গোয়েন্দা ব্যর্থতা তদন্তের তাগিদ

নভেম্বর ২৮, ২০১৭ ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ

বহুল আলোচিত পিলখানা হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ে ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে বিদ্রোহের আগে গোয়েন্দারা কেন সেই আশঙ্কার তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখার এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার সুপারিশ এসেছে রায়ে।
বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ (বৃহত্তর) বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ রায় দেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তখনকার বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহের একপর্যায়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিম্ন আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন কারাগারে মারা গেছেন। ডেথ রেফারেন্স, সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের করা ফৌজদারি আপিল এবং নিম্ন আদালতের ৬৯ জনকে খালাস দেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানি শেষে গতকাল রায় দিলেন হাইকোর্ট।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয় গত রবিবার। গতকাল দ্বিতীয় দিনে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার তাঁর পর্যবেক্ষণে সাত দফা সুপারিশ ও অভিমত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিদ্রোহের সময় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে বিডিআরের নিরাপত্তা ইউনিটের সদস্যরা ব্যর্থ হয়েছে। কেন তারা তথ্য দিতে ব্যর্থ হলো কিংবা কেন তারা নিশ্চুপ ছিল তা তদন্ত করতে একটি কমিটি বা কমিশন গঠন করতে হবে।
এ কমিটি বা কমিশনের প্রতিবেদন দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদারের সুপারিশগুলোর প্রতি বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ঐকমত্য পোষণ করে বলেন, এ সুপারিশ এই আদালতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আদালত অভিমতে বলেন, একটি নতুন সরকারকে অস্থিতিশীল করতে এবং দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করার জন্যই ঠাণ্ডা মাথায় এ জাতীয় বিদ্রোহের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের পরও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তা গোপন রেখে বৈঠক করা হয়েছে। আত্মসমর্পণে গড়িমসি করা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর দৃঢ়চেতা দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছেন।

ভবিষ্যতে বিজিবিতে যাতে আর কোনো বিদ্রোহ বা সমস্যা দেখা না দেয় সে জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাত দফা সুপারিশ বিবেচনায় নিতে বলেছেন হাইকোর্ট। সুপারিশে বলা হয়েছে—

‘১. এই আদালতের অভিপ্রায় হচ্ছে যে, ‘অপারেশন ডাল-ভাত’-এর মতো প্রোগ্রাম বা কর্মসূচি বিজিবি সদস্যদের আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন করে। এ জাতীয় কর্মসূচি যেন ভবিষ্যতে গ্রহণ করা না হয়।

২. আদালত আশা করছে যে, বিডিআর (বিজিবি) কর্তৃপক্ষ এমন কোনো কর্মসূচি বা প্রোগ্রাম গ্রহণ করবে না যা ভবিষ্যতে বাহিনীর সদস্যদের আত্মমর্যাদা ও তাদের আচরণকে ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটায়।

৩. বিডিআরে বিদ্রোহের আগে তাদের সমস্যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সে সমস্যার দিকে নজর দেওয়া হয়নি। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবি কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো সমস্যা তুলে ধরা হলে তা ফেলে না রেখে দ্রুত সমাধান বা জবাব দিতে হবে।

৪. বিজিবি সদস্যদের কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানের বিষয়ে বিজিবির মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। এমনকি বিজিবির কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যদের মধ্যে যদি সুপ্ত বাসনা থাকে তবে তা জেনে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

৫. বিডিআর সদস্যদের যেসব বকেয়া পাওনা রয়েছে তা দ্রুত পরিশোধে পদক্ষেপ নিতে হবে।

৬. আদালত আরো প্রত্যাশা করছে যে বিজিবি সদস্যদের ছুটিসহ অপর সকল সমস্যা বিজিবি কর্তৃপক্ষ সমাধান করবে।

৭. আদালত দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করছে যে, বিদ্রোহের সময় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে বিডিআরের নিরাপত্তা ইউনিটের সদস্যরা ব্যর্থ হয়েছে। কেন তারা তথ্য দিতে ব্যর্থ হলো কিংবা কেন তারা নিশ্চুপ ছিল তা তদন্ত করতে একটি কমিটি বা কমিশন গঠন করতে হবে। এ কমিটি বা কমিশনের প্রতিবেদন দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ’

এর আগে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। এ ঘটনার পেছনে অভ্যন্তরীণ ইন্ধন থাকতে পারে আবার বাইরের যোগসূত্রও থাকতে পারে। আদালত বলেন, এ মামলার একজন সাক্ষী বলেছেন, ‘এরা মানুষ ছিল না। এদের আচরণ ছিল পশুর মতো। ’ এ কথা থেকে স্পষ্ট যে তাদের (বিদ্রোহী) কর্মকাণ্ড কত পৈশাচিক ছিল। বিডিআর সদস্যরা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার মধ্য দিয়ে পুরো বাহিনীতে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, এ ঘটনার পেছনে আরো একটি দৃশ্য রয়েছে। সেদিকে সবাইকে বিশেষ করে বিজিবি কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। এ বাহিনীসহ সব বাহিনী বা সংস্থাকে ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণা বদলাতে হবে। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। কর্মকর্তা ও সিপাহিদের মধ্যে যে পার্থক্য বজায় রাখা হয়েছে তা ঘোচাতে হবে। সিপাহিদের সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করতে হবে। তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে—এরা অন্য কোনো দেশের নাগরিক না। তারাও এ দেশেরই মানুষ। তারা কারো ভাই, কারো সন্তান। এই অভ্যাসের পরিবর্তন করা হলেই কেবল দেশ ও মানবতা এগিয়ে যাবে।

গতকাল রায় ঘোষণার শুরুতেই বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার তাঁর পাঁচটি পর্যবেক্ষণে বলেন, ১. কার্যত বিডিআর থেকে সেনা কর্মকর্তা মুক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়।

২. পিলখানায় সংঘটিত এ ধরনের বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞকে কোনো উসকানি, কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, কোনো অসন্তোষ বা কোনো ক্ষোভের অজুহাত দিয়ে যুক্তিযুক্ত হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে নীলনকশা বা ষড়যন্ত্র না থাকলে নৃশংসভাবে দেশের ৫৭ জন সৎ ও প্রতিশ্রুতিশীল সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতো না।

৩. এ হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা। এর ফলে জাতি বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিশীল, বুদ্ধিদীপ্ত এবং প্রতিভাবান সেনা কর্মকর্তাকে হারিয়েছে। তাঁদের এই শূন্যতা পূরণে দীর্ঘ সময় লাগবে। বিদ্রোহীরা যে জঘন্য অপরাধ করেছে তা খুবই মর্মান্তিক, বিভীষিকাময়, নারকীয় এবং ভয়ংকর। এই অপরাধ সভ্য সমাজের মানুষের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ও সহনযোগ্য নয়। তাদের অপরাধ বর্বরতা ও সভ্যতার সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

৪. মামলার তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব গঠিত নতুন সরকারকে উত্খাত ও ক্ষমতাচ্যুত করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা ছিল। এই ষড়যন্ত্রে অভ্যন্তরীণ ইন্ধন থাকতে পারে আবার বাইরের যোগসূত্রও থাকতে পারে।

৫. এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পেছনে বিশেষ চক্রান্তকারী মহলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশকে রাজনৈতিভাবে অস্থিতিশীল করা এবং দেশের গণতন্ত্রের ক্ষতি করা।

পিলখানা হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত যে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে মির্জা হাবিবুর রহমান কারাগারে মারা গেছেন। বাকি ১৫১ জনের মধ্যে তখনকার বিডিআরের ডিএডি তৌহিদ, ডিএডি মো. নাছির উদ্দিন খান, ডিএডি আ. জলিল, সিপাহি সেলিম রেজা, শাহ আলম, আলতাফ হোসেন, সাজ্জাদ হোসেন, আবদুল মতিন, কাজল আলী, সুবেদার মেজর গোফরান মল্লিকসহ ১৩৯ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আটজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং চারজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

নিম্ন আদালতের রায়ে ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সিপাহি চন্দ্রনাথ, আলতাফ হোসেন, রায়হান চৌধুরী, গৌতম দেব, আনোয়ার হোসেন, শরীফ উদ্দিন, নায়েক কামরুজ্জামানসহ ১৪৬ জনের জনের সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১২ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে ২০০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া খালাসপ্রাপ্ত ৩৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু (বিএনপির সাবেক এমপি) ও শফিকুল ইসলাম কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন।

নিম্ন আদালতের রায়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল ২৫৬ জনকে। তাঁদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি ২৫৩ জনের মধ্যে ১৮২ জনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এঁদের মধ্যে তিনজনকে আরো তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আটজনকে সাত বছর করে এবং চারজনকে দেওয়া হয়েছে তিন বছর করে কারাদণ্ড। ২৫৩ জনের মধ্যে ২৯ জনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাকি ২৮ জন আপিল না করায় তাঁদের দণ্ড বহাল রয়েছে।

নিম্ন আদালত মোট ২৭৮ জনকে খালাস দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৬৯ জনকে দেওয়া খালাস আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছিল। হাইকোর্ট তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮৫ জনে।

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আক্তারুজ্জামান পিলখানা হত্যা মামলার রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। ওই রায়ে ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এঁদের মধ্যে চারজনকে ৪৪ বছরের (যাবজ্জীবন ও ১৪ বছর) কারাদণ্ড, ১৫৭ জনকে ৪০ বছরের (যাবজ্জীবন ও ১০ বছর) কারাদণ্ডসহ জরিমানা করা হয়েছিল। অস্ত্র লুট ও অন্যান্য অপরাধের জন্যও তাঁদের সাজা দেওয়া হয়েছিল। রায়ে ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং ২৭৮ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছিল।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিল দায়ের করেন। আবার রাষ্ট্রপক্ষ থেকে খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ৬৯ জনের বিষয়ে আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের খালাস দেওয়া হয়েছে—এই অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। সব পক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে গতকাল রায় দেন হাইকোর্ট।

গত ১৩ এপ্রিল হাইকোর্টে পিলখানা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়। ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি শুনানি শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সেই মামলায় নিয়োজিত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কে এম জাহিদ সরোয়ার কাজল প্রমুখ।

রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, রায়ে বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেছেন, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আদালতের সামনে আসেনি। রায় সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে কিছু বলেননি অ্যাটর্নি জেনারেল। তবে রায়ে আসামিপক্ষের অসন্তোষ সম্পর্কে তিনি বলেন, ৫৭ জন সূর্যসন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা নির্দোষ ও নিরপরাধ ছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পিলখানার ঘটনা সরকারের বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপে দমন করা সম্ভব হয়েছিল। আবার দ্রুত পদক্ষেপে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের পদমর্যাদায় এই মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘আমরা সন্তুষ্ট। দেশের সূর্যসন্তানদের হত্যা করা হয়েছে। উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। এই রায় শিরোধার্য। ’

আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ রায় এভাবে ঘোষণা করতে পারে না। কোনো সাক্ষী নেই। একজনের সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে একেকজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে, এটা কোনো আইনে নেই। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। আপিলে বেশির ভাগ আসামি খালাস পাবে বলে বিশ্বাস করি। ’

গত রবিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে রায় ঘোষণা শুরু করেন হাইকোর্ট। সারা দিন রায়ের পর্যবেক্ষণ অংশ পড়া হয়। বিচারপতি মো. শওকত হোসেন ও বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী পর্যবেক্ষণ পড়া শেষ করেন। পরে আদালত বলেন, ‘রায়ে আসামিদের দণ্ড ও খালাসসংক্রান্ত আদেশের বিষয়ে আমরা তিন বিচারপতি একমত হয়েছি। আগামীকাল (সোমবার) বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার তাঁর পর্যবেক্ষণের অংশ পড়া শেষ করবেন। এরপর মূল রায় ঘোষণা করা হবে। ’ু

গতকাল সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে আবার রায় পড়া শুরু হয়। দুপুরের মধ্যাহ্নবিরতি পর্যন্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম তাঁর পর্যবেক্ষণ পাঠ করেন। এরপর দুপুর আড়াইটা থেকে মূল রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. শওকত হোসেন।

হাইকোর্ট রায়ে বলেন, ২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর সৈনিকরা বিদ্রোহ করেন। চলে ৩০ ঘণ্টা। এই ৩০ ঘণ্টায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনা।

রায়ে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ইপিআর বাহিনী দেশের জন্য অসামান্য অবদান রাখে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বীরত্বের পরিচয় দেয়। অথচ ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআরের কিছু সদস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পিলখানায় যে তাণ্ডব চালায়, যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে তা এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করে। সেই কলঙ্কের বোঝা বিডিআর বাহিনীর বয়ে বেড়াতে হবে অনেক দিন।

তিন বিচারপতির পর্যবেক্ষণেই বলা হয়, সেদিনের বিদ্রোহ ছিল পরিকল্পিত। বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করে যেকোনো উপায়ে দাবি আদায় করা, বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ধ্বংস করে এই সুশৃঙ্খল বাহিনীকে অকার্যকর করা, প্রয়োজনে সেনা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে এ বাহিনীতে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা নিয়োগ নিরুৎসাহ করা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে অস্থিতিশীল করা, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করা, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা এবং জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত করা। এই বিদ্রোহ একটি নবনির্বাচিত সরকারকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে, যা ছিল গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য প্রচণ্ড হুমকিস্বরূপ।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী বিডিআর সদস্যরা মানুষ ছিল না। তাদের আচরণ ছিল হিংস্র পশুর মতো।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কে এম জাহিদ সরোয়ার কাজল কালের কণ্ঠকে জানান, শুনানি শুরু হওয়ার পর মোট ৩০৭ কার্যদিবস শুনানি চলে। পরে রায়ের তারিখ ধার্য করা হয়। তিনি আরো জানান, মামলার পেপারবুক আদালতে উপস্থাপন করতেই সময় লেগেছে ১২৪ কার্যদিবস।

গতকাল রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, এই মামলার প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোমতাজউদ্দিন ফকির, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারোয়ার কাজলসহ বেশ কয়েকজন আইন কর্মকর্তা। অন্যদিকে আসামিপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুল বাছেত মজুমদার, মহসিন রশিদ, এস এম শাহজাহান, আমিনুল ইসলাম, হেলাল উদ্দিন মোল্লা, সুলতানা আক্তার, শামীম সরদার, সুফিয়া আক্তার হেলেন, হাসনা বেগম, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ছিলেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ। এ ছাড়া বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আসামিদের স্বজন, বিপুলসংখ্যক সংবাদকর্মী এবং সেদিনের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে (পিলখানা) সংঘটিত ট্র্যাজেডিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হয়েছিলেন। ওই বছরের ৪ মার্চ লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়েছিল। পরে মামলা দুটি স্থানান্তর করা হয় নিউ মার্কেট থানায়। হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর লালবাগে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে বিচার হয়। বিচার শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ড. মো. আখতারুজ্জামান। মামলায় আসামি ছিল ৮৪৬ জন।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1137 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com