একটি কালো মেয়ে ও সমাজ বদলের স্বপ্ন

অক্টোবর ১১, ২০১৭ ৩:০১ অপরাহ্ণ

:: নিজের হাত খরচ চালাবার জন্য আমি তখন টিউশনি করতে শুরু করেছি। অবশ্য আগে থেকেই সাত বছর বয়সী একটি বাচ্চা মেয়েকে পড়াতাম। ওর গায়ের রং কালো থাকলেও চোখ ছিল বড় বড় বাঁকানো। অনায়াসে যাকে হরিণ নয়না বলা যায়। কালো হয়ে জন্ম গ্রহণ করাকে সে অভিশাপ হিসেবে দেখতো। সে আমাকে বলতো, ‘আম্মু বলছে আপনার মত সুন্দর করে কথা কইতে। আমি কালো তো, তাই ভাল ছেলে পাইতে হলে ভাল লেখাপড়া করা আর সুন্দর করে কথা বলা শিখতে হবে। নাহলে আমাকে রিশকাওয়ালার সাথে বিয়া দিবে।’ আমি তাকে বলেছিলাম, রিশকাওয়ালা না, শব্দটি হবে ‘রিকশাওয়ালা’। সে বলতো ‘রিশকাওয়ালা’। যতবার তাকে ঠিক করে দিতাম ততবারই সে রিশকাওয়ালাই বলতে লাগলো।

পরবর্তিতে সে অবশ্য সঠিক উচ্চারণ করতে পেরেছিলো। তবে কালো হওয়া যে খুব খারাপ কিছু নয়, এই শিক্ষা তাকে দেবার চেষ্টা করা বৃথা হবে ভেবে সেদিকটা এড়িয়ে গিয়েছিলাম। যেহেতু তার বুঝবার বয়স হয়নি এবং তার মায়ের কথাই তার কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য তখনও। কালো হয়ে ভালো ছেলে বিয়ে করতে পারবে না – এই ভয়ে যদি সে পড়ালেখায় মনোযোগী হয় তবে মন্দ কি?

তার মায়ের গায়ের রংও তারই মত কৃষ্ণবর্ণের ছিলো। তবে তিনি তিনবেলা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী মাখতেন ছোটবেলা থেকেই যা তার গায়ের রং এ সামান্যতম পরিবর্তন আনতে পারেনি। তার সাথে দেখা হলে আমি মাঝে মাঝেই বলতাম, ‘ভাবী আপনাকে আজ এত সুন্দর দেখাচ্ছে কেন?’ তিনি হাসতেন এবং বলতেন,’ আজকা একটু হলুদ মাখছি ইলু। শারমিনের আব্বুও এই কথাই কইলো।’ শারমিন আমার ছাত্রীর নাম।

মানুষদের এইসব হাসি-কান্না, অল্পতে আনন্দ পাওয়া আমাকে আন্দোলিত করতো। আমি উদাস হতাম। মনের গভীরে স্বপ্ন লালন করতাম, একদিন বড় হবো। যদিও জানতাম না বড় হওয়া আসলে কি জিনিস। মাঝে মাঝে ভাবতাম, বড় হয়ে একদিন আমি একটি বই লিখবো আর সেই বইয়ে লিখা থাকবে এইসব মানুষদের কথা। তাদের জীবনের কথা। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ জানেনা বাকি দুনিয়ার মানুষদের জীবন এবং তাদের হাসি-কান্নারা কেমন হয়। তাদের জানা উচিত, আমার জানানো উচিত। আর শব্দ হলো সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। শব্দরা হাসায়, শব্দরা কাঁদায়। শব্দেরা মানুষকে প্রতিবাদ করতে শেখায়, বিদ্রোহ করতে শেখায়, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে শেখায়। পবিত্র কুরআনের প্রথম শব্দ ‘ইকরা’- পড়। পড়তে হবে প্রচুর লিখতে হলে। আমি লিখবো। আমার জীবন আমি অন্যান্য মেয়েদের মত বিয়ে করে একই চক্রে পাক খেতে দেখতে চাইনা। আমি অন্যরকম।

কিন্তু পরবর্তিতে সেই ‘অন্যরকম’ হওয়া হয়ে ওঠেনি আমার যখন আমার বিয়ে হয়ে যায়। লিখবার ইচ্ছেও চলে গিয়েছিলো। অন্যান্য মানুষদের জৈবিক ও স্বয়ংক্রিয় অনুভুতির মতই আমার অনুভূতিরাও একইরকম জাগ্রত হয়েছিলো এবং আমার বই লেখা হয়নি। সংসার নামক জটিল বই বুঝবার চেষ্টা করি। আমি একজন অতি সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলাম শেষে।

আমরা যেদিন বোর্ড বাজার ছেড়ে চলে আসি সেদিন আমার কালো মেম শারমিন কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে বারবার তার মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ছিলো। আমি তার সামনে কাঁদিনি। তখন আমি কাঁদতে পারতাম না কিন্তু বুকের ভেতর ভারী পাথরের ওজন অনুভব করতাম। সমাজ বদলাতে চাইতাম তখন। এখন দেখি সমাজই আমায় বদলে দিয়েছে।

লেখক : ইলোরা জামান, অনলাইন একটিভিষ্ট ।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1508 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com