গাড়িবিলাস

মে ১, ২০১৭ ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ

জারার চাপে পড়ে পুরোনো একটা গাড়ি কিনেই ফেললাম।
মহল্লার ফকরি চাচা বললেন, ‘ভাতিজা, ল্যাঠা একখান তো ভালোই জোটাইলা। বুঝবা মজা!’
কী অলক্ষুণে কথা! জারা বলল, ‘অপয়া বুড়ার মুখে ছাই!’
আমার ছেলে অবশ্য মুখ বাঁকা করে বলল, ‘ওয়াই-ফাই নেই, টিভি স্ক্রিন নেই, এটা কেমন গাড়ি!’
মেয়ে বলল, ‘এত কথা বোলো না তো, ভাইয়া! ধীরে ধীরে হবে।’ ক্লাসমেট মৌলি যখন ওকে গাড়ির জানালা দিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানায়, সে-ও একইভাবে বিদায় জানাতে পারে। এতেই সে খুশি।
কিন্তু পড়শি মন্নাফ ভাইয়ের সঙ্গে একটা কাট্টি হয়ে গেল। তাকে যেই না রোজ অফিসে নামিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করলাম, অমনি বলল, ‘না, ভাই। এসব বড়লোকিতে আমার পোষাবে না। তুই এখন গাড়িওয়ালা। আপার লেভেলে। তোর সঙ্গে টেক্কা দেওয়া আমার কাজ না।’
আমি কাতর হয়ে বললাম, ‘এখানে টেক্কা দেওয়ার কথা আসছে কেন? তুমি আমার ভাই না?’
‘না, ভাই। তুই তোর মতো যা। আমি আমার পথ দেখি।’
গাড়িটা দেখছি ল্যাঠাই হয়ে গেল। আগে কী সুন্দর মন্নাফ ভাই আর আমি একসঙ্গে যেতাম। বাসে মন্নাফ ভাই আমড়া কিনলে আমি বাদাম নিতাম। রাজনীতি আর দেশের হালচাল নিয়ে যে ডাল ঘুটা দিতাম, সে ঘুঁটায় দিশেহারা দু-একজন যাত্রী মাঝেমধ্যে চিৎকার দিয়ে উঠত, ‘অনেক দেশ উদ্ধার করছেন, ভাই! এইবার একটু থামেন, প্লিজ!’
মহাখালী থেকে মতিঝিল যেতে যেতে কখনোবা দেড়-দুই ঘণ্টাও লেগে যেত, কিন্তু পপকর্নের মতো ফটফট করে কখন যে সময় পার করতাম, টেরও পেতাম না।
এখন গাড়িতে বসলেই কানের কাছে অদৃশ্য এক ঘড়ি টিকটিক করে। আগে দেরিতে গেলে বসকে বোঝানো যেত, এখন সে জো নেই। বসের জিব বল্লমের ছনছনে ফলা। বলেন, ‘গাড়ি ফটকেছেন, টাইমলি আসতে আবার ইয়ে কেন?’
এই ‘ইয়ে’ বলতে বস কী বোঝান, এর মর্ম উদ্ধারের আগেই তাঁর লেজুড় অমল কাটা ঘায়ে লেবুর চিপ দেয়, ‘সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি মানে আমাদের এলাকার ফকিন্নি বাজারের আধা পচা করলা! আগাগোড়াই জন্মের তিতা!’
তা একটু করলা বটে! ড্রাইভার শফি কেচে পয়সা নামাচ্ছে। এমন সব পার্টসের নাম বলে, আমার চৌদ্দ পুরুষে শোনেনি। অজ্ঞতায় পাছে মান যায়, তাই ভয়ে প্রশ্ন তুলি না।
তবে গাড়িতে যেতে কিন্তু ভালোই লাগে। মন্নাফ ভাইকে সেদিন দেখলাম, বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় রিকশার জন্য ছোটাছুটি করছে। একবার ডাকলাম। ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত নেড়ে সে বোঝাল, রাস্তা মাপো।
যে যা-ই বলুক, গাড়িওয়ালার একটা দাম আছে। হরেক পণ্যের অভিজাত বিপণিতে গেলে কর্মীরা ছুটে এসে মাল তুলে দেয়। মহল্লার যেসব দোকানি আগে কেয়ার করত না, এখন সালাম ঠুকে কুশল জানতে চায়। মোড় দিয়ে পাশ কাটানোর সময় মুরগিওয়ালা চারটা মুরগি উঁচু করে ধরে বলে, ‘স্যার, গাড়িতে ওঠাইয়া দেই। পরে টাকা লমুনে।’
অথচ এরাই আগে ফিরেও তাকাত না।
যশোর থেকে সাঁৎ করে আপা-দুলাভাই এসে হাজির। আপা বললেন, ‘গাড়ি কিনেছিস শুনে ছুটে এলাম। সারপ্রাইজ দেব বলে ফোন করিনি। যাক, বংশে একজন গাড়িওয়ালা হলো!’
দুলাভাই বুড়ো হাড়ে আড়মোড়া ভেঙে বলেন, ‘এবার ভাবছি ঢাকা শহরের যেথায় যা আছে, সবখানে চক্কর মেরে যাব! তা, কোথায় তোর গাড়ি?’
প্রবল জ্বরে মুখে এক চিমটি সাগুদানা যেমন লাগে, আমার ফোর ডোর সিডান দেখে দুলাভাইয়ের বদনখানিও তেমন হলো। ফস করে বলেও ফেললেন, ‘এই বলে গাড়ি! তা কদ্দিয়ে কিনেছিস রে! বয়স কত?’
খেঁকিয়ে ওঠার মোক্ষম সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না আপা। বললেন, ‘গাড়ির বয়স জেনে কী করবে, শুনি? এটা তো ঘরের বাড়ন্ত মেয়ে নয় যে বয়স হলেই আইবুড়ো হয়ে যাবে! পুরোনো চাল যেমন ভাতে বাড়ে, পুরোনো গাড়িও দাবড়ে আরাম। এর মর্ম তুমি কী বুঝবে? সেদিন পত্রিকায় তোমাকে দেখালাম না, ৭০ বছর আগের একটা মার্সিডিজ কত দামে বিকাল!’
নিরুপায় দুলাভাই অসহায়ের মতো হেসে বললেন, ‘এই দ্যাখ, মুহিন, ছেঁড়া কাঁথায় সুচের ফোঁড় কেমন!’
আমার গাড়িতে চড়ে আপা-দুলাভাই পুরান ঢাকায় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গেলেন। আরে, সে কী সমাদর! আমার অবশ্য একটু খরচা গেল। কয়েক পদের মিষ্টি আর বড় একটা মাছ নিয়ে গেলাম। সেসব বয়ে নিতে বাঁকা হয়ে গেল ও বাড়ির হারু।
আপ্যায়নের সময় আপা হারুকে ডেকে বেশ ভাব নিয়ে বললেন, ‘ড্রাইভার বসে আছে গাড়িতে। ছেলেটা ভালো। ওর একটু যত্ন-আত্তি করিস!’
টের পেলাম, আপার পদযুগল ক্রমে যেন শূন্যে উঠে যাচ্ছে।
ফেরার সময় গাড়িটা কিছু দূর গিয়ে খুক্ খুক্ কেশে বন্ধ হয়ে গেল। দুলাভাই বলে উঠলেন, ‘এই, কী রে, অসভ্য! কী হলো এটা!’
শফি থতমত খেয়ে গিয়ে বলল, ‘আমারে কিছু কইলেন, স্যার!’
আপা বললেন, ‘না, তোমাকে বলেনি। ক্লাসের ছেলেদের বলে বলে অভ্যাস হয়ে গেছে! যত্তসব!’
শফি ভয়ে ভয়ে আমাকে বলল, ‘স্যার, একটু ধাক্কা লাগব।’
এই অভাগা ছাড়া আর ঠেলবে কে? কিন্তু ঠেলতে গিয়ে আমার বুকের ছাতি কুঁচকে যাওয়ার জোগাড়। কাছেই কয়েকটি ছেলে জটলা করছিল, ওদের ডাকতেই একজন বলল, ‘কী কন, আংকেল! পুরান মডেলের গাড়ি ঠেলতাম। আমগোর কি মানসম্মান নাই?’
ভাবছি, ভাগনির শ্বশুরবাড়ির কেউ আবার দেখে ফেলে কি না! ঠিক এ সময় পাশে একজন হাজির। কে আর? ওই হারু! কী একটা সওদা আনতে যাচ্ছে। আমার সঙ্গে ঠেলাকাঠি হয়ে সে বিজ্ঞের মতো বলতে লাগল, ‘আমার কিন্তু মামা মনেই হইছিলÑ এই রকম হইতে পারে! এখনকার যুগে এই সব চলে না, মামা। শুনলাম, পাখাওয়ালা গাড়ি নাকি আসতেছে!’
জটলারত ছেলেগুলোকে ডেকে সে দিব্যি কাজে লাগাল। বলল, ‘ওই পোলাপান, আয় এই দিকে। এইটা আমগোর বড় ভাইয়ের মামাশ্বশুরের গাড়ি! ল, ঠেইল্লা পার করি!’
অমনি নগদ কিছু ভাগনে জুটে গেল। ওরা ‘মামা-মামা’ বলে অস্থির। মামার মান রাখতে পকেট থেকে কিছু খসে গেল। ভাবছি, এই ল্যাঠা একেবারে ঝেঁটিয়ে তাড়াব কি না?
পরদিন অফিসে যাব, গাড়িতে ওঠার আগে মন্নাফ ভাই হাজির। পেছনের সিটে সুন্দর জায়গা করে নিয়ে বলল, ‘ওঠ, কথা আছে।’
গাড়ি ছুটে চলে। আমি উৎকর্ণ। কিন্তু মন্নাফ ভাই সে রকম কিছু বলে না। বড় রাস্তায় অফিসগামী অনেক মানুষ খাড়া। বাস নেই। সিটিং সার্ভিস নাটক। কোত্থেকে একটা বাস আসতেই হুড়োহুড়ি লেগে গেল। কে একজন সবেগে চিৎপটাং। তোলার কেউ নেই।
মন্নাফ ভাই কী বলতে চায়, তা এখন পরিষ্কার। তার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে চোখ মটকালাম। ভাগ্যিস, গাড়িটা হয়েছে!

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1248 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com