এক শাহাদতের হুমকিতে অচল ১৬ মামলা

ডিসেম্বর ১০, ২০১৭ ৮:১০ পূর্বাহ্ণ

১২ বছর ধরে তিনি বিদেশে। সেখানে বসেই চাঁদাবাজি করছেন, কাউকে ফোনে ভয় দেখাচ্ছেন। তাঁর নামে যেসব মামলা আছে, সেগুলো না চালাতে বাদী-সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছেন। এ কারণে ১৬টি মামলার বিচারও শেষ হচ্ছে না।

আলোচিত এই সন্ত্রাসীর নাম শাহাদত হোসেন। ২টি মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে, আরও ১৩টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে। দুই শতাধিক জিডিও (সাধারণ ডায়েরি) আছে তাঁর বিরুদ্ধে। পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বলছে, চাঁদা না দেওয়ায় শাহাদত বাহিনী এসব খুন করেছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শাহাদত দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন। সেখানে বসেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন, গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধও করা হয়েছে। বাংলাদেশে আত্মগোপন করে থাকা অনেক সন্ত্রাসীকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারত শাহাদতকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাঁকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, কোনো পরিবার যদি হুমকির শিকার হয়, তাহলে পুলিশ অবশ্যই তাদের সুরক্ষা দেবে।

শাহাদত একসময় শাহ আলী থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। শাহ আলী এলাকার শাইনপুকুর রোডে স্থায়ী বাস ছিল। তাঁর বাবা নুরুজ্জামান ছিলেন টিঅ্যান্ডটির কর্মচারী। শাহাদত ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি মিরপুরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তেজগাঁও কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পাশ করতে পারেননি। ১৯৯৮ সালে গুদারাঘাট এলাকায় একটি খুন করে প্রথম আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর অপরাধজগতে পা রেখে পেশাদার খুনি হয়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটান। ২০০৫ সালে মিরপুরের ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে খুন করে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই আছেন।

২০০৫ সালের ১২ আগস্ট মিরপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, প্রিন্স গ্রুপের মালিক কাজী মো. শহীদুল্যাহকে (৪৫) নিজ বাসার কাছে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সন্ত্রাসী শাহাদতকে প্রধান আসামি করে মামলা হয়। মামলায় বলা হয়, ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পাওয়ায় তাঁকে খুন করা হয়েছে। শহীদুল্যাহ মিরপুর কো-অপারেটিভ মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১২ বছর পার হলেও মামলাটির তদন্ত শেষ হয়নি।

শহীদুল্যাহর পরিবার বলেছে, সন্ত্রাসী শাহাদত টেলিফোন করে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বাদী ও তাঁর পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন।

কাজী শহীদুল্যাহর ভাই কাজী বেলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হননি। বাকি যেসব আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁরা জামিনে বেরিয়ে গেছেন।

২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসী শাহাদতের হাতে খুন হন আরেক ব্যবসায়ী মিরপুরের মুক্ত বাংলা শপিং কমপ্লেক্স পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আফতাবউদ্দিন। এ ঘটনায় শাহাদতসহ ১৩ জনকে আসামি করে মিরপুর থানায় মামলা হয়। তদন্ত শেষে ২০০৭ সালে এই মামলায় শাহাদতসহ ১৯ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় র‍্যাব-৪।

মামলার বাদী আফতাবের ভাই ব্যবসায়ী আফরোজউদ্দিন জানান, মামলা তুলে নিতে তাঁকে লোক মারফত হুমকি দিচ্ছেন সন্ত্রাসী শাহাদত। এ নিয়ে মিরপুর ও শাহ আলী থানায় কয়েক দফা জিডি করা হয়েছে। অব্যাহত হুমকির মুখে গোটা পরিবার নিয়ে তাঁরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গত সপ্তাহে নিরাপত্তা চেয়ে তিনি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনারের কাছে আবেদন করেছেন। এ ছাড়া শাহাদতের হুমকির কারণে সাক্ষীরাও এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।

মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, পরিবারটিকে নিরাপত্তা দিতে মিরপুর থানা-পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শাহাদত ও তাঁর সহযোগীদের হুমকির মুখে পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে মিরপুর থানায় চারটি জিডি করেন নিহত ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেনের ছেলে রাসেল হোসেন। চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসীরা ২০০৫ সালের ১৪ এপ্রিল মিরপুর ১ নম্বরে ফরহাদ হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে। তদন্ত শেষে শাহাদত ও তাঁর সহযোগীরে বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। রাসেল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আদালতে সাক্ষ্য না দিতে শাহাদত তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন।

২০০৫ সালের ৭ জুলাই তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান ও শফিকুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মাহবুবুর রহমানের ভাই মো. বিপ্লব প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসী শাহাদত ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগপত্র দেয় অনেক আগে। কিন্তু শাহাদতের ভয়ে তাঁরা এখন আর মামলার খোঁজখবর রাখেন না।

একইভাবে ভয়ে মামলার খোঁজ নেওয়া বন্ধ করেছেন নিহত ব্যবসায়ী শহিদ হোসেনের পরিবারও। তাঁর ভাই মোস্তাক হোসেন বলেন, তাঁর ভাই শহিদ হোসেনকে ২০০৬ সালের জুনে মিরপুর ১ নম্বরে গুলি করে হত্যা করে শাহাদত বাহিনী। তখন গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বলেছেন, চাঁদা না দেওয়ায় তাঁরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

২০০৬ সালের ১৮ জুন মিরপুর ১ নম্বরে নিজ বাসার কাছে ব্যবসায়ী রিপন চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। নিহত রিপন চৌধুরীর স্ত্রী শায়লা চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাসী শাহাদত তাঁকেও হুমকি দিয়েছেন মামলা না চালানোর জন্য। তিনি স্বামীর মতো পরিবারের আর কাউকে হারাতে চান না। তাই ভয়ে এখন আর মামলার খোঁজখবর করছেন না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসী শাহাদত দেশের বাইরে। তবে অনেকগুলো খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এখন দেশে তাঁর সহযোগীদের তৎপরতা তেমন চোখে পড়ে না। একটি মামলার বাদী নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শাহাদতের বিরুদ্ধে আরও ৯টি হত্যা মামলার বাদী ও সাক্ষীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিএনপির নেতা ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার শওকত আলী হত্যা, ডিশ সংযোগ ব্যবসায়ী শামসুল হক হত্যা, পরিবহনকর্মী পারভেজ হত্যা, মিরপুরের স্বাধীন বাংলা সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী আবদুর রহিম হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মানবাধিকারকর্মীদের সব সময় দাবি ছিল, বাদী ও সাক্ষীকে সুরক্ষা দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। রাষ্ট্র তাকে কি সুরক্ষা দিয়েছিল? এই অবস্থা দেখার পর সাক্ষীদের ভয় পাওয়ার কারণ আছে। যাঁরা সাক্ষ্য দিতে আসবেন, তাঁদের যাবতীয় সুরক্ষা রাষ্ট্রকে করতে হবে এবং অপরাধীকে শনাক্ত করতে হবে।’

শাহাদত বাহিনীর হাতে যত খুন

২০০১

সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার শওকত আলী

২০০২

ব্যবসায়ী শামসুল হক

২০০৪

ঠিকাদার আহমদ হোসেন

ঠিকাদার কামরুল হাসান

ঝুট ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম

২০০৫

ব্যবসায়ী কাজী মো. শহীদুল্যাহ

ব্যবসায়ী আফতাবউদ্দিন

ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান ও

শফিকুর রহমান

ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেন

২০০৬

ব্যবসায়ী শহিদ হোসেন

ব্যবসায়ী রিপন চৌধুরী

পরিবহনকর্মী পারভেজ আহমেদ

২০০৭

ব্যবসায়ী আবদুল বারেক

২০০৮

ব্যবসায়ী আবদুর রহিম

২০০৯

ব্যবসায়ী মন্টু মিয়া

উৎসঃ   prothom-alo
 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1182 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com