্যদের হত্যাচেষ্টার অভিযোগে রাজধানীর শাহবাগ ও রমনা থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সাইফুল ইসলাম নিরব, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন, বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকনসহ তিন শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় এসব নেতাকে হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল রমনা থানার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তবে সহসাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। ওই তিনটি মামলার মধ্যে শাহবাগের দুই মামলায় ১৮ জন এবং রমনা থানার মামলায় ৩৫ জনকে দু’দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এ ছাড়া আগের দিন র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ছাত্রদলের সাবেক নেতা আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনকেও রমনা থানার একটি মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
শাহবাগ থানার দুই মামলার মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা মামলায় ৮৭ জন ও অন্য মামলায় ৮৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুই মামলায় একই ব্যক্তি আসামি রয়েছে। রমনা থানার মামলায় ১৪২ জন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আসামি ছাড়াও বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নির্দেশে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
মঙ্গলবার বিকেলে হাইকোর্টের সামনে প্রিজন ভ্যান ভেঙে আটক দুই কর্মীকে ছিনতাই, হামলা, পুলিশের অস্ত্র ভাংচুরের ঘটনায় শাহবাগ থানায় ওই রাতেই পুলিশ দুটি মামলা করে। পরীবাগ এলাকায় গাড়ি ভাংচুর, মানুষের টাকা, মানিব্যাগ ছিনতাই ও ত্রাসের ঘটনায় একই রাতে রমনা থানায় একটি মামলা করে পুলিশ।
শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু জাফর সমকালকে বলেন, দুই মামলায় এজাহারভুক্ত ৭৫ জন করে আসামি রয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয়ের আরও আসামি রয়েছে। এসব আসামির মধ্যে গতকাল পর্যন্ত গ্রেফতার ১৮ জনকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলী হোসেন জানান, মঙ্গলবারের ঘটনায় গ্রেফতার ৩৬ জনকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে অন্য আসামিদের নাম পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানায়, ওইদিন পূর্বপরিকল্পিতভাবে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর ও ত্রাস সৃষ্টি করা হয়। এসব ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা ছিল। তদন্ত করে ওইসব নেতাকে শনাক্ত করার কাজ চলছে। পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার সমকালকে বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র বিশ্নেষণ করে আসামিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতে হাজিরা দিতে যাতায়াতের সময় পুলিশ যতদূর সম্ভব ধৈর্যশীল থাকে। দুর্ভোগ ও ভোগান্তি কমাতে কাজ করে। বিএনপি কর্মীদের কোনো আক্রমণ ছাড়া সাধারণত ওই সময় পুলিশ অ্যাকশনেও যায় না। মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে অতর্কিতভাবে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালানো হয়। পুলিশ সদস্যদের মারধর করে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে তা ভেঙে ফেলে। পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি থাকলেও এমন পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। এরপরও সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানা পুলিশের সূত্র জানায়, তাদের কাছে নির্দেশনা রয়েছে, যে কোনো মূল্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। চিহ্নিত নাশকতাকারীরা কে কোথায় তাও নজরদারি করতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন নাশকতা মামলার পুরনো আসামিদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তা ছাড়া আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সতর্ক থাকবে।
এদিকে মঙ্গলবারের নাশকতার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হামলায় অংশ নেওয়া লোকজন অনুপ্রবেশকারী। গতকাল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, ‘বলা হচ্ছে, পুলিশের ভ্যান থেকে দুইজনকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারা এ হামলা চালিয়েছে তাদের আমরা চিনতে পারছি না। আমরা আশঙ্কা করছি, তারা অনুপ্রবেশকারী। তাদের সম্পর্কে কোনো কিছু জানি না। ধারণা করছি, নাশকতা করার জন্য তারা এটা করেছে।’
বুধবার গ্রেফতার শতাধিক : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গতকাল আদালতে যাতায়াতের পথে শতাধিক নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে দাবি করেছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সন্ধ্যায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। বিএনপি নেতারা বলেছেন, রাতেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়েছে।
তিন মামলায় আরও আসামি যারা :বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ক্যাপ্টেন সৈয়দ সুজার উদ্দিন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির, মহিলা দলের সেক্রেটারি সুলতানা আহম্মেদ, বিএনপি নেতা খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী শিরিন সুলতানা, হেলেন জেরিন এবং শ্যামা ওবায়েদ। এ ছাড়া বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের ঢাকা মহানগর ও বিভিন্ন ওয়ার্ড নেতাদের আসামি করা হয়েছে।
উৎসঃ সমকাল

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1115 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com