উড়িষ্যার লোককথা : পর্ব- ১রাজকুমারীর হস্তিস্বামী

জুলাই ২৮, ২০১৭ ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ

এক ছিল এক হিতৈষী রাজা। তাঁর ছিল সমৃদ্ধ রাজ্য।

তিনি ছিলেন ধনী আর প্রাসাদ ভর্তি ছিল তাঁর চাকর-বাকর। তারা তাঁকে সবসময় ‘কহিবা মাত্র সেবা দানে প্রস্তুত’ থাকত। ছিল হাতি-ঘোড়া, বাঘ-ভাল্লুক, হরিণ-হায়েনা সব। সব সাজানো থাকতো প্রাসাদের মুক্ত প্রঙ্গনে। তিনি অনেক রাজ্য জয় করেন আর প্রজাদের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হয়ে রাজ্য শাসন করতেন। তাঁর অপূর্ব সুন্দরী রাণীও ছিল। কিন্তু তার মনে ছিল এক দুঃখ। কারণ একটাই। তাঁর একমাত্র সন্তান-রাজকুমার খুব সুপুরুষ, শক্তিশালী আর নির্ভীক হলেও সে শিক্ষিত ছিল না।

রাজা তাঁর সন্তানের জন্য সত্যিই খুব বিষণ্ন ছিলেন। তিনি ইতোমধ্যে বানপ্রস্থের সময়ে উপনিত হয়েছেন, তাঁর এখন বনে গিয়ে ঈশ্বরের চিন্তা-সাধনায় জীবনযাপন করার কথা, তিনি জগতকে বলতেই পারছেন না সে কথা। কারণ রাজকুমার উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়া অবধি রাজকুমারের হাতে রাজ্য অর্পণ করতে পারেন না। তিনি রাজকুমারকে ডাকলেন। বললেন, ‘প্রিয় সন্তান! তুমি রাজকুমার। তুমিই এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজা। কিন্তু তুমি তো শিক্ষিত নও। তোমার পক্ষে তো এতবড় রাজ্য কোনভাবেই শাসন করা সম্ভব নয়। রাজা হতে হলে তোমাকে নিশ্চয়ই শিক্ষিত হতে হবে। যাও। বেরিয়ে পড়, বিশেষ শিল্পজ্ঞান অর্জন করে আসো।’

রাজকুমার প্রকৃত সত্য বুঝতে পারলো। কিভাবে সে এ রাজ্য শাসন করবে যেখানে সে কোন শিল্পজ্ঞনে পাণ্ডিত্য অর্জন করেনি! সে আহত হলো।সিদ্ধান্ত নিলো যতক্ষণ না সে রাজ্য পরিচালনায় পুরোদস্তুর দক্ষ না হয় সে রাজ্যেই ফিরবে না। পরেরদিন আঁধার রাতেই রাজ-পোশাকে ঘোড়ায় চড়ে হাতে এক তলোয়ার নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করলো। পরদিন সকালে দেখা গেলো রাজকুমার প্রাসাদে নেই। রাজা আর রাণী শোক সন্তপ্ত হয়ে পড়লেন।

রাজকুমার তুমুল বেগে ছুটে চলেছে। এক সকালে সে এক রাজ্যে এসে পৌঁছলো। ঘোড়া থেকে অবতরণ করে রাজতোরণের দিকে পা বাড়ালো সে। রাজতোরণে এসে প্রহরীকে বললো তার আগমনের খবর নৃপতিকে দিতে। প্রহরী রাজদরবারে এসে নৃপতিকে বললো, ‘নৃপতি, মহারাজ!বেয়াদবি মাফা করুন। এক যুবক আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। রাজকীয় তার আচরণ!’ নৃপতি তার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি দেখলেন এ যুবক সত্যিই বীর আর সুপুরুষ। তার চোখে মুখে যথার্থই কোন রাজকুমারের ছাপ। নৃপতি তাকে জিজ্ঞেস করলো কেনো সে তাঁর রাজদরবারে এসেছে। রাজকুমার উত্তর দিলো, ‘নৃপতি! ক্ষমা করবেন। আমি এক রাজকুমার। কিন্তু বড়ই পরিতাপ আমি কোন শিল্পজ্ঞানে পাণ্ডিত্য অর্জন করিনি। আমি নিশ্চিত আমার পিতা আমাকে ভবিষ্যতে রাজা মনোনীত করবেন। আর তাই আমি রাজ্য ছেড়ে এক ভিন্ন রাজ্যে এসেছি কিছু জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। যতদিন না আমি একজন রাজার সকল গুণ-জ্ঞান অর্জন করছি ততদিন আমি রাজ্যে ফিরবো না- এ আমার প্রতীজ্ঞা। দয়া করে আমাকে আপনার রাজদরবারের সেবক হিসেবে গ্রহণ করুন।’ নৃপতি রাজকুমারের স্পষ্টভাষিতা আর বিনয়ে মুগ্ধ হলেন এবং তাকে তাঁর রক্ষী হিসেবে নিয়োগ দিলেন। ঐদিন থেকেই রাজকুমার রক্ষী হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে যাচ্ছিলো।এইভাবেই রক্ষী হিসেবে দিনাতিপাত করছিল রাজকুমার।

রাজার ছিল এক অনিন্দ্য-অপূর্ব সুন্দরী কন্যা। রাজ্যের তাবৎ যুবক বিস্মায়ভিভূত হতো রাজকুমারীর চোখে চেয়ে। নৃপতি তাঁর স্বীয় কন্যার জন্য উপযুক্ত বর খুঁজতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করছেন না। বিভিন্ন রাজ্যে তাঁর সংবাদ পাঠানো হলেও উপযুক্ত কোন রাজকুমার পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি আর কী করতে পারেন? তিনি রাজকুমারীর জন্য এক স্বয়ম্বরার আয়োজন করলেন। নানান রাজ্যে দাওয়াত পাঠানো হলো। রাজকুমারকেও সেই অনুষ্ঠানে থাকতে বলা হলো। রাজকুমারী এই স্বয়ম্বরা অনুষ্ঠান আয়োজনে সম্মতি দিল। রাজকুমারী নিজেই তার বরকে নির্বাচন করবে।

রাজকুমারী তো এক সপ্তর্ষী। যৌবনের সমস্ত সৌন্দর্য যেন ঠিকরে পড়েছে তার শরীরে। একদল দাসী সবসময় তার সামান্য খোশখেয়াল পূরণে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু রাজকুমারী যেন বহু প্রতীক্ষিত তার জীবনসঙ্গীর জন্য। এক সন্ধ্যায় সে প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়েছিল। যথারীতি সাথে ছিল দাসীরা। হঠাৎ তার চোখ পড়লো রাজকুমারের প্রতি যে কিনা ভিন্ন রাজ্যে থেকে এসে রক্ষীর কাজ করছে। প্রথম দেখাতেই সে প্রেমে পড় গেল। সে দেখতে পেলো তার আচরণে রয়েছে রাজকীয় নিশানা। রাজকুমারের পৌরুষ আর সুঠাম দেহ তাকে অভিভূত করলো। রাজকুমারী দাসীদেরকে তার আসল পরিচয় খুঁজে বের করার আদেশ দিল। দাসীরা রাজকুমারীর মন বুঝতো। তারা রাজকুমারের কাছে গেল আর তাকে তার আসল পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। রাজকুমার তার আসল পরিচয় জানাতে কোনই কার্পণ্য করলো না কিন্তু আশ্চর্য হলো কেন তারা তার আসল পরিচয় জানতে চাইছে। সে আশেপাশে দৃষ্টিপাত করলো। রাজকুমারী প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে যে তাকে দেখছে তা তার নজর এড়ালো না। রাজকুমারীকে গলিত স্বর্ণের মত জ্বলজ্বল দেখাচ্ছিল। এক চিকন হাসি তার চন্দ্র-বদনে খেলা করে যাচ্ছিল। রাজকুমার রাজকুমারীর দিকে একটান চেয়ে থাকলো, কোন পলক পড়ল না। আর রাজকুমারীও তাই। না, কোন কথা বিনিময় নয়, কেবল দু’টি চোখ চেয়ে রইলো দু’টি চোখের দিকে।

দাসীরা রক্ষীর তথা রাজকুমারের আসল পরিচয় বললো এসে রাজকুমারীকে। রাজকুমারী যেন আত্মহারা হয়ে পড়লো। সে তো তার প্রেমে পড়েছে। তার উপর সে তো যে সে যুবক নয়, সে যে এক রাজকুমার। এইভাবে কয়েক দিন অতিবাহিত হলো। এদিকে রাজকুমার রাজকুমারীর চিন্তায় শুকিয়ে যেতে বসলো। না, তার যে কোন কাজেই আর মন বসছে না। এওতো অসম্ভব নয়, নৃপতি তাকে দায়িত্ব অবহেলার কারণে বহিষ্কার করতে পারেন! হতে পারে সে কোন রাজ্যের এক রাজকুমার। কিন্তু এখানে সে নিতান্তই এক রক্ষী! এটা তো নাও হতে পারে যে নৃপতি তার হাতে তার কন্যাকে তুলে দিবেন। সমস্ত দুশ্চিন্তা তাকে পেয়ে বসলো। ওদিকে রাজকুমারীরও একই দশা।

এদিকে রাজ্যের সব পশু বনের মধ্যে এক মিটিং বসালো। সমস্ত পশুই উপস্থিত। তাদের আলোচনার বিষয় অনিন্দ্য সুন্দর রাজকুমারীকে নিয়ে, কীভাবে নৃপতি উপযুক্ত বর খুঁজে পান না তার জন্য! শেষমেষ তাদের ‍সিদ্ধান্ত হলো, কেবল একটি হাতিই হতে পারে রাজকুমারীর জন্য একমাত্র উপযুক্ত বর।

এই সিদ্ধান্তে হাতিটি যার পর নাই খুশি হলো। সে তো ভাবতেই পারছিল না এত স্বাচ্ছন্দ্যে সে রাজকুমারীকে বিয়ে করতে যাচ্ছে! ক’জনের হয় এমন কপাল! হাতির মাথার মধ্যে যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেলো। এভাবেই অন্যসব হাতিরাও ব্যাপারটি মেনে নিল। এক হাতি বললো, ‘ভাইয়েরা আমার! প্রতি সন্ধ্যায় রাজকুমারী রাজবাগানের পুকুরটাতে স্নান করতে আসে। অন্ধকার নামার আগেই সে প্রাসাদে ফিরে যায়। রাজকুমারী আসার আগেই আমরা পুকুরে গিয়ে হাজির হবো আর পুকুরের মধ্যে ছোট শিলা পর্বতের মতো লুকিয়ে থাকবো। রাজকুমারী যখনই আমাদের উপরে আসবে আমরা তাকে নিয়ে ছুটে আসবো।’ তার এই বু্দ্ধিদীপ্ত পরামর্শ সবাই সাদরে গ্রহণ করলো। পরের সকাল থেকেই তারা পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করা শুরু করলো।

রাজপ্রাসাদে রাজকুমারীর স্বয়ম্বরার আয়োজনে সাজসাজ রব। নৃপতি খুবই ব্যস্ত সকাল থেকেই নানান আদেশ নিষেধে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজ্য থেকে অনেক রাজকুমার এসে হাজির হয়েছে। দাসীরা সকাল সকাল রাজকুমারীকে জাগিয়ে তুলো। তাকে স্নান করাতে নিয়ে গেলো রাজপুকুরে। হাতিরাও আগে ভাগে এসে শুর ভাসিয়ে ডুবে রয়েছে। রাজকুমারী আর দাসীরা ছোট শিলা পর্বত ভেবে ভুল করলো। তারা স্নান সেরে ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দাসীরা পাড়ে এসে দাঁড়ালো। কিন্তু রাজকুমারী তার মুখ ধুতে একটু বেশি সময় নিচ্ছিল। হাতিগুলো পানি ঝরে উঠে পড়লো আর রাজকুমারীকে সঙ্গে নিয়ে বনের দিকে ছুটলো। রাজকুমারী হাতির পিঠ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছিল না। হাতিরা তাকে গহীন অরণ্যে নিয়ে গেল।

দাসীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো আর নৃপতিকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জানালো। সজ্জিত প্রাসাদ মুহূর্তেই নরকে পরিণত হলো। কান্নার রোল পড়লো। কিই না দুর্ভোগ রাজকুমারীর! ভিন রাজ্যের রাজকুমারেরা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হলো। রক্ষী রাজকুমার এই ঘটনায় আকাশ থেকে পড়লো যেন। এতদিন যাকে পাবার প্রত্যাশায় সে দিন গুণেছে আজকের এই দিনে সেই রাজকুমারীকে হাতিরা নিয়ে গেলো! এতদিনের স্বপ্ন-স্বাদ আর প্রত্যাশা কী এখানেই সমাপ্তি? রাজকুমারীর এমন দুঃসময়কে সে কোনভাবেই মেনে নিতে পারলো না। তার হৃদয় উন্মত্ত-ব্যাকুল হয়ে উঠলো। নিশ্চিয় তাকে এই মুহূর্তে রাজকুমারী স্মরণ করছে, তার দুর্দিনে। যে কোন মূল্যেই তাকে উদ্ধার করতে হবে। নয়তো এই জীবনের আর কী মানে?

নৃপতির আদেশ নিয়ে সে বনের মধ্যে যাত্রা করলো। দুপুর গড়িয়ে গেলেও এই গহীন অরণ্যে সূর্যের আলো পৌঁছে না। হিংস্র বন্য পশুদের আনাগোনা এখানে। ভূত-প্রেতের আস্তানা। তাদের বিভৎস চিৎকার। রাজকুমার বার হাত লম্বা এক তলোয়ার কোমরে গুঁজে রাজকুমারীকে উদ্ধার করার জন্য ছুটলো গহীন অরণ্যে যে কিনা তার নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয়।

পথিমধ্যে বিশাল এক সাপ তার পথ আগলে দাঁড়ালো। কিন্তু সে তো রাজকুমার, ভয়ে পালিয়ে যাবার পাত্র নয়। সে চিৎকার করে সাপের ভালোর জন্য বললো, ‘আমি বহু সাপ হত্যা করেছি, চিবিয়ে খেয়েছি। আর তোর মতো সাপ যে কিনা ভাবছে আমি ভয় পেয়ে যাবো? এক মুহূর্তেই তোকে চিবিয়ে খাব!’ এই শুনে, সাপ ভয়ে পালাতে লাগলো। রাজকুমার তার বার হাত লম্বা তলোয়ার বের করলো তাকে হত্যা করবে বলে। সাপ ভয়ে আর্তনাদ করে বললো, ‘ভাই, আমাকে মেরো না। আমি তোমায় এমন এক মণি দেব যার উপর মন্ত্র পড়ে মাটিতে রাখলে পঁচিশ মাইল পানিতে তলিয়ে যাবে।’ রাজকুমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মণিটি গ্রহণ করলো আর মন্ত্রটি শিখে নিলো। তারপর তাকে রাজকুমারীর কথা জিজ্ঞেস করলে সে বললো, রাজকুমারীকে হাতিরা এই পথ দিয়ে কিছুক্ষণ আগে নিয়ে গেছে। রাজকুমার এক ঝটকায় সাপকে দু’খণ্ড করে সামনের দিকে ছুটে চললো।

অরণ্য আরও গহীন অরণ্যে পৌঁছে গেল রাজকুমার। এ যেন এক মৃত্যুপুরী। সহসা এক বিশাল এক বাঘ তার পথ আগলে দাঁড়ালো। সে যেন তার ঘাড়ের উপর এসে পড়লো। রাজকুমার এমনভাব করলো যেন সে এই বাঘকে তুচ্ছ মনে করে। সে চিৎকার করে বললো, ‘আমি তোর মতো বহু বাঘ মেরেছি। আমি কি আর তোকে ভয় পাবোরে! তোকে তো আমি এক মুহূর্তেই খেয়ে ফেলতে পারি।’ একথা শুনে বাঘ কিছুটা ভয় পেল আর পিছিয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু বাঘ যখন দেখলো রাজকুমার তার দীর্ঘ তলোয়ার বের করছে, তখন সে কেঁদে কেটে বলে উঠলো, ‘ভাই আমাকে মেরো না। এই ক্ষুদ্র প্রাণীটি আপনার কী কিঞ্চিত উপকারে আসতে পারে? আমি আপনাকে এক অমূল্য জিনিস দেবো। যাতে মন্ত্র প্রয়োগ করে মাটিতে রাখলে পঁচিশ মাইল দীর্ঘ আর দুই মাইল চওড়া বাঁশের বেড়ার দেয়াল তৈরি হবে। বাঘ তাকে মন্ত্র শিখিয়ে একটি বাঁশের নলি তুলে দিল। রাজকুমার বাঁশের নলিটা নিয়ে রাজকুমারীর কথা জিজ্ঞাসা করলো। বাঘও একই রকম বললো যে হাতিরা এই পথ দিয়ে কিছুক্ষণ আগে তাকে নিয়ে গেছে। রাজকুমার ভাবলো, বাঘ আবার না শত্রু বনে যায়, তাই এক কোপে তার গর্দান শরীর থেকে আলাদা করে দিল। তার পর আবার ছুটতে শুরু করলো।

রাজকুমার যতই আগায় ততই অরণ্য কালো থেকে আরো কালো হতে থাকে। তার চারপাশ ঘনকালোয় ছেয়ে গেলো। তার শরীরে এক রহস্যময় শীতলা অনুভূত হলো। আকস্মিক এক বিকট হাসির আওয়াজ করে এক বিশাল আর কদাকার রাক্ষস এসে সামনে দাঁড়ালো তার। তৎক্ষুণি রাজকুমারের হাত তলোয়ারের হাতলে চলে গেল। সে বললো, ‘আমি তোর মতো বহু রাক্ষস মেরেছি। আমি কি আর তোকে ভয় পাবোরে! তোকে তো আমি এক ঢোকেই খেয়ে ফেলতে পারি।’ এই শুনে রাক্ষস পেলো ভয়। সে মিনতি করে বললো, ‘ভাই, আমাকে মেরো না। আমি তোমায় এমন এক হাড় দেব যার উপর মন্ত্র পড়ে মাটিতে রাখলে পঁচিশ মাইল এলাকায় আগুন ধরে যাবে। নিশ্চয় একদিন এই হাড় তোমার কাজে আসবে।’ রাজকুমার হাড়টি হাতে নিলো আর মন্ত্রটা শিখে নিলো। তারপর রাজকুমারীর কথা জিজ্ঞেস করলো। রাক্ষস বললো, ‘এটা অরণ্যের গহীনতম জায়গা। একটু এগুলেই সে পেয়ে যাবে এক বিশাল আর বহুপুরানো বটগাছ। কোন মানুষ কখনো সেখানে পা ফেলেনি। বনের সব হাতি সেখানেই বাস করে। এই বটগাছই তাদের রোদ বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা থেকে বাঁচায়। হাতিরা দিনে যায় খাবারের খোঁজে, রাতে এসে এর তলায় ঘুমায়। আর আমি দেখলাম এক অনিন্দ্য সুন্দরী কুমারীকে এই হাতিরা ধরে এনেছে।’ এই শুনে রাজকুমারের আরো ক্ষেপে রাক্ষসকে ধরে রাক্ষসের ঘাড় মটকে দেয়। এরপর খুব সাবধানে সে বটগাছটির নিচে যায়। এক নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে সে সব অবলোকন করতে থাকে। কোন হাতিই এখন দেখা যাচ্ছে না। হাতিরা সব খাবারের জন্য বেড়িয়ে পড়ছে নিশ্চয়ই। বটগাছের ঠিক তলায় এক খড় আর ঘাসের পালঙ্ক তৈরি করা। রাজকুমার ভাবলো এই পালঙ্ক নিশ্চয় রাজকুমারীর জন্য। সে গাছের বেশ বড় একটা কোটর আবিষ্কার করলো যেখানে অনায়াসেই দু-তিন জন পালিয়ে থাকতে পারবে। রাজকুমার চারপাশ ভাল করে দেখে হাতে তরবারি নিয়ে লুকিয়ে পড়লো কোটরে। আর অপেক্ষা করতে থাকলো। সে এও ভাবলো যদি একবার হাতিরা তাকে দেখে ফেলে তো আর জীবন নিয়ে ফিরতে হবে না। তাই সে বনদেবীকে ডাকলো। বনদেবী তার ত্যাগ আর ডাকে সন্তুষ্ট হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো আর তাকে বর দিলো। রাজকুমার বললো সে রাজকুমারীকে উদ্ধার করতে এসেছে। দেবী বললো সে ঠিক মধ্যরাতে যখন সব হাতি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হবে তখন সে তাকে নিয়ে যেন পালায়। এই বলে বনদেবী মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেলো।

রাজকুমার তো সেই কোটরেই সময় গুণতে থাকলো। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে হাতিরা ফিরে এলো। এক বিশাল হাতিকে ঘিরে আছে আর সব হাতি যার পিঠে রাজকুমারীকে দেখা গেলো। রাজকুমারীকে ঘাসের পালঙ্কতে শুইয়ে সবাই যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়লো। আর বড় হাতিটা রাজকুমারীর মাথায় তার শুর দিয়ে পাশেই শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়লো।

রাজকুমার কোটর থেকে মিহিসুরে ফিসফিস করে রাজকুমারীকে ডাকলো যাতে হাতির কান পর্যন্ত না যায়। রাজকুমারী মাথা ঘুরিয়েই দেখলো সেই রক্ষী রাজকুমারকে। সে হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। সাথে সে সাহসও ফিরে পেলো। সে যে রাজকুমারকে ভালোবেসেছে, তাই তাকে দেখে সে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সতর্ক! হাতিরা টের পেলে জানে মেরে ফেলবে। রাজকুমার তাকে অভয় দিয়ে বনদেবীর বরের কথা বললো। আর কখন হাতিরা ঘুমাবে জানতে চাইলো। রাজকুমারী বললো, ‘আমার মাথার উপর থেকে যখন হাতির শুরটি পড়ে যাবে তখন বুঝবে হাতি গভীর ঘুমে।’

রাজকুমার অপেক্ষা করতে থাকলো কখন হাতির শুর সরে পড়ে। রাজকুমারী অনুনয় করে বললো, ‘রাজকুমার! হাতিরা আমাকে এখানে ধরে এনেছে। আমার তো কষ্ট হচ্ছে। আমি কি এদের থেকে বাঁচি কিনা মরি জানি না। তুমি কেন এখানে এসেছো? তুমি চলে যাও। আমি মরি, মরি। তোমাকে তো বাঁচতে হবে। তুমি আরো তো অনেক রাজকুমারীর সন্ধান পাবে। আমার জন্য তুমি কেন তোমার জীবন বিপন্ন করতে যাবে? রাজকুমারের চোখে পানি টলমল করতে লাগলো রাজকুমারীর এমন কথা শুনে। সে বললো, ‘আমি তোমাকে এ নরক থেকে উদ্ধার করবো। তার জন্য আমার জীবন দিতে আমি প্রস্তুত। আর তোমাকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকার কোন কারণ আমি দেখি না।’ শেষমেষ তারা ঠিক মধ্যরাতে পালাবার সিদ্ধান্ত নিলো।

হাতিটি ঠিক মধ্যরাতে ঘুমিয়ে পড়লো। তার শুর রাজকুমারীর মাথার উপর থেকে সরে পড়লো। রাজকুমার এই সুযোগে রাজকুমারীর হাত ধরে বনদেবীর নাম জপতে জপতে সরে পড়লো। বনদেবীর এই আশির্বাদের কথা হাতিরা বুঝতেই পারলো না।

কিছুক্ষণ পরে হাতিরা জেগে উঠলো। ততক্ষণে রাজকুমার আর রাজকুমারী অনেক দূরে সরে গেছে। হাতিগুলো দেখলো রাজকুমারী নেই। তারা মানুষের পায়ের ছাপ দেখে বুঝলো কি হয়েছে। তারা পায়ের ছাপ অনুসরণ করে ছুটতে থাকলো। কিছুক্ষণপরই তারা রাজকুমার আর রাজকুমারীকে দেখতে পেলো। তারা গর্জনে ফেটে পড়লো। রাজকুমারও সতর্ক যে হাতিরা তাদের পিছু নিয়েছে। হাতিরা তাদের ক্রমশ কাছে এসে পড়ছিল। তাই সে সেই সাপের দেয়া মণিটি মন্ত্রপুত করে মাটিতে রাখলো আর অমনি পঁচিশ মাইল পানিতে ডুবে গেলো। রাজকুমার আর রাজকুমারী আরও এগিয়ে গেলো। কিন্তু হাতিরাও গাছের গুড়ি তুলে তুলে পানি পাড় হয়ে এলো। এবার রাজকুমার মন্ত্রপুত করলো বাঘের দেয়া বাঁশের নলি। মাটিতে রাখতেই পঁচিশ মাইল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে গেল বাঁশের দূর্গ। কিন্তু হাতিরা বহু জোড় খাঁটিয়ে ভেঙে ফেললো আর আবার তাড়া করলো। এবার রাজকুমার কী করে? হাতিরা তো তাদের পাছ ছাড়বে না! তাই সে রাক্ষসের দেয়া হাড়টিকে মন্ত্রপুত করলো। প্রকাণ্ড এক আগুন ছড়িয়ে পড়লো বিশাল এলাকা নিয়ে। হাতিরা তো আর আগুন পাড় হতে পাড়ে না। ওরা আগুনে ভয় পায়।

রাজকুমার আর রাজকুমারী রাজ্যে ফিরে আসলো যেখানে সে রক্ষীর কাজ করতো। সবাই তাদের দেখে হতবাক হয়ে গেলো। নির্বাক হয়ে গেলো রক্ষী-রাজকুমারের সাহস আর বীরত্বে। নৃপতি তার কন্যাকে রাজকুমারের সাথে বিয়ে দিলো। আর ঘোষণা দিলো এই রাজ্যের নৃপতি এই রাজকুমার। রাজকুমারের আর কোন আশা রইলো না নিজের রাজ্যে ফিরে যাবার। সে সেখানে নৃপতি হয়ে আর প্রজাদের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে সারাজীবন পার করে দিলো।

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1202 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com