আহা!

ডিসেম্বর ২১, ২০১৬ ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ

তখনো কোটরের ভেতরেই ছিল ওরা। গুটিসুটি মেরে। হঠাৎ কে যেন উঁকি দিল কোটরে। অমনি চেঁচিয়ে উঠল চন্দনা টিয়া, কে?
কোনো সাড়া নেই। বিরক্ত হলো চন্দনা। সাতসকালে কে উঁকি মারে দেখা দরকার। মাথা বাড়িয়ে দিল কোটরের বাইরে। আগে বেরোল ওর ঠোঁট। টকটকে লাল ঠোঁট। সূর্যের আলোয় দেখাল আরও লাল।
মাথা বের করেই চেঁচাল ও, ‘ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ। আমার ঘরে উঁকি মারল কে?’
‘আমি গো আমি।’
চমকে উঠল সবুজ টিয়া। মাথা দুলিয়ে আশপাশে তাকাল। নাহ, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তবে সূর্যটাকে আজ বেশ বড়সড় মনে হচ্ছে। কেন? জানে না চন্দনা টিয়া।
এবার কোটর থেকে সবুজ শরীর বের করল ও। বসল গিয়ে মেহগনির ডালে। এ গাছেই ওর বাসা। কয়েক মাস আগেও অনেক পাখি ছিল গাছটায়। চন্দনা টিয়াদের বড়সড় একটা কলোনি ছিল গাছটা। নিচে স্কুল। বসাকপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। কয়েক মাস আগেও শিশুদের হইচই শোনা যেত। হঠাৎ এক রাতে অনেকগুলো হানাদার এল। আস্তানা গাড়ল ক্লাসঘরগুলোয়। তারপর থেকে ওদের শান্তির দিন শেষ। শান্তির রাতও শেষ। প্রতি রাতে হানাদারগুলো বেরিয়ে যেত। আগুন দিত আশপাশের গ্রামগুলোয়। গাছগুলোয়। কত পাখি যে বাসা হারিয়েছে! কত মা পাখিরা যে ছানা হারিয়েছে! হিসাব নেই। মানুষের হিসাব সবাই করে। কিন্তু পাখিদের হিসাব?
মাঝেমধ্যে হানাদারগুলো গুলিও ছুড়ত। ঠিক ওদের বাসা তাক করে। কয়েকটা কোটরে এখনো গুলির দাগ আছে। হানাদারের ভয়ে সব পাখি সরে গেছে। কোথায় গেছে কে জানে? কেবল এই চন্দনা টিয়াটা রয়ে গেছে। এখন ওর বাসায় তিনটা ছানা। আজ চার দিন বয়স হলো ছানাগুলোর। ছানাগুলোকে আগলে রাখতে হয়। হুটহাট কখন বাসা থেকে বেরিয়ে যায়, ঠিক আছে? বেরোলেই ভয়। হানাদারগুলোকেই ভয়। ছানাগুলোকে রেখে খাবারও আনতে যেতে পারে না। কী বিপদ!
চট করে নিচে তাকাল চন্দনা। আর তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল! ওর হলুদ-সাদা চোখ দুটো হয়ে গেল বড় বড়। এ কী! হানাদারগুলো গেল কোথায়? ইতিউতি তাকাল চন্দনা। উঁহু। একটা হানাদারও নেই। মনের সুখে আবারও হাঁক ছাড়ল চন্দনা, ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ।
কিন্তু ওর বাসায় উঁকিটা মারল কে?

এদিক-ওদিক তাকাল ও। কেউ নেই। আবার চেঁচাল, ‘ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ। আমার ঘরে উঁকি মারল কে?’

‘আমি গো আমি।’

‘আমিটা কে?’

‘তোমার সূর্য মামা।’

হেসে ফেলল চন্দনা। বলল, ‘ভাগনির ঘরে এভাবে উঁকি মারতে হয়?’

‘ইচ্ছে করে উঁকি মারিনি। চোখ মেলেই দেখি একটা কোটর। কোটরের ভেতর কী আছে, জানতে খুব ইচ্ছে হলো। তাই উঁকি মেরে দেখলাম। তোমার ছানাগুলো এত শুকনো কেন? কিছু খাওয়াও না?’

চন্দনা বলল, ‘ওদের রেখে কি বেরোনো যায়?’

‘বুঝেছি। আজ হানাদারগুলো নেই। এবার ওদের জন্য খাবার আনতে পারো। আমি ওদের পাহারা দেব।’

ব্যস। অমনি সাঁই করে উড়াল দিল চন্দনা। আর ফিরতে ফিরতে…

গড়িয়ে গেল দুপুর। খাবার পেয়ে ছানাগুলো ভীষণ খুশি। মায়ের ঠোঁট থেকে খাবার খেল ঠুকরে ঠুকরে। এখনো দেখতে পাচ্ছে না ছানারা। জন্মের পর কিছুদিন ওরা কিছু দেখে না। ভাগ্যিস দেখতে পায় না। নইলে চোখ মেলেই হানাদার দেখতে হতো।

ছানাদের খাইয়েদাইয়ে কোটর থেকে বেরোল টিয়া। বসে রইল গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে। কোটরের পাশেই। মাথাটা নিচের দিকে। লেজটা ওপরের দিকে।

ততক্ষণে বিকেল। সূর্য মামাটা কমলা হতে শুরু করেছে। মাথা দুলিয়ে তাকাল নিচে। আর অবাক হলো। আরে! মেহগনি গাছের ঠিক নিচে একটা পতাকা। বাতাস নেই বলে পতপত করে উড়তে পারছে না।

একটা সবুজ পতাকা। ঠিক ওর গায়ের রং।

পতাকার মাঝখানটা টকটকে লাল। ঠিক ওর ঠোঁটের মতো।

লালের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র। হলুদ। ওর চোখের মতো।

বাংলাদেশের পতাকা। এল কোত্থেকে! গতকালও এখানে হানাদারদের পতাকা ছিল। সেটা গেল কোথায়?

ভাবতে লাগল চন্দনা টিয়া। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ, ক্রিয়াক ক্রিয়াক ক্রিয়াক।

টিয়াদের চিত্কার! খুশিতে হা হয়ে গেল চন্দনার লাল ঠোঁটজোড়া। তখনই কোটরের ভেতরে ট্যাঁ ট্যাঁ করল ছানাগুলো। জানতে চাইল একটা ছানা, ‘হইচই কিসের মা?’

মা টিয়া বলল, ‘ফিরে এসেছে! ওরা ফিরে এসেছে!’

একটা টিয়া এল ওর কাছে। এই টিয়ার সঙ্গে ওর খাতির ছিল বেশি। বলল, ‘খবর শুনেছ?’

‘কী খবর?’

‘বিজয়ের খবর। দেশ আজ মুক্ত। হানাদারমুক্ত। এই স্কুলটাও মুক্ত। এই গাছটাও…’

চন্দনা টিয়ার খুশি আর ধরে না। চেঁচাতে চেঁচাতে উড়ে গেল ঝাঁকের কাছে। ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া। এসে উড়তে লাগল পতাকার চারপাশে।

কত দিন পর! কত দিন পর এভাবে ডানা মেল উড়তে পারছে ওরা! আহা!

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1174 বার
 
 
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তারেক রহমান
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 
 

পূর্বের সংবাদ

 
 

অনন্য অনলাইন পত্রিকা

 
 
 

 
Plugin by:aAM
Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com